মান্না দে গিয়েছিলেন, ‘সবাই তো সুখী হতে চায়’। কিন্তু মুশকিল হলো, সুখ কীসে হয়, কী পেলে ভালো থাকা যায়, প্রশ্নটা ভয়ানক গোলমেলে। ভেবে দেখুন তো, ভূতের রাজা এসে যদি এক্ষুনি তিনটে বর দিতে চায়, কী চাইবেন? মাথা চুলকে যদি চেয়েও ফেলেন, তার পরে মনে হবে—না তো, ইস্, এটার বদলে ওটা চাইলে ঢের ভালো হতো? আসলে সুখের কোনো সীমা নেই। হয়তো পরিমাপকও নেই। তার পরও কিন্তু সুখের জন্য তত্ত্ব-তালাশ থেমে নেই!
প্রতি বছর ২০ মার্চ অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে গোটা বিশ্বে পালন করা হয় আন্তর্জাতিক সুখ দিবস। যদিও বাংলাদেশের মানুষ এত দিনে নির্ঘাত বুঝে গিয়েছে যে সুখ কেবলই ফাঁকি? কারণ সমীক্ষা অনুসারে আমাদের দেশটির নিশিদিন নিতান্তই সুখহীন? এ বছর জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে ১৪৬টি দেশের তালিকায় ৯৪ নম্বরে রয়েছে বাংলাদেশ। গত বছরের প্রতিবেদনে বিশ্বের ১৪৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০১। এবারের তালিকায় প্রতিবেশী দেশ ভারতের অবস্থান ১৩৬ এবং পাকিস্তান ১২১ নম্বরে রয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশের তালিকায় এবার শীর্ষ অবস্থানে আছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ ফিনল্যান্ড। এই নিয়ে টানা পাঁচ বার সুখী দেশের তালিকায় শীর্ষস্থানে ফিনল্যান্ড। এর পরে রয়েছে ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ২৮ জুন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এক অধিবেশনে দিনটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দিনটি পালনসংক্রান্ত প্রস্তাবে বলা হয়, ‘সাধারণ পরিষদের সব সদস্য এ বিষয়ে একমত যে, সবারই জীবনের মূল উদ্দেশ্য সুখে থাকা। শুধু তাই নয়, সার্বিকভাবে এরকম একটি সার্বিক ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও প্রয়োজন, যার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, সর্বোপরি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সুখ-সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য প্রতি বছরের ২০ মার্চ দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
আন্তর্জাতিক সুখ দিবস প্রচলনের প্রচারটি শুরু হয় মূলত হিমালয়ের দেশ ভুটানের হাত ধরে। দেশটিতে ইতিমধ্যে সুখ সূচকের ভিত্তিতে জাতীয় সমৃদ্ধি পরিমাপের প্রচলন করা হয়েছে। তারা জাতিসংঘের কাছে বছরের একটি দিন সুখ দিবস পালনের আহ্বান জানায়।
মহাশক্তিধর দেশ হলেই সেখানকার মানুষ যে মহাসুখে ভরপুর হবে, তা নয়। এই তালিকাতেই তা স্পষ্ট। সুখী দেশের তালিকায় আমেরিকার স্থান ১৬ নম্বরে। ব্রিটেন ১৭ নম্বরে রয়েছে। আমেরিকা ও ব্রিটেনের চেয়েও নিচে ফ্রান্স (২১)। তবে জার্মানির স্থান ১৪ নম্বরে। ব্রাজিলের স্থান ৩৮-এ। অন্যদিকে, তালিকায় ২১ ধাপ ওপরে উঠেছে চীন। গত বারের তালিকায় চীন ছিল ৯৩ নম্বরে। নয়া তালিকায় চীনের ঠাঁই ৭২-এ। ইউক্রেনে সেনা অভিযান চালানো রাশিয়ার স্থান তালিকায় ৮০ নম্বরে।
আমরা বরং আনন্দিত হতে পারি এই ভেবে যে, আমাদের পরেও অনেক দেশের নাম আছে। বিশেষ করে এবারের তালিকায় প্রতিবেশী দেশ ভারতের অবস্থান ১৩৬ এবং পাকিস্তান ১২১ নম্বরে রয়েছে। শ্রীলঙ্কা রয়েছে ১২৭ নম্বরে।
এই নিয়ে ১০ বছর ধরে সুখী দেশের রিপোর্ট প্রকাশ করছে জাতিসংঘের ‘সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক’। বিভিন্ন দেশের মানুষকে ফোন করে নানাবিধ প্রশ্ন করা হয়। জানতে চাওয়া হয়, তারা সুখী কি না বা কেন সুখী ইত্যাদি। রিপোর্ট তৈরির সময় নজরে রাখা হয় দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হার, মানুষের গড় আয়ু, সামাজিক সহায়তা, কাজ করার স্বাধীনতা, দুর্নীতির মতো বিষয়গুলো। এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অক্সফোর্ডের ‘ওয়েলবিইং রিসার্চ সেন্টার’, ‘সেন্টার ফর সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’, ‘ভ্যাংকুভার স্কুল অব ইকোনমিকস’।
ব্যক্তিস্বাধীনতা, সরকারের ওপর আস্থা, সুস্হ জীবনযাপনের প্রত্যাশার মতো মাপকাঠিও মাথায় রাখা হয় এই রিপোর্ট তৈরির সময়। এসব মাপকাঠিতে বাংলাদেশের মান যে ‘সন্তোষজনক’ নয়, তা স্পষ্ট।
পৃথিবীর মোট ১৪৬টি দেশ থেকে পাওয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে এই তালিকা। তাতে একেবারে শেষে, অর্থাত্ ১৪৬ নম্বরে রয়েছে আফগানিস্তান।
সুখ আসলে কী, তা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, চাহিদাতত্ত্বের শিখরে পৌঁছালেই সুখ খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ম্যালথাস এই তত্ত্বকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন এবং পাঁচ স্তরের চাহিদাতত্ত্বের সূত্র দেন, যেখানে তিনি বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে মানুষের চাহিদা একটা পূরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর একটি উন্নত চাহিদা তার সামনে এসে হাজির হয়। সুতরাং কোনো একটি নির্দিষ্ট চাহিদা পূরণ হলেই সুখের নাগাল পাওয়া গেল তা বলা যাবে না। আপাতদৃষ্টিতে সুখ একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। এটা একটা অনুভব, অনুভূতি।
কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রয়োজনে কতটুকু প্রাপ্তিতে একজন সন্তুষ্ট হবেন, তার ওপর সুখ নির্ভর করে। ধরা যাক, একজন ব্যক্তির অর্থনৈতিক সক্ষমতায় তিনি একটি সাইকেল কিনতে পারবেন। কিন্তু তিনি যদি আফসোস করেন, কেন একটি মোটরসাইকেল কিনতে পারলেন না, তাহলে তিনি অসুখী। আর যদি কেউ তার যা সামর্থ্য আছে তাতেই তুষ্ট থাকেন, অর্থাত্ ঐ সাইকেলেই যদি এক ব্যক্তি মানসিকভাবে তৃপ্ত হতেন, তাহলে তিনি সুখ খুঁজে পেতেন।
কে কীসে সুখী হন, তা বলা কঠিন। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘কেউ হাসি চায়, কেউ ভালোবাসা, কেউ চায় মিঠে কথা, কেউ চায় ফের নয়নের জল, কেউ চায় এর ব্যথা’। অর্থাত্ কে কী চায় তা যেমন আমরা বলতে পারি না; কে কীসে সুখী হয়, তা-ও আমরা বলতে পারব না। মানুষের চাওয়া যেমন বিচিত্র, সুখী হওয়ার উপকরণ বা কারণও তেমনি বিচিত্র।
সুখের সংজ্ঞা বুঝুক বা না বুঝুক, সুখ কী জানুক বা না জানুক, মানুষ সুখ চায়, সুখী হতে চায়। কিন্তু কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না। এ নিয়ে মানুষের হাহাকার আছে, অনুশোচনা আছে, আছে আক্ষেপ, দীর্ঘশ্বাস। যদিও কবি কামিনী রায় উপদেশ দিয়েছেন, ‘সুখ সুখ করে কেঁদো না আর, যতই কাঁদিবে ততই ভাবিবে, ততই হবে হূদয় ভার।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা! সুখ সুখ করে আমরা যেমন কেঁদে বেড়াই, আবার অনেক সময় একটু সুখের দেখা পেলেই তা হারাতে ব্যাকুল হয়ে যাই!
এক রসিক ভদ্রলোক বলেছিলেন, নিজের ভায়রার চেয়ে যার রোজগার ১০০ টাকা বেশি, সে-ই সুখী! ইয়ার্কির অংশটুকু বাদ দিলে একটা কাজের কথা পড়ে থাকে—আমরা সুখী কি না, সেটা বোঝার একমাত্র পথ তুলনা। হয় চারপাশের লোকদের সঙ্গে তুলনা অথবা নিজের অতীতের সঙ্গে তুলনা। এ যে সুখের দাঁড়িপাল্লা। উলটো দিকে অন্য কাউকে না রাখলে সুখের পরিমাণ বোঝার উপায় নেই।
১৯৯৭ সালে ম্যাকন এরিকসন নামের একটি বিজ্ঞাপন সংস্থা মাস্টার কার্ডের জন্য একটা বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিল। ‘দেয়ার ইজ সামথিং দ্যাট মানি ক্যান’ট বাই; ফর এভরিথিং এলস, দেয়ার ইজ মাস্টার কার্ড’। সুখী হওয়ার রেসিপি এমন এক লাইনে আর কোথাও পাওয়া দুষ্কর। বেশির ভাগ সুখই আমরা কিনি। কিন্তু কোন জিনিসটা কিনলে সুখ, বলে দেবে কে?
আসল কথা হলো, সুখ সুখ করে কেঁদে, বিলাপ করে কোনো লাভ নেই। সুখ একটা মানসিক অনুভূতি। নিজেকে সুখী মনে করলেই সুখ, না হলে সবই গরল!
সুখী দেশের বিশ্ব র্যাংকিং নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে তারচেয়ে আসুন, আমরা সমবেত কণ্ঠে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা গান গাই:
‘সুখের কথা বোলো না আর, বুঝেছি সুখ কেবল ফাঁকি
দুঃখে আছি, আছি ভালো, দুঃখেই আমি ভালো থাকি।’
লেখক: রম্যরচয়িতা
