ক্রিকেটে বিজয় এবং বাংলাদেশের দুর্নিবার অগ্রযাত্রা

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২২, ১৫:০৬

দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে স্বাগতিকদের পরাজিত করিয়া ইতিহাস গড়িয়াছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। ইহা যেন অবিশ্বাস্য, অভাবনীয় এক দৃশ্য। সেঞ্চুরিয়ানের সুপারস্পোর্ট পার্কে বাংলাদেশের ফাস্ট বোলার তাসকিন আহমেদের বিধ্বংসী বোলিংয়ে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইন আপ হইয়াছে ছারখার। ধ্বংসের তাণ্ডবলীলায় একে একে তুলিয়া লইয়াছেন দক্ষিণ আফ্রিকার পাঁচটি উইকেট। তাসকিন আহমেদের এই অসাধারণ মনোমুগ্ধকর পারফরম্যান্স আরো একবার আমাদের স্মরণ করাইয়া দেয়, মানুষ যদি কঠোর অধ্যবসায়, সাধনা আর প্রচেষ্টার সহিত লাগিয়া থাকে, তাহা হইলে তাহার পক্ষে যে কোনো কিছুই জয় করা সম্ভব।

তাসকিন আহমেদের ক্যারিয়ারে খারাপ সময় গিয়াছে, দিনের পর দিন তিনি দলে জায়গা করিয়া লইতে পারেন নাই; কিন্তু তিনি হতাশ না হইয়া, ভাঙিয়া না পড়িয়া নিজেকে গড়িয়া তুলিয়াছেন। দলে শুধু তিনি জায়গাই করিয়া লন নাই, গত এক বৎসর ধরিয়া ধারাবাহিক সাফল্য উপহার দিয়া যাইতেছেন। শুধু তাসকিন আহমেদই নহে, বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানও অসাধারণ নৈপুণ্য দেখাইয়াছেন দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে। ভাবিতে গেলে বিস্মিত না হইয়া পারা যায় না, বাংলাদেশের একজন খেলোয়াড় নিজেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন উচ্চতায় লইয়া গিয়াছেন, যেইখান হইতে সহসাই কেহই তাহাকে নামাইতে পারিবেন না। এই জয় কেবল ক্রিকেটের জয় নহে, জাতি হিসাবে বাঙালি জাতি কতটা আগাইয়া গিয়াছে তাহারই যেন প্রতিচ্ছবি হইয়া উঠিল।

স্বাধীনতা অর্জনের অর্ধশতাব্দী পার করিয়াছে বাংলাদেশ। সংখ্যার বিচারে সময়টা অনেক অধিক না হইলেও এই সময়ের মধ্যেই দেশে অভাবনীয় উন্নয়ন-অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে। চলার পথে অসংখ্য বাধাবিপত্তি-প্রতিকূলতা আসিয়াছে, তাহার পরও আমাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রহিয়াছে। অথচ বাঙালিদের ব্যাপারে একদল সমালোচক বলিয়া থাকেন, তাহারা অপদার্থ, অকর্মণ্য, মেধাহীন জাতি। অস্বীকার করিবার উপায় নাই, আমাদের নানাবিধ সীমাবদ্ধতা রহিয়াছে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেকটা ক্ষোভের সহিতই লিখিয়াছিলেন, শীর্ণ শান্ত সাধু তব পুত্রদের ধরে/ দাও সবে গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া ক’রে/ সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,/ রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ কর নি। তাহার পরও বাঙালি জাতি বারবার নিজেদের প্রমাণ করিয়াছে। পরাধীনতার করালগ্রাস হইতে স্বাধীনতা অর্জন করিবার প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাই বলিয়াছিলেন, আমার ৭ কোটি বাঙালি আজ মানুষ হইয়াছে।

বঙ্গবন্ধু যে বাঙালিদের বিষয়ে বাড়াইয়া কিছু বলেন নাই তাহার প্রমাণ, অনুন্নত দেশ হইতে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠিয়া আসা আজকের বাংলাদেশ। দেশের সর্বত্র এখন উন্নয়ন আর কর্মের মহাযজ্ঞ। রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট হইতে শুরু করিয়া দোকানপাট-ঘরবাড়ি— সর্বত্রই বিদ্যুতের ছোঁয়া। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসাবে শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আসিবার গৌরব বাংলাদেশের। দেশে বড় বড় মেগা প্রজেক্ট চলমান রহিয়াছে, যাহার সুফল ইতিমধ্যেই দেশবাসী পাইতে শুরু করিয়াছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান হইতেছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। দেশের নেতৃত্বে নূতন প্রজন্ম আসিতেছে, সরকারি-বেসরকারি—সকল খাতেই তাই পরিবর্তন লক্ষ করা যাইতেছে। নূতন প্রজন্ম মানেই নূতন চিন্তাভাবনা আর আইডিয়া, তাহাদের সৃজনশীল ভাবনা এবং আইডিয়া দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করিতেছে। বাংলাদেশের এই তরুণ প্রজন্ম শুধু ক্রিকেটেই বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় তুলিয়া লইয়া যায় নাই, বরং অন্যান্য সেক্টরেও অভাবনীয় সাফল্যের অংশীদার করিতেছে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির এই ধারা সমুন্নত রাখিতে হইলে আমাদের শিক্ষা, গবেষণা, সার্বিক শৃঙ্খলা এবং রাজনীতিকে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক কাঠামোতে লইয়া আসিতে হইবে। ইহার জন্য দেশের যারা নীতিনির্ধারক রহিয়াছেন তাহাদের ঠাণ্ডা মাথায়, ধৈর্য সহকারে সামনে আগাইতে হইবে। নূতন প্রজন্ম যাহাতে তাহাদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাইতে পারে, সেই পরিবেশ সৃষ্টি করিতে হইবে। সর্বত্র ডিসিপ্লিন প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিলেই বাংলাদেশ একদিন আকাশে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতে সক্ষম হইবে।

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন