তারাকান্দর: এক নির্মম স্বাক্ষর

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২২, ০৯:৫৯

বাংলাদেশে চালানো পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর গণহত্যা ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে সংঘটিত মাইলাই গণহত্যা বা চেক প্রজাতন্ত্রের লিডিস গণহত্যার চেয়েও ভয়াবহ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও প্রথম তিন মাসেই এখানে মাইলাই ও লিডিসের মতো শখানেক বড় গণহত্যার তথ্য জানতে পারেন নিউজ উইকের এক সাংবাদিক। সেই গণহত্যার ধারাবাহিকতায় গোপালগঞ্জে একাধিক নারকীয় গণহত্যা চালানো হয়। বিশেষত গোপালগঞ্জ জেলার তারাকান্দর গ্রামে চালানো গণহত্যা পাশবিকতার ভয়ংকর স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই তারাকান্দরের অবস্হান কোটালীপাড়া উপজেলার কান্দি ইউনিয়নে। পিঞ্জুরী গ্রামে থেকে দক্ষিণ দিকে তাকালে ধু-ধু করে দেখা যায় গ্রাম। বর্ষায় শিশুধানসহ দোল খায় গ্রামখানাও। ১৯৭১ সালে এই তারাকান্দর গ্রামকেই তৈরি করা হয়েছিল বধ্যভূমিতে। কোটালীপাড়ার বৃহত্তর বধ্যভূমি তারাকান্দর গ্রামে। কিন্তু ৫০ বছর সময়ের মধ্যে সবাই এটা ভুলতে বসেছে। ইতিহাস সবার অজানা, এই বধ্যভূমি যাদের সহায়তায় হয়েছিল তাদেরও কেউ কেউ জীবিত। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও এই গণহত্যার ইতিহাস কেউ বলতে চায় না। রাজাকার, আলবদর, আলশামসরা এত শক্তপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত যে এদের নাম বলে কেউ জীবনের নিরাপত্তা হারাতে চায় না। যে কারণে অবহেলায় থেকে গেছে গণহত্যার ইতিহাস। লিখিতভাবে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই মেলেনি বর্বরোচিত এই গণহত্যার।

১৯৭১ সালের মে মাসে ঘটনাটি ঘটেছিল। বাংলা ১৯ জ্যৈষ্ঠ। দেশ জুড়ে তখন চলছে যুদ্ধের প্রস্ত্ততি। কান্দি ইউনিয়নের ভূমিজ মানুষেরা দেশীয় অস্ত্রের মজুত গড়ে তোলে তারাকান্দর ‘বালাবাড়ি’তে। এখান থেকেই প্রতিরোধের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল এলাকার মানুষ। অন্যদিকে গোপালপুর ও কুরপালায় চিহ্নিত কয়েকটি বাড়ি ছাড়া বেশির ভাগই ছিল পাকিসামরিক বাহিনীর সাহাঘ্যকারী। কারণ তত দিনে কুরপালায় মিলিটারি ক্যাম্প বসেছে। তারাকান্দরের নদী পার হলেই কাকডাঙ্গা-গোপালপুরে সামরিক বাহিনী সহায়তাকারী রাজাকার, আলবদর বাহিনীতে ভরে গেছে। সমগ্র কোটালীপাড়ায় তারা ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছে। মাঝবাড়ি, হিরনে পিস কমিটি হয়েছে। তারাশীর বেবাজিয়া বা সওদাগর সম্প্র্রদায় নিম্নবর্গের বিধায় এবারে তারা চূড়ান্ত হামলার চেষ্টা করছে। তাদের বাইদা বলে যে হেলাফেলা করা হতো এবারে তারা যেন তার শোধ নিতে মরিয়া। তারা যে যার মতো লুটপাট ডাকাতি করছে হিন্দুবাড়িতে। এই এলাকায় তখন দেশের বিভিন্ন স্হান থেকে আশ্রয় নিতে আসা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বিলের মধ্যে বিভিন্ন বাড়িতে আশ্রয় নিতে আসছে বিভিন্ন এলাকা থেকে। এ খবর শুনে ফেলে পার্শ্ববর্তী গোপালপুর পূর্ণবতী গ্রামের রাজাকার-আলবদররা। এরপর তারা কোটালীপাড়া থানা থেকে তিনটি গানবোটে ঘাঘর নদী দিয়ে ১১ জন পাকিস্তানি সেনা গোপালপুর আসে। সেখানে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে অপেক্ষা করছিল স্হানীয় দোসর রাজাকারদের অনেকে। তাদের ইশারায় পাকিস্তানি বাহিনী প্রস্ত্ততি নেয় তারাকান্দর আক্রমণের। তারাকান্দরের লোকজন তখন মর্টার বা মেশিনগানের শক্তির ব্যাপারে একদম অজ্ঞ ছিল। তারাকান্দর ধারাবাসাইল কান্দির লোকজন যখন ঢাল সড়কি নিয়ে পাকিবাহিনীকে প্রতিরোধ করতে তত্পর তখনই পাকিস্তানি বর্বররা দেশীয় রাজাকার, আলবদরদের সহায়তায় ভারী মেশিনগানের গুলি ও মর্টার শেল ছুড়তে থাকে তারাকান্দরের দিকে। মাত্র ১ কিলোমিটার ব্যবধানে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হাজার খানেক মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর ভারী অস্ত্রের সামনে আর টিকতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হয়। অস্ত্র রেখে পেছন দিকে যে যেভাবে পারে পালাতে থাকে। এই সুযোগে স্হানীয় রাজাকার, আলবদররা পাকিস্তানি বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকে পড়ে তারাকান্দর গ্রামে। প্রতিরোধকারী যোদ্ধাদের ফেলে আসা রামদা, কুড়াল, বল্লম দিয়ে শতাধিক মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা। বেলা ১১টায় শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে হত্যাযজ্ঞ। শহিদ হন দুই শতাধিক নারী-পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ। সেই নৃশংসতার নীরব সাক্ষী পুরো তারাকান্দর গ্রাম, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ এবং সেই সময় মৃতু্যর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা জগদীশ বৈদ্য।

তারাকান্দর গ্রামের নটোবর রায়ের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়ির সামনে পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে একটা ডোবার মধ্যে পালিয়েছিল ৯ জন। তাদের কাউকে গুলি করে, কাউকে কুপিয়ে, চোখ তুলে নানাভাবে নির্যাতন করে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা। তাদের মধ্যে ডহরপাড়া গ্রামের নরেন দাঁড়িয়া, তার স্ত্রী, মা এবং চিন্তা দাঁড়িয়া ও তার ছেলে ছিল।’ এ ছাড়া ছিল দর্শন রায়, তার স্ত্রী ও মেয়ে এবং মনমোহন রায়ের ছেলে হরলাল রায়। সেই ভয়াল দৃশ্যের কথা এখনো মনে পড়লে যেন আঁতকে ওঠেন তিনি। তারাকান্দর খালের পশ্চিম পাড়ে বিষ্ণু রায়ের স্ত্রীকে গুলিবিদ্ধ অবস্হায় মৃত পাওয়া যায়। এভাবে তারাকান্দর বৈদ্যবাড়ি, রায়বাড়ি, বিশ্বাসবাড়ির দক্ষিণ পাশের মাঠে ও পুকুরপাড়ে সারি সারি লাশ দেখা যায়। যে শহিদদের লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তাদের মধ্যে রাধিকা বৈদ্য, বিশ্বনাথ বৈদ্যর স্ত্রী পরিষ্কার বৈদ্য এবং তার দুই মেয়ে, পচু মণ্ডলের স্ত্রী, কুটিশ্বর মণ্ডল, লক্ষ্মণ বিশ্বাস, দীনেশ হালদার, পোকাই, কালু বালা, বিমল ঢালীর মা, মহেন্দ্র বৈদ্য, তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে এবং রাজেশ বাড়ৈর স্ত্রী। এ ছাড়া নাম না-জানা এলাকা ও এলাকার বাইরের বহু লোককে সেদিন এই তারাকান্দর বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়। এর পাশাপাশি নারী নির্যাতন, লুটপাট ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা। আজ পর্যন্ত সেই গণহত্যার স্পট চিহ্নিত হয়নি। হয়নি একটি স্মৃতি ফলকও। যাদের আত্মদানে এ দেশ স্বাধীন—এর মধ্যে তারাকান্দরের মানুষও রয়েছে। তাহলে এখানে একটা স্মৃতিফলক হতে সমস্যা কোথায়? বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তিতে তারাকান্দর গ্রামে এটা হওয়া জরুরি।

সেই যুদ্ধের একজন অকুতোভয় যোদ্ধা জগদীশ বৈদ্য। বয়স তার ৭৫ ছুঁই ছুঁই। শত্রুর তাড়া খেয়ে ঐ দিন আশ্রয় নিয়েছিলেন একটা কচুরিপানাভর্তি ডোবার মধ্যে। তার এক হাতে রামদা, অন্য হাতে বল্লম (এক ধরনের দেশীয় অস্ত্র)। শত্রুরা তার হাতের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে একই উপর্যুপরি কুপিয়ে চলে যায়। কিন্তু ৩৪টি কোপ খেয়েও বেঁচে আছেন জগদীশ বৈদ্য। জীবনের নিরাপত্তার জন্য পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে যশোরের বাসুন্দিয়ায় আশ্রয় নেন। সেখানে এখন দিনমজুরি করে সংসার চলে তার। ভিয়েতনামের মাইলাই বা চেকের বধ্যভূমি ও গণহত্যার চেয়ে তারাকান্দ কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। দেশ স্বাধীনের ৫০ বছর পার হয়ে যাচ্ছে। আজ পর্যন্ত জগদীশ বৈদ্যরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাননি। কোনো শহিদের নাম কেউ মনে রাখেনি। তাদের নাম ঠাঁই পায়নি ইতিহাসেও। এমনকি তারাকান্দর এই গণহত্যার কথা মানুষ জানেও না। আজ পর্যন্ত এ শহিদদের নামে কোনো স্মৃতিফলক নির্মিত হয়নি। এই শহিদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা না হলে পরবর্তী প্রজন্ম জানবে না একাত্তরের এই বীরত্বগাথা। স্বাধীনতার চেতনা বিকাশে এ কাজটি খুবই জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন