তাহাদেরও দাঁড়াইতে হইবে ইতিহাসের কাঠগড়ায়

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২২, ১১:১১

যুদ্ধ কেন হয়? মানুষ যখন সভ্য হইয়া উঠে নাই, তখনও আধিপত্য বিস্তারের জন্য কাদা-ছোড়াছুড়ি করিয়াছে। প্রস্তরযুগ হইতে শুরু করিয়া আধুনিক এই তথাকথিত সভ্য সময় পর্যন্ত মানুষ লক্ষাধিক বড় বড় যুদ্ধ করিয়াছে। এই জন্য অনেক ইতিহাসবেত্তা বলিয়া থাকেন, মানবজাতির ইতিহাস মূলত যুদ্ধের ইতিহাস। ‘ওর্য়াল্ড বিয়ন্ড ওয়ার’ সংস্থা হইতে জানা যায়, ৫০০ খ্িরষ্টপূর্ব হইতে ২০০০ খ্িরষ্টাব্দের মধ্যে সহস্রাধিক প্রধান প্রধান যুদ্ধ সংঘটিত হইবার ইতিহাস নথিভুক্ত হইয়াছে। বিংশ শতাব্দীতে আনুমানিক ১৬৫টি যুদ্ধে প্রায় ২৫ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ মারা গিয়াছে। দুঃখজনকভাবে বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন যুদ্ধে নিহতের ৭৫ শতাংশই হলেন বেসমারিক নাগরিক—যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং দরিদ্র মানুষ। গত শতাব্দী হইতে ২০১৪ সাল অবধি বিশ্বের পরাশক্তিরা মিলিয়া আফগানিস্তান, অ্যাঙ্গোলা, আর্জেন্টিনা, বসনিয়া, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গ্রেনাডা, হাইতি, ইরান, ইরাক, কসোভো, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া, নিকারাগুয়া, পাকিস্তান, পানামা, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া, ইউক্রেন, ইয়েমেন, সাবেক যুগোস্লাভিয়া এবং সম্প্রতি ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশে সময়ে সময়ে নির্মম যুদ্ধাবস্থা তৈরি করিয়াছে। চলতি সময়ে চলমান একটি যুদ্ধে মাত্র কয়েক সপ্তাহেই মৃতু্য হইয়াছে ৯ শতাধিক বেসামরিক মানুষের। আহত হইয়াছে আরো প্রায় দেড় হাজার মানুষ।

ক্ষমতা মদমত্তে মানুষের মনস্তত্ত্ব জটিল হইয়া যায়। এই জন্য বলা হয়—যুদ্ধ মূলত আয়োজিত হয় মানুষের মনে। প্রাচীনকালে দেখা যাইত সাধারণত, একটি একক মানুষের মনেই যুদ্ধেচ্ছা জাগিত। ক্রমশ তিনি তাহা ছড়াইয়া দিতেন তাহার গোষ্ঠীতে। যিনি নিজের ইচ্ছা বিবিধে সঞ্চারিত করিতে পারেন তিনি অবশ্যই নেতা। যিনি শক্তিতে প্রবল, তাহার মধ্যেই নিরাপত্তাহীনতাজনিত সংশয় ও ভীতির উপস্হিতিও প্রবল। মানুষ শুরুতে থাকিত গুহায়। প্রাচীনকালে মানুষ বুদ্ধি খাটাইয়া সংঘবদ্ধভাবে বসবাসের অভ্যাস করিল। প্রকৃতিগতভাবেই গোষ্ঠী হইলেই তাহার নেতা প্রয়োজন হয়। এই নেতা অবশ্যই পুরুষ, কারণ বাহ্যিকভাবে দৈহিক শক্তিই পশুবত্ তত্কালীন মানুষের সেরা স্বীকৃত গুণ ছিল। তাহা ছিল অবশ্যই রজোগুণ। যেই গোষ্ঠী শান্ত, স্বাভাবিক জীবন যাপন করিত, তাহার নেতা অবশ্যই সত্ত্বগুণসম্পন্ন ব্যক্তি। রজোগুণের যেই সমস্ত ইঙ্গিত অশান্িত ডাকিয়া আনিত তাহা সহজেই অনুমান করা যায়। এই অশান্িত বা যুদ্ধের প্রধান দুইটি উপাদান হইল—খাদ্যসম্পদ ও নারী। তবে ইহা তো আদি মানুষের যুদ্ধ; কিন্তু মানুষ যখন ক্রমশ সভ্য হইতে থাকে তখন যুদ্ধের ভূগোল ও উপকরণ পরিবর্তিত হইতে থাকে। সভ্যতা নামক এক ফানুসে চাপিয়া যুদ্ধে সম্পৃৃক্ত হইতে হইতে সমাজ অগ্রসর হইতেছিল। মূলত কৃষিজমির সংকুলতা ভৌগোলিক স্থান নির্বাচন ছিল যুদ্ধের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিজ্ঞানের সহিত যুদ্ধের এক সমানুপাতিক সম্পর্ক। প্রযুক্তির যত উন্নয়ন যুদ্ধের তত বিকাশ ঘটিয়াছে।

আমরা আবার প্রশ্ন তুলিতে পারি—অসভ্য হইতে সভ্য হওয়া পর্যন্ত মানবজাতি প্রতিটি মানুষের জীবনরক্ষা তথা উপকার করিবার জন্যই তো অধিক মনোযোগী হইতে পারিত। উপকারের পরিবর্তে কেন মানুষ নিজেদের ক্ষমতা দেখাইতে এত অধিক অস্হির? অথচ অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যাকে সবচাইতে বড় পাপ বলিয়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছেন মহান সৃষ্টিকর্তা। নরহত্যার ভয়ানক পরিণাম সম্পর্কে সুরা আল-মায়িদার ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে—একজন নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা গোটা মানবজাতিকে হত্যা করিবারই নামান্তর। আর কোনো ব্যক্তি যদি কাহারো প্রাণ রক্ষা করেন, তিনি যেন পৃথিবীর সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করিলেন।

এখন যাহারা যুদ্ধাপরাধ করিতেছেন, যাহাদের যুদ্ধোন্মাদনার জন্য হাজার হাজার নিরীহ প্রাণ বলি হইতেছে, তাহাদেরও একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াইতে হইবে। এখন শুধু যুদ্ধের ঘটনাবলির প্রকাশ হইতেছে। এই সকল যুদ্ধাপরাধের ইতিহাস তো লিখা হইবে শত বত্সর পর। ইতিহাসের নিকট কোনো অপরাধের ক্ষমা নাই। 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন