নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন: দরকার সব পক্ষের সমান অগ্রাধিকার

আপডেট : ২১ মার্চ ২০২২, ০৫:৪৭

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রাজস্ব আয় অন্যতম অপরিহার্য। আয় না করলে ব্যয় করা যায় না। সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে সিংহভাগ রাজস্ব আয় করে থাকে। আয় বাড়ানো তথা কর দেওয়ার প্রবণতা বাড়াতে নানা ধরনের উদ্যোগ, উদ্দীপনা এবং প্রণোদনার ব্যবস্থাও রয়েছে। সর্বোচ্চ ভ্যাট-ট্যাক্স প্রদানকারীদের সম্মানানাও দেওয়া হচ্ছে। এর মানে রাজস্ব প্রদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ সম্মান দিয়ে বেশি হারে কর প্রদানে উত্সাহিত করা। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সর্বোচ্চ ভ্যাট-ট্যাক্স প্রদানের কারণে সম্মাননা জানালেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কোনো কোনো খাত উপেক্ষিত রয়ে যাচ্ছে। এমনকি প্রতি বছর বাজেট পেশের আগে সংশ্লিষ্টদের ব্যবসা-শিল্প খাত নিয়ে আলোচনার আয়োজন করলেও কিছু খাতকে ডাকা হচ্ছে না।

সাধারণত, কোনো আইনের খসড়া চূড়ান্তকরণ অথবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের ব্যাক্তিবর্গদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয় সরকার। কিন্তু ব্যতিক্রম তামাক খাত। তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারে জনস্বাস্হে্যর জন্য হুমকি সৃষ্টি করে এবং এর ব্যাপকতা রোধ করাসহ ঝুঁকি কমানোর জন্য বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু এ খাতে স্টকহোল্ডারদের প্রতিনিধিত্বের অভাবে এবং এফবিসিসিআই-এর মতো শীর্ষ বাণিজ্যিক সংগঠনকে উপেক্ষা করে কিছু এনজিও-কে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে গৃহীত নানাবিধ সিদ্ধান্ত সঠিক ও বাস্তবায়নযোগ্য করা যাচ্ছে না।

২০০৩ সালে বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাপী তামাক-ব্যবহারের প্রবণতা কমাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক সূচিত একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তির বিধান মেনে সরকার পরবর্তীকালে ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করে। পরে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালের মে মাসে আইনটি সংশোধন করা হয়। সংশোধিত আইনের আলোকে সর্বশেষ তামাক নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০১৫ পাশ করা হয়। সংশোধিত আইন ২০১৩ এবং বিধিমালা ২০১৫ অনুযায়ী সব ধরনের তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং নারী ও শিশুদেরকে পরোক্ষ ধূমপানের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কঠোর বিধান রয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান আইনের বাস্তবায়নে এখনো অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে। এর কারণ, আইনের যথাযথ প্রয়োগকে গুরুত্ব না দিয়ে পার্শ্ববিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অথচ এ বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, ভোক্তাদের সবাই সমান শিক্ষিত নয়। এমনকি সচেতনও নয়।

কিছু বেসরকারি সংস্থা আইনটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে গুরুত্ব না দিয়ে আবারও সংশোধনীর জন্য চাপ দিচ্ছে। যা বিদ্যমান, তাই বাস্তবায়ন না করে কেবল নতুন নতুন সংশোধনী কি আইনটিকে উপেক্ষা করার জন্যই? বিষয়টি বোধগম্য নয়। সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে দেখা গেছে, বিদ্যমান আইন পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করে এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ জনসচেতনতা সৃষ্টি না করে কী উদ্দেশে এনজিওগুলো নতুন সংশোধনীর জন্য সরকারকে চাপ দিচ্ছে, তা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ রয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জিত হবে কীভাবে? এখানে দুটো বিষয় মনে রাখতে হবে। প্রথমত, তামাক খাত সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজস্বের পরিমাণ প্রায় ১১ শতাংশ (প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা)। এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক সূচিত আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল বাংলাদেশ। সেই চুক্তির বাস্তবায়নও জরুরি। নইলে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

এখন এই দুটো বিষয়কে একত্রিত করে যে পদক্ষেপ প্রয়োজন, তার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। তাহলে ‘গ্যাপ’ কোথায় আছে তা বোঝা যাবে এবং তা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। যদিও সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব বরাবর একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। ঐ চিঠিতে আইন সংশোধনে নিমিত্ত কমিটিতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা ও মতামত নেওয়ার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়। আশা করি অনুরোধটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ভেবে দেখবে। তবে মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে আন্তর্জাতিক মহলে ভাবমূর্তি বাড়ানো জরুরি। সে লক্ষ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং কার্যকর করতে হবে। বিদেশি কোনো সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতায় কিংবা কোনো বেসরকারি সংস্থার প্ররোচনায় তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম যেন ব্যাঘাত না ঘটে, সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: কলামিস্ট

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন