যমুনায় ভাঙ্গন অব্যাহত থাকায় জামালপুরের মাদারগঞ্জ ও বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে গতকাল শনিবার দুটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৩শ’ ৩০ মিটার ধসে গেছে। এতে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করায় ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সারিয়াকান্দিতে বন্যার পানিতে পড়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। কয়েকটি স্থানে বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে।
মাদারগঞ্জ (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি বিপদসীমার ৩১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গতকাল শনিবার ভোরে প্রবল পানির তোড়ে চাঁদপুর-নাংলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের নাংলা অংশের প্রায় ৩শ’ মিটার বাঁধ ধসে গেছে। এতে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করায় নতুন করে ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া গাবেরগ্রাম- শুভগাছা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটির অনেক অংশ ধসে গেছে। বালিজুড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল ইসলাম মুছা জানান, প্রায় ৩ হাজার বালির বস্তা ফেলে বাঁধটি রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে। গতকাল সকালে বাঁধ ধসের খবর পেয়ে পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরিদর্শন করেন। বালিজুড়ি ইউনিয়নের চারাঞ্চলের মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ড. কামরুজ্জামান জানান, এখনো কোন সরকারি ত্রাণ পৌঁছেনি। এই উপজেলায় ৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।
সারিয়াকান্দি (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, যমুনার ভাঙন অব্যাহত থাকায় গতকাল শনিবার দুপুরে চন্দনবাইশা বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের শেখপাড়া পয়েন্টে আবার ৩০ মিটার ধসে গেছে । ভাঙন স্থলে বালি ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করছে ঠিকাদাররা। বার বার বাঁধ ধসে যাওয়ায় পার্শ্ববর্তী ঘুঘুমারি, রৌহাদহ, ইছামারা, ফকিরপাড়া ও কড়িতলা গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ উত্কণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এদিকে জনপদে পানি প্রবেশ রোধে ভেঙে যাওয়া বাঁধের পিছন দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে রিংডাইক নির্মাণ করলেও ওই রিংডাইকের ওপর ভরসা করতে পারছে না এলাকাবাসী।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, বন্যার পানি নেমে না যাওয়ায় কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলার ৫০ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ও নদ-নদী তীরবর্তী গ্রাম-চরাঞ্চলের দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী জীবন যাপন করছে। গত এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দী থাকায় দুর্ভোগ চরমে উঠেছে বন্যার্তদের। দুর্গত এলাকাগুলোতে নৌকার শব্দ শুনলেই ত্রাণের জন্য ছুটে আসছে দুর্গতরা। হাতে কাজ ও ঘরে খাবার না থাকায় বিপাকে পড়েছে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধায় ঘাঘট ও ব্রহ্মপুত্রের পানি সামান্য কমলেও জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি শনিবারও অপরিবর্তিত আছে। শনিবার দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের ফলে জেলার সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকার ২৫ হাজার পরিবারের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। গত এক সপ্তাহ যাবত্ পানিবন্দী হয়ে খাদ্য, বাসস্থান ও গবাদিপশু নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন তারা।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, গত কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নেমে আসায় লালমনিরহাট জেলায় দ্বিতীয় দফা বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যায় জেলার ৫টি উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে গতকাল বিকালে বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পাহাড়ি ঢলে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে জেলার পাটগ্রামের উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধার উপজেলার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, ডাউয়াবাড়ি, পারুলিয়া, কালীগঞ্জের উপজেলার ভোটমারী, তুষভাণ্ডার, কাকিনা, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, পলাশী, সদর উপজেলার রাজপুর, খুনিয়াগাছ, গোকুণ্ডা ইউনিয়নের তিস্তা নদীর দ্বীপ চর ও তীরবর্তী অঞ্চলের ৩০ হাজার মানুষ।
শেরপুর প্রতিনিধি জানান, উজান থেমে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের শেরপুর ফেরিঘাট পয়েন্টে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতিমধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদের জেগে ওঠা চরের ঘরবাড়ি এবং নদ সংলগ্ন নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করায় লোকজন ঘরবাড়ি ফেলে অন্যত্র আশ্রয় নিতে শুরু করেছে।
চৌহালী (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলাধীন এনায়েতপুর থানার বন্যা কবলিত বেতিল চরের মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। যমুনা নদীর ভাঙ্গনে সর্বস্বান্ত হওয়া কয়েক হাজার মানুষ বেতিলসহ আশপাশের মাজগ্রাম, বিনদহ, আশাননগর, ধুলিয়াবাড়ি, চাঁদপুর চরাঞ্চল জুড়ে গত ২-৩ বছর আগে আশ্রয় নিয়েছিল।
পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তাঁত শিল্প সমৃদ্ধ গোপিনাথপুর, শিবপুর, সোনাতলা, সৈয়দপুর, খুকনী, রুপনাই, গোপালপুর, গোপরেখী এলাকার বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। বেশ কিছু তাঁত কারখানায় পানি প্রবেশ করায় কাপড় উত্পাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া এসব এলাকার অন্তত ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁয় গতকাল বন্যার পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের চরাঞ্চরের শতাধিক গ্রাম বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। বন্যার পাশাপাশি প্রায় ২০টি গ্রাম জুড়ে নদী ভাঙ্গন প্রকট আকার ধারন করেছে।
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, তিস্তার পানি হঠাত্ বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ৭টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০টি গ্রামের মানুষ। পানি বেড়ে যাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে সদ্য রোপণ করা প্রায় ৫০০ একর আমন ক্ষেত। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ১৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়েছে।
জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ও ইসলামপুর উপজেলায় বন্যার পানি কিছুটা হ্রাস পেয়ে উন্নতি হলেও মেলান্দহ ও সরিষাবাড়ি উপজেলায় নতুন করে নিম্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সরিষাবাড়ীতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। এসব বন্যা কবলিত এলাকায় প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। এদিকে ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় পানি কমতে থাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানিসহ গো খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।
নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, নাগেশ্বরীতে বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গাধর, দুধকুমার, শংকোস, ফুলকুমার নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি কমতে শুরু করলেও বন্যা কবলিত নারায়ণপুর, কচাকাটা, কেদার, বল্লভেরখাস, বামনডাঙ্গা, বেরুবাড়ী, কালীগঞ্জ, নুনখাওয়া, রায়গঞ্জ ও ভিতরবন্দসহ ১০ ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা এখনও পানির নিচে।
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়ায় আশপাশের গ্রামের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড গতকাল শনিবার ভাঙন মেরামত করেছে। কম্পার্টমেন্টালাইজেশন পাইলট প্রজেক্টের (সিপিপি) অধীনে টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এবারের বন্যায় পানির চাপে এ প্রকল্পের কালিহাতী উপজেলার মহেলা এলাকায় বাঁধের কিছু অংশ গত শুক্রবার রাত থেকে ভাঙতে থাকে। শনিবার সকালে ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জিও ব্যাগ ফেলে বিকালে ভাঙন মেরামত করেন।
