আধুনিক বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২২, ১০:২৯

একটি দেশ কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে বেড়ে ওঠে তখনই, যখন রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত পরিকল্পনা ও নীতিতে স্থান পায় নাগরিকের দায়িত্বভার গ্রহণের বিষয়। এসব পরিকল্পনা ও নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্র নাগরিকের অধিকতর দায়িত্ব নিতে শুরু করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে ১০ মাসের মধ্যে একটি সংবিধান উপহার দেন। এ সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে অর্থাৎ ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ শীর্ষক অধ্যায়ের ১৫-এর ‘ঘ’ অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উত্পাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্ত্তগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন।’ এ থেকে বোঝা যায় জনগণের প্রতি বঙ্গবন্ধু কতটা প্রতিশ্রুতিমান ও দায়বদ্ধ ছিলেন। শুধু তা-ই নয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে এমনি মহত্ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তিনি নানা কার্যক্রম গ্রহণ করেছিলেন এবং বাস্তবায়নও শুরু করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীর (বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলা) রামগতি উপজেলার চরপোড়া গ্রামে ভূমি ও গৃহহীন অসহায় ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসন কার্যক্রমের যাত্রা শুরু করেছিলেন। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৭৩-৭৮) সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক উন্নয়নের বিষয়গুলোও অন্তভু‌র্ক্ত করেছিলেন তিনি। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে তার সরকারের গৃহীত প্রায় সব উদ্যোগই বাতিল করা হয় অথবা ফাইল বন্দি করে রাখা হয়।

বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে বাংলাদেশের কল্যাণরাষ্ট্র ও দারিদ্র্য বিমোচনের পথে যাত্রা শুরু হয় নব্বইয়ের দশকে। দীর্ঘ ২১ বছরের সংগ্রামের ধারবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে দেশের জনগণ জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রাখে। ঐ বছর ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হওয়ার পর পরিকল্পনা ও নীতিতে স্থান পায় সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক উন্নয়নের বিষয়গুলো। মূলত সেই সময় থেকেই রাষ্ট্র নাগরিকের কল্যাণে অধিকতর দায়িত্ব নিতে শুরু করে। গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষের জন্য আশ্রয়ণ, ঘরে ফেরা, একটি বাড়ি, একটি খামার, বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতার মতো কর্মসূচিগুলো চালু করা হয়। পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে মেয়েদের জন্য বৃত্তি এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে বই বিতরণ শুরু হয়। তবে লক্ষণীয় যে, দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাসে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর পরিধি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে ২০০৯ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রূপকল্প ২০২১-এর মূল উপজীব্য হিসেবে ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তবায়ন শুরু হলো। সুনির্দিষ্ট সময়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারিত থাকায় পরিকল্পনা ও নীতিতে বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয় অন্তভু‌র্ক্তিমূলক উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও সুবিধার মাত্রা আরো সম্প্রসারণের ওপর।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে এতটাই সম্প্রসারিত করেছেন যে, ২০২০-২১ অর্থবছরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশে কাজের বিনিময়ে দুস্হ ভাতাসহ ১২৩টির মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চলছে। এতে বাজেট বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রায় আড়াই শতাংশের বেশি। বর্তমান সরকারের নানা উদ্যোগের সঙ্গে সর্বশেষ উদ্যোগ সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর উদ্যোগটি সর্বমহলে সমাদৃত হচ্ছে। তিনি দেশের মানুষকে নিয়ে কতটা ভাবেন এটা তার প্রমাণ। সব শ্রেণি পেশার মানুষকে পেনশনের আওতায় নিয়ে আসার এক অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তিনি। গণমুখী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার কীভাবে দেশের অসহায় ছিন্নমূল মানুষের জন্য কাজ করছেন তার অসংখ্য নজির ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের কথাই ধরা যাক। একটি গৃহ কীভাবে সামগ্রিক পরিবার কল্যাণে এবং সামাজিক উন্নয়নের হাতিয়ার হতে পারে তার অনন্য দৃষ্টান্ত আশ্রয়ণ প্রকল্প। সর্বশেষ অগ্রগতিসহ ব্যারাক ও একক গৃহে এ পর্যন্ত ৪ লক্ষ ৪২ হাজার ৬০৮ ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এ থেকে বাদ যায়নি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মানুষও। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতাধীন সমতলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীভুক্ত ৪ হাজার ৮৩২ পরিবারের জন্য গৃহনির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ে বসবাসরত ৮ হাজার ১০৬ পরিবারকেও গৃহ প্রদান করা হয়েছে। তাদের পেশা উপযোগী প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করা হয়েছে।

সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির প্রভাব কতটা তা রংপুর অঞ্চলের দুঃখ—মঙ্গা দূর হওয়া থেকেই উপলব্ধি করা যায়। একসময় ঐ অঞ্চলের মানুষের কাছে মঙ্গা ছিল অভিশাপ। আশ্বিন থেকেই শুরু হয়ে যেত অভাব। থাকত অগ্রহায়ণের শুরু পর্যন্ত। এই আকালকে রংপুরে স্থানীয় ভাষায় বলা হতো মঙ্গা। প্রতি বছরই এ অঞ্চলে মঙ্গার কবলে পড়ে মানুষ কচুঘেঁচু খেয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করত। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি যেমন চরাঞ্চলে বিভিন্ন ফসল ও সবজির আবাদ করা, বেকার যুবক-যুবতিদের কর্মসংস্থানে ক্ষুদ্রঋণ প্রদান, ঘরে ঘরে কারুপণ্য গড়ে ওঠা ইত্যাদি কারণে পালটে গেছে দৃশ্যপট। অভিধানে ‘মঙ্গা’ থাকলেও বাস্তবে এটি আর নেই।

ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় আর্থসামাজিক ব্যবধান কমিয়ে আনা হয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এগিয়ে নিতে মেবাইল ব্যাংকিং সেবাবহিভূ‌র্ত অধিকাংশ (প্রায় ৬০ শতাংশ) মানুষকে (যাদের আবার অধিকাংশই গ্রামের মানুষ) ব্যাংকিং সেবার অন্তর্ভুক্ত করেছে। ১০ বছর আগে চালু হওয়া মোবাইল ব্যাংকিং খাতে নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা ৯ কোটি ৬৪ লাখ এবং ২০২১ সালের এপ্রিলে লেনদেন হয় ৬৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসসূচির আওতায় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস নগদ ও বিকাশের মাধ্যমে সরাসরি ৮৮ লাখ ৫০ হাজার ভাতাভোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। ভাতাভোগীদের মধ্যে রয়েছে ৪৯ লাখ বয়স্ক মানুষ, ২০ দশমিক ৫০ লাখ বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা এবং ১৮ লাখ প্রতিবন্ধী। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে প্রতিবন্ধী, হিজড়া, বেদে ও অনগ্রসরদের।

বর্তমান সরকার রূপকল্প ২০৪১ ঘোষণা করে তার বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। এ রূপকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। একই সময়ে একটি দারিদ্র্যশূন্য দেশ উপহার দেওয়া। ‘রূপকল্প ২০৪১’কে নীতিমালা ও কর্মসূচিসহ একটি উন্নয়ন কৌশলে রূপান্তরের জন্য এ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ দলিল মূলত ২০৪১ সালের মধ্যে এক সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ অর্জনে সরকারের উন্নয়ন রূপকল্প, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যসমূহের একটি কৌশলগত বিবৃতি এবং তা বাস্তবায়নের পথনকশা। চারটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, যেমন, সুশাসন, গণতন্ত্র, বিকেন্দ্রীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ পরিকল্পনার সুফলভোগী হবে জনগণ এবং এরাই হবে প্রবৃদ্ধি ও রূপান্তর প্রক্রিয়ার প্রধান চালিকাশক্তি।

দারিদ্র্যশূন্য দেশ গড়তে প্রবৃদ্ধিকে হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দারিদ্র্য নিরসনমূলক। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সঙ্গে সংগতি রেখে দারিদ্র্য নিরসনের অভীষ্ট হলো : ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য নির্মূল করা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে দারিদ্রে্যর হার নূ্যনতম পর্যায়ে (৩ শতাংশ বা এর নিচে) নিয়ে আসা। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের সব নাগরিকের নূ্যনতম জীবনমান নিশ্চিত করা হবে। কর্মসন্ধানী নাগরিকদের কাজ থেকে আয়ের ব্যবস্থা এবং বয়স ও দৈহিক কারণে কর্মক্ষম নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষা সহায়তা প্রদান করা হবে। বেকারত্ব অতীতের বিষয় বলে গণ্য হবে। অন্যান্য উচ্চ আয়ের অর্থনীতির মতো দারিদ্র্য হয়ে পড়বে একটি আপেক্ষিক ধারণা মাত্র। এ রকম পরিস্থিতিতে যারা দরিদ্র বিবেচিত হবে তাদেরও অন্তত খাদ্যচাহিদা মেটানোর পর জীবনধারণের নূ্যনতম সামগ্রী কেনার মতো পর্যাপ্ত আয় থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দারিদ্র্য বিমোচন মডেল বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশ কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে বেড়ে উঠছে। গণমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা, নীতি ও কৌশল বাস্তবায়নের কারণে বাংলাদেশ একদিকে উন্নয়ন অভিযাত্রায় গৌরবময় অধ্যায় পার করেছে, অপরদিকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের অধিকতর দায়িত্ব গ্রহণে একের পর কর্মসূচির বাস্তবায়নের ফলে দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাসে অভাবনীয় উন্নতি হচ্ছে। উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালের আগেই দেশ হবে দারিদ্র্যশূন্য।

লেখক: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন