শিল্পের আঙ্গিনায় কখনো শিল্পীও হয়ে উঠেন শিল্পকর্ম। আবার প্রতিটি শিল্পীর শিল্পসত্তাও একেকটি শিল্পকর্ম। কখনো তা মূর্ত, কখনো বিমূর্ত। শিল্পের গভীর সাগরে নিমজ্জমান শিল্পীর সকল ইন্দ্রিয়, অবয়ব এমনকি তার চারদিকে বিরাজমান বাতাসও শিল্পকর্ম বলে মনে হয়। তেমনই একজন শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ। শিল্পের দীর্ঘপথে ভ্রমণকারী এই বিখ্যাত শিল্পী ভূষিত হয়েছেন ফ্রান্সের সম্মানজনক নাইট উপাধিতে। তার গল্প জানাচ্ছেন রিয়াদ খন্দকার ও ছবি তুলেছেন ইফতেখার ওয়াহিদ ইফতি
সময়টা ছিল ১৯৬৮ সাল। ওই সময় পাকিস্তান রেডিও থেকে বাংলা খবর প্রচার হলো। সরকার কবীর উদ্দিন খবরের হেডলাইনে বললেন, আজ বিশ্ব শিশু দিবস; সাতজন শিশুকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তারপর বিভিন্ন সংবাদ পাঠ হলো। সবশেষে সাংস্কৃতিক খবরে বলল, অল পাকিস্তান আর্ট কম্পিটিশনে ‘ক’ শাখায় প্রথম হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের শামসুন নাহার কলা ভবনের শাহাবুদ্দিন আহমেদ। সেই থেকেই পুরস্কারের প্রাপ্তির ঘরে নাম লেখালেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। ১৯৬৮ সালে শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী হিসেবে তিনি গোল্ড মেডেল পান তিনি। তারই ধারাবাহিকতায় অজস্র সময়, অজস্র শিল্পকর্ম, অজস্র কৃতিত্ব শেষে বড় এবং বিখ্যাত শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ ভূষিত হন ফ্রান্সের সম্মানজনক নাইট উপাধিতে। চিত্রকর্মে অসামান্য অবদানের জন্য ফ্রান্সের এই সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পান দেশবরেণ্যে এ শিল্পী। গত বৃহস্পতিবার সরকারের এক তথ্য বিবরণীতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এর আগে ১৯৬৭ সালে বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও ২০১১ সালে মূকাভিনয় শিল্পী পার্থ প্রতীম মজুমদার এ উপাধি লাভ করেন। শাহাবুদ্দিনের তুলির আঁচড়ে নিমিষেই আবিষ্কৃত হয় বীর মুক্তিযোদ্ধার পেশিবহুল শরীর আর সীমাহীন শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্যপট। যার রঙের ব্রাশ মুখস্থ করেছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসংখ্য অভিব্যক্তি আর অবয়ব। ক্যানভাসে তার তুলি ঘুরে গেলেই শোনা যায়, জাতির জনকের কণ্ঠস্বর। সত্যিই অন্যরকম এক জাদুর ব্যাপার। এই জাদুকরের নিবাস এখন প্যারিসে। সেখানেই তার বিশাল স্টুডিও। দেশেও আসেন নিয়মিত। ছবি আঁকতে কিংবা দেশের সমস্ত দৃশ্যপট হূদয়পটে হালনাগাদ করতে। দেশেও মগ্ন থাকেন ক্যানভাস, ব্রাশ আর রঙের খেলায়।
আর্ট কলেজে শাসছুন নাহার শিশুকলা ভবন নামে শিশুদের ছবি আঁকার একটা স্কুল ছিল। পাকিস্তানের ইস্পাহানি, বাওয়ানিসহ বিভিন্ন এলিট ক্লাসের ছেলেমেয়েরা ওখানে আসত। শুক্র ও রবিবার ক্লাস হতো। তার আম্মা একদিন তাকে রিকশায় করে সেখানে নিয়ে গেলেন। বাইরে ছেলেমেয়েদের ছবি আঁকতে দেখে তার মনে হচ্ছিল তিনি অনেক গরিব; ময়লা শার্ট, হাফপ্যান্ট পরা। লজ্জায় মায়ের আঁচল টেনে ধরেছিলেন তখন। ভেতরে গিয়ে দেখেন একজনই লুঙ্গি পরা ব্যক্তি বাচ্চাদের রং, ব্রাশ ইত্যাদি দিচ্ছেন। তাকে দেখে তিনি কিছুটা শান্তি পেলেন। তার নাম হান্নান। তিনি শাহাবুদ্দিনকে দেখে বললেন, ‘আস আস খোকা। তুমি এখানে আঁকতে বসে যাও।’ শাহাবুদ্দিন বসে আঁকা শুরু করেন। অন্যদিকে মা বিভিন্ন ফরম ফিলআপ করলেন। মাইনে দিলেন তিন টাকা। ওইদিন সারা বেলা আর্ট কলেজে ছিলেন। পরে তার নেশা হয়ে গেল। কবে শুক্রবার, রবিবার আসবে কখন ক্লাসে যাবেন অপেক্ষায় থাকতেন। ছোটবেলা থেকে তার স্বপ্ন ছিল ‘আমি জয়নুল আবেদিন হব’। তবে ১৯৭১ সালে শাহাবুদ্দিন ফার্স্ট ইয়ারে থাকতেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। রাজনীতি ছিল তার পারিবারিক উত্তরাধিকার। ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন তিনি। ১৬ ডিসেম্বর সকালে শাহাবুদ্দিন ও তার সহযোদ্ধারা মিলে শাহবাগ রেডিও অফিস দখল করেন। রেডিও অফিসে পাকিস্তানের পতাকা খুলে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে উড়িয়ে দেন তিনি। মহাত্মা গান্ধির অসহযোগ আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধুর মহত্ কর্মতত্পরতা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এই দুই মহান নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকে তাদের বিখ্যাত কয়েকটি ছবি আঁকেন তিনি।
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আবির্ভূত হন শিল্পী শাহাবুদ্দিন। আধুনিক ঘরানার প্যারিস-প্রবাসী ফরাসি-বাঙালি এই শিল্পীর খ্যাতি ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে মাস্টার পেইন্টার্স অব কনটেম্পোরারি আর্টসের পঞ্চাশ জনের একজন হিসেবে বার্সেলোনায় অলিম্পিয়াড অব আর্টস পদকে ভূষিত হন। ২০০০ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার তাকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করেন। তার চিত্রকর্ম সংগ্রামী মানুষের প্রতিকৃতিতে দুর্দমনীয় শক্তি ও অপ্রতিরোধ্য গতির ইঙ্গিতময় অভিব্যক্তির জন্য সুপরিচিত।
তার পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার আলগী গ্রামে হলেও তিনি ১৯৫০ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে শাহাবুদ্দিনের বাবা তায়েবউদ্দীন প্রধান ছিলেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা। তার মায়ের নাম সাইফুন্নেছা আহমেদ। ব্যক্তিগত জীবনে আনাকে বিয়ে করেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। সংসারে তার দুই মেয়ে। শিল্পী শাহাবুদ্দিন ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করেন ফরিদউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। তিনি ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন আর্টসে পড়াশোনা করে বিএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ওই বছরই ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। পরবর্তীতে ফ্রান্স সরকার হতে চারুকলায় বৃত্তিলাভ করে ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ইকোল দে বোজার্ট চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে অদ্যাবধি প্যারিসে কর্মরত আছেন।
শাহাবুদ্দিনের তুলিতে নারী চিত্রকর্মগুলোয় তাদের চিরায়ত কোমলতা, দ্যুতির স্পন্দন, স্নিগ্ধতা দেখা যায়। মিহি কাপড়ের মাধ্যমে নারীকে আবৃত করে শারীরিক সৌন্দর্যের দ্যুতি তুলে ধরেন তিনি, যাতে নারীর অলৌকিক ও অসীম শক্তি বিচ্ছুরিত হয়। দেশ-বিদেশের অনেক গ্যালারিতে তার একক ও যৌথভাবে চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হয়েছে। শাহাবুদ্দিন আহমেদের বিভিন্ন চিত্রকর্ম বাংলাদেশ-সহ বুলগেরিয়া, তাইওয়ান, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রখ্যাত গ্যালারি, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত আছে।
প্র দ র্শ নী
একক
১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্তদেরকে অর্থ সাহায্যের জন্য ঢাকায় চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে তার চিত্র প্রদর্শনী হয়। হল্যান্ড, পোল্যান্ড, সেনেগাল, বেলজিয়াম, বেলজিয়াম এবং ভারতসহ সুইজারল্যান্ডের লুসানে অবস্থিত অলিম্পিক মিউজিয়াম এবং ফ্রান্সের বোর্গ-এন ব্রেজ মিউজিয়ামেও তার চিত্র প্রদর্শনী হয়েছে।
যৌথ
সেঁজুতির প্রথম চিত্রকলা প্রদর্শনী ও ভাষা আন্দোলন উপলক্ষে চিত্র প্রদর্শনী, ঢাকা, বাংলাদেশ;
প্যারিসে অধ্যয়নরত শিল্পীদের আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনী, প্যারিস, ফ্রান্স;
প্যারিসে ইউনেস্কো আয়োজিত আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনী, প্যারিস, ফ্রান্স;
বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলা প্রদর্শনী, চীন;
গ্যালারি কন্ট্রাস্টে চিত্র প্রদর্শনী, ব্রাসেলস, বেলজিয়াম;
‘দি হারমোনি শো’, মুম্বাই, ভারত;
ইতালি ও কিউবাতে চিত্র প্রদর্শনী;
‘সিগার দ্য লা হাভানা আ হরিজন ২০০০’ চিত্র প্রদর্শনী, প্যারিস, ফ্রান্স অন্যতম।
পু র স্কা র প্রা প্তি
রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক ১৯৬৮ শ্রেষ্ঠ শিশু শিল্পী
প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক ১৯৭৩
বাংলা একাডেমির স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার ১৯৭৪
১ম পুরস্কার, ১৯৭৫-এ প্যারিসে অধ্যয়নরত শিল্পীদের আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনী
১ম পুরস্কার, ১৯৭৯-এ প্যারিসে আয়োজিত ৩১টি দেশের শিল্পীদের আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনী
১ম পুরস্কার, ১৯৮০-এ ইউনেস্কো আয়োজিত আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনী
শ্রেষ্ঠ পুরস্কার, ১৯৮২-এ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নবীন শিল্পী চারুকলা প্রদর্শনী
স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার ২০০০, চারুকলা ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ।
