শহরে বসবাসরত মানুষের আতঙ্কের অন্যতম একটি নাম ম্যানহোল। সহজে পানি নিষ্কাশনের জন্য শহরে ম্যানহোল থাকা জরুরি। কিন্তু সেই ম্যানহোল যদি মানুষের মৃতু্যফাঁদে পরিণত হয়, তখন সেটি বড়ই চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। রাজধানী শহর ঢাকা, বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামসহ দেশের সিটি ও জেলা শহরে ম্যানহোল বসানোর প্রক্রিয়া সঠিকভাবে অনুসরণ না হওয়ায় চলাচলরত যানবাহন ও মানুষকে পড়তে হয় নানান দুর্ভোগে।
প্রতিদিন প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ খোলা ম্যানহোলগুলোর পাশ দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে হতাহতের শিকার হয়। খোলা ম্যানহোলগুলো শিশু থেকে বয়স্ক, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পথযাত্রীদের জন্য যেন একটি মরণফাঁদ। কিছুদিন পরপর খোলা ম্যানহোলে পড়ে বা ম্যানহোলের স্ল্যাব ভেঙে পড়ে মানুষ যেমন মারাত্মকভাবে আহত হচ্ছে, কখনো কখনো মৃতু্যর দুঃসংবাদও শুনিয়ে যাচ্ছে। দুর্ঘটনার খবরগুলো পত্রপত্রিকায় ও সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন অনেক প্রতিবাদ, অনেক আলোচনা ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের থেকে ক্ষতিপূরণ পুষিয়ে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি শোনা যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন কোনো ঘটনার জন্ম হলে ঝুঁকিপূর্ণ ম্যানহোল সংস্কারের বিষয়টি দৃষ্টির আড়ালে চলে গিয়ে পূর্বের অবস্হায় পড়ে থাকে।
ম্যানহোলে ঢাকনা না থাকার জন্য প্রধানত দায়ী ভারী যানবাহন ও মজবুতহীন ঢাকনা। ভারী যানবাহনের চাকার চাপে ঢাকনা ভেঙে যায়। এছাড়া পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও ম্যানহোল পরিষ্কার করার সময় অসতর্কতায় ঢাকনা ভেঙে ফেলেন বা খোলা রেখে চলে যান। মাদকাসক্ত ও টোকাইরা ঢাকনা চুরি করে বিক্রি করে ফেলে। তারপর ম্যানহোলগুলোর ঢাকনা আছে কি নেই, তা যেন দেখার কেউ থাকে না। প্রায় স্হানে ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা বা ঝুঁকিপূর্ণ থাকার কারণে যানবাহনগুলোকে চলতে হয় ধীরগতিতে। ফলে সৃষ্টি হয় যানজট। কিছু ম্যানহোল রাস্তার ডান দিকে, কিছু রাস্তার বাম দিকে থাকায় গাড়িচালকদের পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। বৃষ্টির দিনে শহরে খোলা ম্যানহোলগুলো ভয়ানক হয়ে ওঠে। ম্যানহোলগুলো পরিচ্ছন্ন না রাখায় বৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে পুরো রাস্তা যেমন বুড়িগঙ্গার পানির মতো কালো রং ধারণ করে, তেমনি ম্যানহোলের ডাকনা খোলা থাকার কারণে পানির স্রোতে কখনো মানুষ, কখনো গাড়ি ম্যানহোলে পড়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। এই ম্যানহোলগুলো খোলা থাকায় এবং বর্জ্য সঠিকভাবে নিষ্কাশিত না হওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটার পাশাপাশি পরিবেশের বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে। অপরিচ্ছন্ন ম্যানহোলে ডেঙ্গু, এডিস মশার মতো ক্ষতিকর মশাও জন্ম নিচ্ছে। ম্যানহোলের দুর্গন্ধ ও মশারি উৎপাতে জনজীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।
শহরের রাস্তার মাঝে ম্যানহোল সড়কের তুলনায় কোথায়ও এক-দুই ফুট উঁচু, কোথায়ও নিচু হওয়ায় যানবাহনগুলো দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেলগুলো এসব গর্তে পড়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়। তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায় যখন বৃষ্টিতে সড়কের ওপর পানি ওঠে এবং ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা থাকে। সতর্ক থাকা সত্ত্বেও বিপদে পড়তে হয়। মূল সড়ক থেকে অলিগলি সবখানেই ম্যানহোলের বেহাল দশার চিত্র দেখা যায়। ম্যানহোল নির্মাণ করার সময় সিটি করপোরেশন বা ওয়াসা কর্তৃপক্ষের উচিত সহজে বর্জ্য নিষ্কাশন হয় এমন পদ্ধতিতে রাস্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ম্যানহোল নির্মাণ করা। ম্যানহোলের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন আধুনিক প্রকৌশলগত ব্যবস্হা এবং দায়িত্বশীলদের কাজের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা। বিগত এক যুগে বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগে রাস্তায় এসেছে বেশ পরিবর্তন। সড়ক হয়েছে প্রশস্ত, বসেছে এলইডি লাইট ও নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা। কিন্তু সড়কের এই সৌন্দর্যকে ম্লান করে দিচ্ছে অপরিকল্পিত ম্যানহোল ব্যবস্হা। সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, পৌরসভাগুলো নগর উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনে প্রশংসনীয় কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি খোলা ম্যানহোলের প্রতি সংস্কারপূর্ণ দৃষ্টি রাখলে জনমানুষ যেমন চলাচলের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাবে, তেমনি নগরীর নিরাপত্তা ও সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পাবে।
লেখক:শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
