কম্পিউটার ব্যবহারও তাঁর কাছে ভালো লাগত না। এই অপছন্দের মূল কারণ অবশ্য অপ্রয়োজনীয়তা। তিনি বলতেন, কম্পিউটার তাঁর কাজে লাগে না।নিজের চিন্তার অনেকখানি জুড়ে ছিল দেশ ও সমাজের উন্নতি এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ। আয় থেকে কিছু অর্থ জমিয়ে দরিদ্র ছাত্রদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন। তাছাড়া ১৯৭১ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ বন্ধের উদ্যোগ নিতে বলেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর এই পরোক্ষ অবদান ও পরবর্তীকালে দেশে ফিরে আসা থেকে তাঁর দেশপ্রেমের প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়া তিনি বিদেশে পড়াশোনা করছে এমন সব শিক্ষার্থীকেই পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে আসতে উৎসাহিত করেন। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত লেখক ও শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশে ফেরার আগে জামাল নজরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। জামাল নজরুল তৎক্ষণাৎ তাঁকে দেশে ফেরার ব্যাপারে উৎসাহ দেন।
২০০১ সালে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলে একটি গুজব রটেছিল। বাংলাদেশেও এই গুজব ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় জামাল নজরুল ইসলাম গণিতের হিসাব কষে দেখান যে, সে রকম কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ, প্রাকৃতিক নিয়মে সৌরজগতের সবগুলো গ্রহ এক সরলরেখা বরাবর চলে এলেও তাঁর প্রভাবে পৃথিবীর কোনো ক্ষতি হবে না।
১৯৮৫ সালে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত আব্দুস সালাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। সেসময় তিনি স্থানীয় এক অনুষ্ঠানে জোরকণ্ঠে বলেছিলেন, 'এশিয়ার মধ্যে আমার পরে যদি দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি নোবেল পুরস্কার পায়, তবে সে হবে প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম।'
আব্দুস সালামের সাথে যারা নোবেল পুরস্কার পান তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ওয়েইনবার্গ। তিনি জামাল নজরুল ইসলাম সম্পর্কে মন্তব্যে করতে গিয়ে বলেন, 'We are particularly indebted to Jamal Islam, a physicist colleague now living in Bangladesh. For an early draft of his 1977 paper which started us thinking about the remote future.'
অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে আইনস্টাইনের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে সৃষ্টির রহস্য বোঝার চেষ্টা করেছেন। এই গবেষণায় সাফল্যের নিদর্শন তার গ্রন্থাবলী যা তাঁকে দেশে বিদেশ পরিচিত করে তুলেছিল। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে দি আল্টিমেট ফেইট অফ দি ইউনিভার্স, রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি, অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি, স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ, কৃষ্ণবিবর, মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ এবং শিল্প সাহিত্য ও সমাজ। এর মধ্যে দি আল্টিমেট ফেইট অব দি ইউনিভার্স ও স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় এবং বাজারে প্রচুর চাহিদা থাকায় পরবর্তীতে একাধিক ভাষাতে অনূদিত হয়।
বাংলার আকাশে আর্বিভূত হয়ে সারা বিশ্বেই যিনি দ্যুতি ছড়িয়েছেন। তিনি জামাল নজরুল ইসলাম। ২০১৩ সালের ১৬ মার্চ বাংলার আকাশে জ্বলজ্বল করা এই নক্ষত্র মানবের জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। ৭৪ বছরের বর্ণিল জীবনে অসংখ্য কীর্তির জন্ম দিয়ে তিনি জগতের মায়া ত্যাগ করেন।

