তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়া করা এক রিটের শুনানিতে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামানের দ্বৈত বেঞ্চ গত সোমবার মন্তব্য করিয়াছেন যে, সরকারের মেশিনারিজগুলি সক্রিয় থাকিলে মজুতকারীরা এতটা সাহস পাইত না। তাহারা শুধু রমজান মাস আসিবার আগে নহে, বরং সারা বত্সরই বাজার তদারকির উপর গুরুত্বারোপ করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ হইল, শুরু হইতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি কঠোর হইলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য লাগামছাড়া হইত না। এতটা ভোগান্িত হইত না জনসাধারণের। ব্যবসায়-বাণিজ্য একচেটিয়াভাবে একটা গ্রুপের কাছে চলিয়া যাওয়ায় এমনটা হইতেছে বলিয়া অভিমত প্রকাশ করা হয়। অথচ ইহা বন্ধ করিতে রেগুলেটরি বডি বা নিয়ন্ত্রণ সংস্থা গঠনের কথা আইনেই বলা আছে। আমাদের সামনে আইন বাস্তবায়নের দৃশ্যমান কোনো উদাহরণ নাই, যাহা দুর্ভাগ্যজনক। ইহার ফলে সুযোগ লইতেছে সেই জোটবদ্ধ ব্যক্তি-গোষ্ঠী।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণের সহিত আমাদের দ্বিমত পোষণ করিবার অবকাশ নাই। বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠিয়াছে। টিসিবির লাইনে নিম্নবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্তদেরও চাপ বৃদ্ধি পাইতেছে ক্রমশ। অবশ্য সরকার নাঘ্যমূল্যে পণ্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা করিয়াছেন বলিয়াই মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাইয়াছে। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য যেইভাবে বাড়িয়া চলিয়াছে, তাহাতে সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করিতেছে, তাহা লইয়াও প্রশ্ন উঠা অস্বাভাবিক নহে। দেশে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ব্যবসায়-বাণিজ্য যে একটি গ্রুপের নিকট চলিয়া যাওয়ার কথা বলা হইতেছে তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই। দেশে সরকারের চাইতে বেসরকারি উদ্যোগেই অধিক খাদ্যপণ্য আমদানি করা হয়। চাউল, ডাল, তৈল, চিনি প্রভৃতি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমরা এখনো চাহিদা অনুযায়ী নিজ দেশে উত্পাদন করিতে পারিতেছি না। আমদানি-নির্ভরতা এখনো রহিয়া গিয়াছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমদানি-নির্ভরতাই বেশি। ইহা ছাড়া একশ্রেণির মজুতদারের কারণে এই বাজার আরো অস্থির হইয়া উঠিয়াছে।
করোনা পরিস্থিতিসহ নানা কারণে আমাদের দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য এমনিতেই ছিল ঊর্ধ্বমুখী। তাহার পর ঘটিল ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার ঘটনা। এখন এই যুদ্ধ-পরিস্থিতি কবে নাগাদ শেষ হইবে তাহা কেহ জানেন না। এই যুদ্ধ বিশ্বখাদ্য ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করিয়াছে। ইউক্রেন হইল ব্রেড বাস্কেট অব ইউরোপ বা ইউরোপের রুটির ঝুড়ি। যুদ্ধরত ইউক্রেন ও রাশিয়া বিশ্বের মোট গমের ২৫ শতাংশ রপ্তানি করিয়া থাকে। আমরা গমের পাশাপাশি সরিষা ও মসুর ডাল আমদানি করিয়া থাকি ইউক্রেন হইতে। সমগ্র বিশ্বে ভুট্টা, গম, সূর্যমুখী তৈলবীজ, আপেলসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ দেশ এই যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন। শুধু যুদ্ধ নহে, একই সঙ্গে চলিতেছে বিভিন্ন স্যাংশন বা নিষেধাজ্ঞার খড়্গও। এই নিষেধাজ্ঞার কারণেও স্বাভাবিক ব্যবসায়-বাণিজ্য বিঘ্নিত হইতেছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে সুইফট জটিলতায় কোনো কোনো রাষ্ট্র ডলারে ব্যবসা করিতে পারিতেছে না। তেল কিনিতে পারিতেছে না। অনেক দেশের টাকা আটকা পড়িয়াছে। ধনকুবেররা রহিয়াছেন অস্বস্তিতে। তাহারা ঠিকমতো ব্যবসায়-বাণিজ্য করিতে পারিতেছেন না। চীন ও রাশিয়া নিজস্ব পদ্ধতিতে সুইফটের ফাঁকফোকর গলিয়া অর্থ লেনদেন করিতেছে বটে, কিন্তু এই সুবিধা অনেকেই পাইতেছে না। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন ব্যয় ও উত্পাদন খরচ হুহু করিয়া বাড়িতেছে যাহা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলিতেছে।
অতএব, সংকট না থাকিবার কোনো কারণ নাই। করোনার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই এখনো অব্যাহত রহিয়াছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করিবার উপায় কী? সার্বিকভাবে এই সংকট ঠেকাইতে হইলে এখন যুদ্ধ বন্ধ করিতে হইবে। যুদ্ধের পূর্বাবস্থা ফিরাইয়া আনিতে হইবে। বিশ্বে বৃহৎ শক্তির গোঁয়ারতুমি বন্ধ করিতে হইবে। নিজ প্রভাব বলয় তৈরি ও সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন দেখা বাদ দিতে হইবে। নিজে শান্িততে থাকিয়া অন্যকেও শান্িততে রাখিতে হইবে। একই সঙ্গে দেশে দেশে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রক বিভিন্ন সংস্থাকে আরো সক্রিয় করিয়া তুলিতে হইবে।
