দীর্ঘদিন অব্যবহূত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এবার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনে ব্যবহার করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইতিমধ্যে ইউপি পরিষদের নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এজন্য স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালা-২০১০ এর বিধি-২৩ সংশোধন করা হচ্ছে। এই বিধি অনুমোদন করতে আজ রবিবার কমিশনে সভা আহবান করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, আইনে স্থানীয় সরকারের অন্যান্য সংস্থার নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদে নেই। আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এই যন্ত্র ব্যবহার করার জন্য বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভায় ইভিএমে ব্যবহারের বিধিমালা সংশোধন করা হলেও ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। এ জন্য উপজেলা পরিষদ নির্বাচন (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) বিধিমালার মধ্যে সামঞ্জস্যতা রেখে ইউপি বিধির সংশোধন আনা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) বিধিমালা-২০১৪ এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। ইউপি নির্বাচন বিধিমালা ২৩ ধারা সংশোধনের জন্য ইসি সচিবালয় থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ইসি সচিবালয়ের উপ-সচিব মু. আবদুল ওয়াদুদ স্বাক্ষরিত খসড়া প্রস্তাবনায় বিদ্যমান ব্যালট এর মাধ্যমে ভোট এর স্থলে সংশোধিত বিধি ২৩ এ বলা হয়েছে, ব্যালট বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন এর মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করা যাবে। নতুন এই বিধিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর যদি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা এক বা একাধিক হয়, তাহা হইলে, এই বিধিমালায় বিধৃত পদ্ধতিতে গোপন ব্যালট বা, ক্ষেত্রমত, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) বিধিমালা, ২০১৪ এর বিধান অনুসারে ইভিএম এর মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করিতে হইবে।’
ইসির সংশ্লিষ্টরা ইত্তেফাককে জানান, প্রায় ৫ কোটি টাকায় কেনা ১২৩০টি ইভিএম বর্তমানে ইসিতে সংরক্ষিত রয়েছে। ইভিএম ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতার মুখে সংসদ নির্বাচনের আইনি বিধানে এ সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া কবে নাগাদ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা যাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কমিশনে সংরক্ষিত ইভিএমগুলো ক্ষুদ্রপরিসরে ইউপি নির্বাচনে ব্যবহার করবে ইসি। স্থানীয় নির্বাচনগুলোয় ইভিএম’র ধারাবাহিকতায় বজায় রাখা হচ্ছে। এজন্য ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের বাজেটেও ইভিএম কেনার জন্যে বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে।
ইসির সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০১০ সালে কোন ধরনের প্রজেক্ট প্রোফাইল বা নিয়ম-নীতি অনুসরণ না করেই ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছিল বিগত নির্বাচন কমিশন। ২০১০ সালের ১১ এপ্রিল সর্বপ্রথম ইভিএম ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদিত হয়। ইভিএম ব্যবহারে বিগত কমিশন আইন ও চুক্তির গুরুতর লংঘন করেছিল। তাড়াহুড়ু করে ইভিএম ব্যবহার করতে গিয়ে কোন নীতিমালা অনুসরণ করেনি তারা। ২০১০ সালের ১১ এপ্রিল তত্কালীন নির্বাচন কমিশন সচিবালয় (১ম পক্ষ) এবং ব্যুরো অফ রিসার্চ, টেস্টিং এন্ড কনসালটেশন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা (২য় পক্ষ) এর মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি মানা হয়নি। পৌরসভায় ইভিএমে ব্যবহারে আইন না থাকলেও ইভিএম ব্যবহার করে তত্কালীন ইসি। এছাড়া পরবর্তীতে ইভিএম ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠে। বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইভিএম ক্রয়ে অনিয়মের তদন্ত করছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে একটি ওয়ার্ডে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে দেশে ইভিএমের যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সালের জুনে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং গাজীপুরের রাষ্ট্রায়ত্ত মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির সহায়তায় এ প্রযুক্তি চালু হয়। এরপর নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন ও নরসিংদী পৌরসভায় পুরো ভোট হয় ইভিএমে। তবে বুয়েট ও ইসির দ্বন্দ্বে সিইসির ঘোষণার পরও রংপুর সিটি কর্পোরেশনে এর ব্যবহার নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। শেষ মুহূর্তে ইসির নিজস্ব জনবল দিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে ইভিএমে ভোট হয়। বর্তমান ইসির অধীনে ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেটে সিটি নির্বাচনে মাত্র ১৩টি কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় এ যন্ত্র নিয়ে এগোনোর কাজ। কমিশন থেকে বলা হয়, ইভিএম ব্যবহারে ক্রুটি থাকায় নির্বাচনে আপাতত এই যন্ত্র ব্যবহার করা হবে না।
বেশকিছু সিদ্ধান্ত হবে আজ
এদিকে, আজ কমিশন সভায় ইউপি নির্বাচনে ইভিএমের পাশাপাশি অনলাইনে ভোটার সংক্রান্ত বিধি ও রাজনৈতিক দলগুলোর দাখিলকৃত ব্যয়ের হিসাব গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। ভোটারের অনলাইনের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রের তথ্য, নিজস্ব তথ্য দেখা, তথ্য পরিবর্তনের জন্য আবেদন করা, ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য আবেদন করা, ভোটার এলাকাসমূহে আবেদন করা, পুনঃমুদ্রণের জন্য আবেদন, ছবি, স্বাক্ষর পরিবর্তন ও অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য সময় নেয়া, আবেদন ট্র্যাকিং করা, সাধারণ জিজ্ঞাসা ও ফরমসমূহ ডাউনলোড করা সংক্রান্ত বিষয়ে কমিশনের অনুমোদনের জন্য জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ থেকে প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে।
