গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সবচাইতে বড় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট পায়রা তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করিয়াছেন। ইহা অপেক্ষাকৃত পরিবেশবান্ধব আলটাসুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে নির্মিত দেশের প্রথম কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই ধরনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ১৩তম দেশ হিসাবে নিজের নাম লিখিয়াছে। কোনো সন্দেহ নাই, ইহা বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি বড় সাফল্য। এই বিদ্যুত্কেন্দ্রটি নির্ধারিত সময়ের পূর্বে এবং প্রাক্কলিত ব্যয়ের চাইতে কম খরচে নির্মিত হইয়াছে। যেইখানে আমাদের বিভিন্ন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয় না, বারবার সময় বাড়ানোর কারণে সময় ও অর্থের অপচয় হয়, সেইখানে এই বিদ্যুত্কেন্দ্রটি দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন হওয়ায় আমরা সংশ্লিষ্ট সকলকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই। প্রধানমন্ত্রী গতকালের দিনটিকে আলোর পথে যাত্রার সফলতার একটি দিন হিসাবে আখ্যায়িত করিয়াছেন। কেননা ইহার মাধ্যমে তিনি সমগ্র দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণাও দিয়াছেন। সার্বিকভাবে বিদ্যুত্ খাতে সরকারের এই সাফল্যকে আজ অস্বীকার করিবার কোনো উপায় নাই।
পটুয়াখালীর পায়রায় নির্মিত হইতেছে সমুদ্রবন্দরও। পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করিয়াই বিভিন্ন উন্নয়নযজ্ঞ চলিতেছে সেইখানে। বিদ্যুত্কেন্দ্র নির্মাণ সেই পরিকল্পনার অংশ ও সফল বাস্তবায়ন। ইহার মাধ্যমে অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নসহ সার্বিক ক্ষেত্রে সমৃদ্ধির ছোঁয়া লাগিবে বলিয়া আমরা বিশ্বাস করি। দক্ষিণাঞ্চলবাসীর স্বপ্নগুলি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরিয়া আজ একে একে পূর্ণতা লাভ করিতেছে। গত এক যুগে এই অঞ্চলে সামাজিক রূপান্তরের হাওয়া লাগিয়াছে। রাস্তাঘাট, পুলব্রিজসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন হইয়াছে। এই সকল এলাকায় একসময় ঝড়, জলোচ্ছ্বাসে পানি এদিক-ওদিকে বহিয়া যাইত। মানুষের ফসল নষ্ট হইয়া যাইত। তাহারা পড়িত দুর্ভিক্ষের কবলে; কিন্তু আজ সেই পরিস্হিতি আর বিদ্যমান নাই। দক্ষিণাঞ্চলের দুর্গম এলাকার মানুষ আজ ঘুরিয়া দাঁড়াইতেছে। বিদ্যুত্ ও ইন্টারনেট-সেবা পাইয়া ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অন্যান্যভাবে মানুষের জীবন বদলাইয়া যাইতেছে।
শুধু বিল নহে, দুর্গম পাহাড় ও বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলেও আজ বিদ্যুত্সংযোগ পৌঁছাইয়া গিয়াছে। এই জন্য ৯০টি জায়গায় নদী পারাপার লাইন তৈরি করিতে হইয়াছে। টানা হইয়াছে ১৮২ কিলোমিটার সাবমেরিন ক্যাবল। ২০১৬ সালে ঘরে ঘরে বিদ্যুত্ পৌঁছাইয়া দেওয়ার যেই কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, তাহা আজ সফল হইয়াছে। ‘আলোর ফেরিওয়ালা’রা মানুষকে বিদ্যুত্সংযোগ লইতে উত্সাহিত করিয়াছেন। বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, ২০০৯ সালের পর হইতে দেশে বিদ্যুত্ উত্পাদনক্ষমতা পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে। ২৭টির স্হলে বর্তমানে বিদ্যুত্কেন্দ্র ১৪৮টি। বিদ্যুত্ উত্পাদনের সক্ষমতা ৪ হাজার ৯৪২ হইতে বাড়িয়া দাঁড়াইয়াছে ২৫ হাজার ৫১৪ মেগাওয়াট। এই সময়ে সঞ্চালন লাইন বাড়িয়াছে ৫ হাজার ২১৩ কিলোমিটার। বিতরণ লাইন বাড়িয়াছে ৩ লক্ষ ৬১ হাজার কিলোমিটার। নূতন করিয়া বিদ্যুত্সংযোগ দেওয়া হইয়াছে ৩ কোটি ১৩ লক্ষ। ইহার মাধ্যমে সেচ-সংযোগ দ্বিগুণ হইয়াছে। বিদ্যুত্ সুলভ হওয়ায় গ্রামগঞ্জে ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্প বিকাশের পথ তৈরি হইয়াছে।
বিদ্যুত্ উত্পাদনের সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে পায়রা বিদ্যুত্কেন্দ্র উদ্বোধনের বিষয়টি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসাবে বিবেচিত হইতেছে। দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘটনাটিও আনন্দময়। তবে এখন বিদ্যুতের মূল্য সহনশীল করিতে হইবে। ইহার সহিত কলকারখানায় নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুত্ সরবরাহেরও নিশ্চয়তা দিতে হইবে।
