পুতিনের একটি ঐতিহাসিক ভুল

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২২, ১৪:৩৯

২০০০ সালের গোড়ার দিকের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কোনো সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে আমি ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাত করি। তিনি তখন রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। সে সময় আমরা যারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রশাসনে কাজ করতাম, আমরা কেউই তার ব্যাপারে খুব বেশি কিছু জানতাম না।

শুধু এটুকু জানতাম যে, পুতিন তার ক্যারিয়ার শুরু করেছেন রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির সদস্য হিসেবে। আমি আশা করেছিলাম, এই বৈঠক সেই লোকটিকে আদ্যপ্রান্ত জানতে এবং চেচনিয়া যুদ্ধের সময় মার্কিন-রাশিয়ার সম্পর্ক কেন আকস্মিকভাবে অবনতি হলো, তা বুঝতে ও মূল্যায়ন করতে সহায়তা করবে। কিন্তু ক্রেমলিনে একটি ছোট্ট টেবিলের পাশে তার কাছাকাছি বসে আমি তাৎক্ষণিকভাবে ভ্যাবাচ্যাকা খেলাম। পুতিন ও তার পূর্বসূরি বোমাবাজ বরিস ইয়েলত্সিন তো এক নন।

বরিস ইয়েলত্সিন যেখানে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন, তর্জন-গর্জন করেন এবং তোষামোদি করেন, সেখানে পুতিন কথা বলে যাচ্ছেন আবেগপ্রবণ ও কোনো প্রকার নোট ছাড়াই। রাশিয়ার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং চেচেন বিদ্রোহীদের দমন করার কথা তিনি দৃঢ় সংকল্পচিত্তেই বললেন। দেশে ফিরে আমি পুতিন সম্পর্কে আমার অভিব্যক্তি ব্যক্ত করলাম এভাবে— ‘পুতিন একটা খাটো ও ফ্যাকাশে লোক।’ তার সম্পর্কে লিখলাম, ‘এত ঠান্ডা লোক যে, অনেকটা সরীসৃপের মতো।’ পুতিন দাবি করেছিলেন, জার্মানির বার্লিন প্রাচীর কেন তুরুপের তাসের মতো ভেঙে পড়ল তা তিনি বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন তার কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত। তার দেশের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে তাতে তিনি যারপরনাই বিরক্ত এবং দেশের গৌরব পুনরুদ্ধারে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

সে সময় আমি পুতিনের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠক করি। সাম্প্রতিক কয়েক মাস থেকে সেই ঘটনা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে যখন থেকে তিনি প্রতিবেশী ইউক্রেনের সীমান্ত এলাকায় নিজের সৈন্য-সামন্ত জড়ো করতে শুরু করেছেন, তখন থেকে সেই স্মৃতি আরো বেশি মনে পড়ছে। জাতির উদ্দেশে টেলিভিশনে দেওয়া একটি উদ্ভট ভাষণে তিনি ইউক্রেন রাষ্ট্র সম্পর্কে কল্পকাহিনির অবতারণা করলেন। এরপর ইউক্রেনের দুটি বিচ্ছিন্নতাবাদী-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়ে বসলেন। একই সঙ্গে সেখানে সৈন্য পাঠিয়ে দিলেন। একজন সংশোধনবাদী হিসেবে পুতিনের অযৌক্তিক দাবি হলো ‘ইউক্রেন সম্পূর্ণভাবে রাশিয়া দ্বারা তৈরি।’ রাশিয়ান সাম্রাজ্য থেকে ইউক্রেনকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে—এমন হাস্যকর দাবি বিশ্ব সম্পর্কে তার বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেই কেবল সংগতিপূর্ণ। আমার কছে বিষয়টা একেবারেই বিরক্তিকর। এটা ছিল ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় হামলা চালানোর একটা অজুহাত মাত্র। তিনি তা করেছেন এবং এটা একটা ঐতিহাসিক ভুল, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তার সঙ্গে আমাদের দেখা-সাক্ষাত হওয়ার দুই দশকের মধ্যে পুতিন তার নিজের পথ নির্ধারণ করেছেন। গণতান্ত্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে স্ট্যালিনের আদর্শের পথ ধরেছেন। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোকে নিজের কবজায় আনা এবং সেখানে রাশিয়ার আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি এরই মধ্যে নিজের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি সংগ্রহ করেছেন। এজন্য রাশিয়ার সম্ভাব্য নেতাদের হয় কো-অপ্ট করেছেন, নয়তো তাদের চূর্ণ করেছেন। অন্যান্য কতৃ‌র্ত্ববাদী শাসকদের মতো তিনি নিজের মঙ্গলকে জাতির সঙ্গে ও বিরোধিতাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার সঙ্গে একাকার করে ফেলেছেন। তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে, তার নিষ্ঠুরতা ও ক্ষমতার প্রতি লালসা উভয়ই আমেরিকানদের মধ্যেও প্রতিফলিত হতে দেখা যায় এবং আমরা এমন একটি বিশ্বে বসবাস করছি, যেখানে সবাই মিথ্যা বলে। সুতরাং তার সত্য বলার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের অঞ্চলে শক্তি প্রয়োগ করেই আধিপত্য বিস্তার করছে। তিনি মনে করেন, রাশিয়ারও একই অধিকার রয়েছে।

রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির সম্প্রসারণ, ন্যাটোকে দুর্বল করা এবং ইউরোপকে বিভক্ত করার নামে পুতিন বছরের পর বছর ধরে প্রকারান্তরে তার দেশেরই আন্তর্জাতিক সুনাম-সুখ্যাতি নষ্ট করেছেন। রাশিয়ার মহানতাকে প্রতিষ্ঠা করার পরিবর্তে ইউক্রেন আক্রমণ করার মাধ্যমে পুতিন আসলে নিজের কুখ্যাতিই কুড়ালেন। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তার দেশ কূটনৈতিকভাবে আরো বিচ্ছিন্ন, অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু এবং শক্তিশালী ও আরো ঐক্যবদ্ধ পশ্চিমা জোটের তত্পরতার মুখে কৌশলগতভাবে আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। ইউক্রেনের দুটি বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিটমহলকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ‘শান্িতরক্ষী’ হিসেবে সেখানে রাশিয়ান সৈন্য পাঠানোর মাধ্যমে পুতিন ইতিমধ্যে রাশিয়াকে দুর্বল করার পথকে আরো গতিশীল করেছেন। এখন তিনি দাবি তুলেছেন, দুটি ছিটমহলের স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে এটাই প্রমাণ করে যে, রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল এবং সেখানকার উন্নত অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করার কাজটি সঠিক ছিল।

পুতিনের এসব বেপরোয়া পদক্ষেপ রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার সূত্রপাত করেছে। যদি পুতিন ইউক্রেনে হামলা বাড়াতেই থাকেন এবং পুরো দেশ দখল করার চেষ্টা করেন, তবে আরো কিছু নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। এগুলো শুধু তার দেশের অর্থনীতিকেই নয় বরং তার দুর্নীতিবাজ বন্ধুদের শক্ত বূ্যহকেও ধ্বংস করবে, যারা একসময় তার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। একটি রক্তাক্ত ও বিপর্যয়কর যুদ্ধ রাশিয়ার নাগরিকদের জান-মালের যে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এই অবস্হায় রাশিয়ান জ্বালানির ওপর ইউরোপের বিপজ্জনক নির্ভরশীলতা হ্রাস করার জন্য জরুরি প্রণোদনা দেওয়ার এখনই সময়।

লেখক: ১৯৯৭ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন

সম্প্রতি প্রকাশিত ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ থেকে, ভাষান্তর :ফাইজুল ইসলাম

[নোট: সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ম্যাডেলিন অলব্রাইট গত ২৩ মার্চ ২০২২ মৃতু্যবরণ করেছেন। আমরা তার আত্মার শান্তি কামনা করি।]

ইত্তেফাক/এসজেড