ইউনেস্কো ইন্টেলিজেবল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গত ডিসেম্বরে। আজারবাইজানে ঐ বৈঠকে বাংলাদেশের জামদানীকে আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দেয়া হয়। বাউল সঙ্গীতের পর উক্ত তালিকায় জামদানী বাংলাদেশের ২য় পণ্য। বুনন, রঙ ও নকশা, আর মান ও ঐতিহ্যকে বিবেচনা করে আমাদের জামদানী অর্জন করেছে এই স্বীকৃতি। এই অর্জনকে ধরে রাখতে হবে যেমনি সম্মান বাঁচনোর জন্য, তেমনি এর মানকে সমৃদ্ধ করতে হবে। তাই এ ব্যাপারে সচেতনতার উপর জোর দেন বিশেষজ্ঞরা। গতকাল রাজধানীর পলাশীর ব্যানবেইস ভবনে জামদানী শীর্ষক এক সেমিনারে এ জোর দেয়া হয়। তবে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকা এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে অনতিবিলম্বে এর সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
জামদানী ইউনেস্কো কর্তৃক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ঘোষিত হওয়ায় নতুন প্রেক্ষাপটে এই শিল্পের সাথে যারা জড়িত অর্থাত্ জামদানী বয়ন শিল্পী, ব্যবসায়ী তাদের অধিকতর শিল্প সচেতন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এর মৌলিকত্ব অক্ষুণ্ন রেখে কেবল শাড়িতে সীমাবদ্ধ না রেখে নানাবিধ নতুন ও অপ্রচলিত পণ্য তৈরির সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নানাভাবে জনপ্রিয় করার প্রেক্ষাপট তৈরি ও দেশ-বিদেশে এ সকল পণ্য বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের উদ্বুদ্ধ করার কথা জানান হয় ঐ সেমিনারে।
সেমিনারে বলা হয়, সেভগার্ডিং জামদানী দি ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ ফরম বাংলাদেশ এন্ড প্রোমোটিং ক্রিয়েটিভ ইকোনোমি শীর্ষক প্রকল্পের অংশ হিসেবে প্রটেকশন অব জামদানী থ্রো ইটস মাল্টিপল ইউজ এন্ড সেভগার্ডিং দি আর্টিস্ট এন্ড দি কমিউনিটি শীর্ষক প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য কোরিয়ান ইউনেস্কোর জাতীয় কমিশন ১৭ হাজার ৫শ’ ডলার দিয়েছে। এই অর্থ পর্যাপ্ত না হলেও কাজ শুরু করবে সংস্কৃতি, পর্যটন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কোরিয়া ও বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনসহ বেশকিছু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
সেমিনারে বয়ন শিল্পীরা বলেন, তাদের সুতা, রঙ, শ্রমঘণ্টা এসব বিবেচনায় জামদানী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিসিক অনুমোদিত শিল্প নগরীর শর্তে তারা অনেকে সেখানে থাকতে পারেননি। তাদের শিশুদের জন্য নেই স্কুল, তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নেই চিকিত্সা। অনেক শিল্পী কাজ রেখে বাজারজাতকরণে ব্যস্ত হচ্ছেন। আবার কেউ টিকে থাকতে মানের সাথে কমেপ্রামাইজ করছেন। ফলে নিম্নমানের জামদানী তৈরি হচ্ছে। যা কিছু দিনের মধ্যে ফেটে যায়। প্রশ্নবিদ্ধ হয় জামদানী।
ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল বলেন, জামদানী ভাত-ডাল না। পোলাও কোরমা। যা আমরা প্রতিদিন খাই না। আবার খেতে গেলে খরচ হয় বেশি। জামদানী দামি জিনিস একে দাম দিয়েই বিবেচনা করবেন। বিদেশেও এর অনেক চাহিদা আছে। বিক্রির দায়িত্বটা সরকারের ব্যবস্থাপনায় হলে ভালো হয় বলে মনে করেন অনেকে।
নামিদামি দোকানে দামি জামদানীর সুফল যেন প্রকৃতভাবে শিল্পীরা পায় তারও একটা ব্যবস্থাপনার কথা জানানো হয় সেমিনারে। এই প্রকল্পের অধীনে নতুন নকশা উদ্ভাবন, তা জামদানী শিল্পীদের সাথে শেয়ার ও চূড়ান্ত করা, সেই নকশা অনুযায়ী পণ্য উত্পাদন, উত্পাদিত পণ্যের প্রদর্শনী ও প্রকল্প সমাপনী প্রতিবেদন ও মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে প্রকল্পের কাজ চলবে। পরে তারই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার বিষয়েও জোর দেন অংশগ্রহণকারীরা।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি বলেন, শিল্পীদের শিশুরা শিক্ষিত হয়ে যেন তাঁতকে ঘৃণা না করে, তেমন শিক্ষা প্রয়োজন। তারা গর্ব করে এই ঐতিহ্যের অংশীদার হবে। স্থায়ী হবে আমাদের ঐতিহ্য। সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব রণজিত্ কুমার বিশ্বাস এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত লী ইউন ইয়াং। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের মহাসচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক।
