সামাজিক অপরাধ বাড়িতেছে কেন?

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২২, ১০:২০

এমনিতেই উন্নয়নশীল বিশ্বে অপরাধপ্রবণতা অধিক। বিশেষ করিয়া খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতির মতো সামাজিক অপরাধ। ইহার প্রধান কারণ, আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকা, মৌলিক চাহিদা পূরণ না হওয়া, রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকা ইত্যাদি। উন্নয়নশীল দেশগুলির দিকে তাকাইলেই দেখা যায়, সামাজিক অপরাধ অনেকটা ব্যারোমিটারের মতো কাজ করিয়া থাকে। যখন অর্থনীতিতে কিছুটা সক্ষমতা আসে তখন অপরাধ কমিয়া যায়, আবার দুর্বল অর্থনীতি আরো দুর্বল হইলে সামাজিক অপরাধ তীব্র হইয়া উঠে। অর্থাৎ অপরাধের সহিত দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার একটি নিবিড় যোগাযোগ রহিয়াছে। ইহার হাতেনাতে প্রমাণ হইল, বিশ্বের সবচাইতে কম অপরাধের কয়েকটি দেশ হইল—সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, জাপান, নিউজিল্যান্ড ও নেদারল্যান্ড। লক্ষণীয়, ইহার কোনো উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশ নহে। অন্যদিকে সর্বাধিক অপরাধের দেশ পাপুয়া নিউগিনি, জ্যামাইকা, গিনি, আফগানিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, হন্ডুরাসের মতো দেশগুলি। ইহার কোনো দেশই অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল নহে।

বাংলাদেশও ইহার ব্যতিক্রম নহে। এই মুহূর্তে দেশে বিগত দিনের চাইতে সামাজিক অপরাধ অনেক গুণ বাড়িয়াছে বলিয়া সমাজবিজ্ঞানীরা মত প্রকাশ করিতেছেন। প্রতিদিন পত্রপত্রিকা খুলিলেই আমরা দেখিতে পাই, হত্যা-ছিনতাইয়ের সংবাদে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠা ভরিয়া আছে। শুধু যে সড়কে বা ওভারব্রিজে অথবা ঘর হইতে বাহির হইলে অপরাধের সম্মুখীন হইতেছে মানুষ তাহা নহে, পরিবারের অভ্যন্তরেও অপরাধ সংঘটনের মাত্রা বাড়িয়াছে ব্যাপক হারে। ইহার পেছনেও যে অর্থনৈতিক হতাশা একটি বড় কারণ তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। ইহার মধ্যে আবার নূতন উপদ্রব হইয়া উঠিয়াছে কিশোর অপরাধ, যাহাদের বিচারের অওতায় আনাও সম্ভব নহে। ইহার সহিত নারী ও শিশু ধর্ষণের সংখ্যাও বাড়িয়াছে আশঙ্কাজনক হারে। ইহারও একটি বড় অংশের সহিত অর্থনৈতিক হতাশা রহিয়াছে। মাদকাসক্তি এবং মাদকাসক্তি হইতে উদ্ভূত অপরাধের পিছনেও বড় ভূমিকা রহিয়াছে অর্থনৈতিক হতাশার।

বাংলাদেশেও করোনা-পরবর্তী পরিস্হিতিতে অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগিয়াছে। অসংখ্য মানুষ কর্ম হারাইয়াছে। বেকারত্ব, অসচ্ছলতা বহু ঘরে নূতন করিয়া উঁকি দিয়াছে। সুতরাং দেশে অপরাধ কমাইতে হইলে অর্থনীতির গতি ফিরাইতে হইবে, দ্রব্যমূল্য যে করিয়াই হউক মানুষের হাতের নাগালে রাখিতে হইবে। তবে এই বক্তব্যের পাশাপাশি ইহাও স্বীকার করিতে হইবে যে, কেবল অর্থনৈতিক অবস্থা নহে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অস্হিরতাও অপরাধ বৃদ্ধি করিয়া থাকে। পুলিশ সদর দপ্তর হইতে একাধিকবার জেলা পুলিশের নিকট অপরাধ দমনে দিকনির্দেশনা পাঠানো হইয়াছে; কিন্তু তা এখনো তেমন ইতিবাচক ফল দিতে পারে নাই।

আমরা মনে করি, সরকারকে ইহার সহিত গোটা কয়েক বিষয়ে গুরুত্বারোপ করিলে অচিরে অপরাধ কমাইয়া আনা সম্ভব হইবে। ইহার মধ্যে প্রধান দ্রব্যমূল্য নাগালের মধ্যে রাখা, নূতন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আইন প্রয়োগে আপস না করা। আমাদের মনে রাখিতে হইবে, যে কোনো ধরনের অপরাধ কেবল মানুষের শান্িততে জীবনযাপনের অন্তরায়ই নহে, উহা অগ্রগতিরও অন্তরায়। ইহা বিনিয়োগকেও ব্যাহত করিয়া থাকে। সামাজিক বিজ্ঞানের কথা মাথায় রাখিয়া বলা যায়, একটি অপরাধ আরেকটি অপরাধকে ডাকিয়া আনে। সুতরাং অপরাধ শূন্যের কোঠায় নামাইয়া আনা এই মুহূর্তে সম্ভব না হইলেও সহনীয় স্তরে লইয়া আসা দায়িত্বশীলদের একটি জরুরি কর্তব্য হইয়া পড়িয়াছে। 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন