এই পৃথিবী দানবের তরে নহে

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২২, ০৭:৩২

ইতিহাসের পাঠ লইলে আমরা দেখিতে পাই, দেশে দেশে স্বৈরাচার আসিয়াছে, তাহাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন-প্রতিরোধ গড়িয়া উঠিয়াছে। অনেক ক্ষেত্রে তাহাদের পতন হইয়াছে, আবার কোথাও কোথাও তাহারা দশকের পর দশক ধরিয়া টিকিয়া থাকিয়াছে। ইতিহাসে আমরা দেখিয়াছি—ক্ষমতার শিখরে পৌঁছাইয়া ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই ঘোষণা করিয়াছিলেন—‘আমিই রাষ্ট্র!’ বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিত্ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমায় আমরা দেখিয়াছি—সুচতুর রাজজ্যোতিষী পদ্য শুনাইয়াছিলেন :‘লগ্ন তো সম্রাটের হাতে/পঞ্জিকা কী বলে কী এসে যায় তাতে!’ অর্থাত্, প্রবল ক্ষমতাধর রাজা যাহা বলিবেন, তাহাই শেষ কথা, তাহাই আইন। অনেকে আবার তাহার দেশের নাগরিকদের উসকাইয়া দেয় যুদ্ধের জন্য। যেমন হিটলার বলিয়াছিলেন, ‘আই অফার ইউ স্ট্রাগল, ডেঞ্জার অ্যান্ড ডেথ।’ বিশ্বখ্যাত দার্শনিক ও লেখক বার্ট্রান্ড রাসেল ১৯৫৪ সালে রচনা করেন ‘নাইটমেয়ার্স অব এমিনেন্ট পারসন্স’ নামে একটি গ্রম্হ। এই বইতে পৃথিবীবিখ্যাত কিছু ব্যক্তির কল্পিত দুঃস্বপ্ন লিপিবদ্ধ করা হইয়াছে। বইয়ের একটি অধ্যায় ছিল—‘স্তালিনের দুঃস্বপ্ন’। এই লেখা রাসেল লিখিয়াছেন স্তালিনের মৃতু্যর এক বত্সর পর। কল্পিত গল্পের পটভূমি হইল এই রকম—তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হইয়াছে। স্তালিন এইবার হারিয়া গিয়াছেন। লাল মরিচ মেশানো এক গ্লাস সোমরস গলায় ঢালিয়া স্তালিন তাহার চেয়ারে ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন। ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া তিনি দুঃস্বপ্নটি দেখিতেছেন। তিনি দেখিলেন—ছোট্ট একটি গ্রামের আটপৌরে একটি ঘরে বন্দি তিনি। ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ। আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে স্তালিনের মনের পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা হইতেছে। স্তালিন রাগে ফাটিয়া পড়িয়া বলিতেছিলেন—‘ভদ্রমহোদয়গণ, জীবনের আনন্দের আপনারা কতটুকু জানেন? একটা গোটা জাতিকে ভীতসন্ত্রস্ত করিয়া রাখিবার মধ্যে কী মাদকতাময় সুখের অনুভূতি আছে, তাহা বুঝিবার ক্ষমতা কি রহিয়াছে আপনাদের? যখন বুঝিতে পারিলেন—সবাই আপনাকে ঘৃণা করিতেছে, কিন্তু প্রকাশ্যে সেই কথা বলিবার লেশমাত্র সাহস পাইতেছে না কেহ, তাহা এক নিবিড় আনন্দ। শুধু শত্রু নহে, ক্ষমতা রক্ষার জন্য বন্ধুকেও বিনাশ করা প্রয়োজন।’

প্রায় ৬৮ বত্সর পূর্বে রচিত এই গল্পের মধ্যে স্বৈরাচারদের মনস্তত্ত্বের এক অসাধারণ শ্লেষময় রূপ প্রকাশ পাইয়াছে, যাহা আজও প্রাসঙ্গিক। কয়েক দিন পূর্বে এই বিশ্বের এক যুদ্ধবাজের বিরুদ্ধে বলা হইয়াছে—তাহাকে অবশ্যই বিদায় লইতে হইবে। একজন স্বৈরাচার এতগুলি মানুষের অধিকার হরণ করিতে পারেন না। বিশ্ব জনমতের তোয়াক্কা না করিয়া এইভাবে নিরপরাধ নারী-শিশুসহ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা যায় না। কিন্তু বিশ্বব্যাপী এত হাহাকার, নিন্দা, ঘৃণা বহুক্ষেত্রে স্বৈরাচারের বিবেককে জাগাইতেই পারে না। কেন পারে না সেই কথা বার্ট্রান্ড রাসেল তো লিখিয়াই গিয়াছেন। যুদ্ধ যত বেশি দীর্ঘায়িত হয়, ততই আরো নিরপরাধ মানুষের রক্ত ঝরিয়া থাকে। স্বৈরাচারীরা ‘মানবাধিকার হরণকারী’ হইয়া থাকে, তাহারা যুদ্ধের রক্তপাতকে দীর্ঘ সময়ের দিকে টানিয়া লইতে কুণ্ঠা বোধ করেন না। তাহাদের হূদয় সিমারের মতো নিষ্ঠুর। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রমে হামলা চালাইতে তাহাদের হূদয় কাঁপে না। শিশুদের দেশহীন করিতে, শরণার্থী করিতে তাহারা লজ্জিত হন না।

সুতরাং ইতিহাসের পাঠ হইতে আমরা ইহা স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারি—এখন যাহারা যুদ্ধাপরাধ করিতেছেন, যাহাদের যুদ্ধোন্মাদনার জন্য হাজার হাজার নিরীহ প্রাণ বলি হইতেছে, তাহাদেরও একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াইতে হইবে। ইতিহাসের নিকট কোনো অপরাধের ক্ষমা নাই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হইল—স্বৈরাচারীরা ইতিহাসের নিকট হইতে কোনো পাঠ গ্রহণ করে না। যুদ্ধাপরাধের মধ্যেই যেন তাহাদের সুখ নিহিত। তাহারা কি তবে মানুষ নহে? দানব? কিন্তু এই পৃথিবী তো মানবের তরে, দানবের তরে নহে। এবং মানুষের জয় হইবেই। স্বৈরাচারদের জন্য অবশিষ্ট থাকিবে শুধু ঘৃণা। 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন