মার্চ মাস শেষ হয়ে এলো। এদেশের স্বাধীনতা নিয়ে পর্যালোচনা করতে গেলে বেশ কিছু ঘটনা মনটাকে নাড়া দিয়ে যায়। স্বাধীনতা কেন? মুক্তি কেন? স্বাধিকার কেন? সবই নিজেদের অধিকারকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৪তম প্রেসিডেন্ট ডি. আইজেনহাওয়ারের একটি ঘটনা। ঘটনাটি ১৯৫৭ সালের। নয়জন আফ্রিকান আমেরিকান অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্র লিটল রক সেন্ট্রাল হাই স্কুলে ভর্তি হয়েও ক্লাস করার সুযোগ পাচ্ছিলেন না। শ্বেতাঙ্গদের স্কুলে তারা প্রবেশ করার ও বিদ্যার্জনের ক্ষেত্রে সর্বাত্মক বাধার সম্মুখীন হচ্ছিলেন। এমন পরিস্থিতে প্রেসিডেন্ট ডি. আইজেনহাওয়ারের হস্তক্ষেপ করলেন, তাদের বিদ্যালাভের অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেন এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনী নিয়োজিত করলেন। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার এক্সিকিউটিভ অর্ডার জারি করেন, যা আরকানসাস ন্যাশনাল গার্ডকে ফেডারেলাইজ করে এবং সেই বছরের ২৩শে সেপ্টেম্বর তাদের একীভূতকরণকে সমর্থন করার নির্দেশ দেয়, যার ফলে তারা আফ্রিকান আমেরিকান ছাত্রদের রক্ষা করেন। সেই নয়জন ছাত্র ইতিহাসে ‘লিটল রক নাইন’ নামে পরিচিত।
এটি একটি বিদ্যালয় বা নয়জন কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীর শুধু শিক্ষা অর্জনের অধিকারের বিষয় ছিল না, এটি ছিল সমগ্র দেশ ও জাতিসত্তার বর্ণবাদী চর্চা ও বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। অর্থাত্ যা ন্যাঘ্য তা সব সময় ও সব জায়গায় ন্যাঘ্য, যা সঠিক তা সব সময় ও সব জায়গায় সঠিক।
বাংলাদেশের জন্মটা ন্যাঘ্যতায় পরিপূর্ণ। এদেশের সৃষ্টি সবসময় ন্যাঘ্য ছিল, সঠিক ছিল। বাংলাদেশের সৃজন হয়েছে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবিক অধিকারকে উদযাপন করার জন্য। যা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে উল্লেখ করেছেন অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে। তিনি বলেছিলেন, ‘যদি কেউ ন্যাঘ্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও যদি সে হয়, তার ন্যাঘ্য কথা আমরা মেনে নেব।’ লিটল রক স্কুলের সেই ৯ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষা অর্জনের অধিকার রক্ষা করার সঙ্গে বাংলাদেশে বাঙালির রাখাল রাজা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাগুক্ত অমর উচ্চারণের সাদৃশ্য নিশ্চয় পাঠক খুঁজে পাবেন। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। হাঁটিহাঁটি পায়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে থাকল। প্রবৃদ্ধি সূচক বাড়তে থাকল অকল্পনীয় গতিতে। বাঙালির হাজার বছরের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক মুক্তির আর্তনাদ শেষ হতে লাগল ঠিক সেই মুহূর্তে নিভিয়ে দেওয়া হলো বাঙালির মুক্তির দীপশিখা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে।
ছোটবেলায় একটি স্লোগান আমাকে খুব আন্দোলিত করত—‘এক মুজিব লোকান্তরে/লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে’। বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই, তবে আদর্শটা তিনি দিয়ে গেছেন, স্বপ্নের বীজ তিনি বপন করে গেছেন। এই দেশকে সুন্দর করার, এই দেশকে সমৃদ্ধ করার যে ইস্পাত দৃঢ় ভিত্তি তিনি রচনা করে গেছেন, সেই ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে আজ অদম্য বাংলাদেশ। এ অগ্রযাত্রা যেন তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণের মতো উদ্দাম ও উত্তাল।
আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তাদের জন্য কাজ করেছেন, যারা চিৎকার করে তাদের অধিকার হরণের কথা কাউকে বলতে পারত না, যারা শ্বাপদসংকুল পথ মাড়িয়ে সামনে আসতে পারত না, যাদের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছিল নানাবিধ সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় যাঁতাকলে। তাদের জন্য তিনি সেবা, কল্যাণ ও সমঅধিকারের রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে বিনির্মাণ করে যাচ্ছেন। চুলচেরা বিচারে আমাদেরকে আরো অনেক কিছু হয়তো করতে হবে। তবে এই একবিংশ শতাব্দীতে, আধুনিক গণতন্ত্র চর্চার যুগে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যা করেছেন বা করছেন এবং যা এদেশের মানুষের জন্য করবেন তা যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে সেই ভিত্তিতে বিশ্বাসী অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশে নেই। আমার এই বক্তব্যকে অনেকেই হয়তো একরৈখিক হিসেবে বিবেচনা করবেন, তবে তাদেরকে এই কথাও ভাবার জন্য প্রস্তাব করছি যে, বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ছাড়া বর্তমানে অন্য কোনো রাজনৈতিক সত্তাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আদর্শ, ধারক হিসেবে উপস্হাপন করা যাবে কি? যেখানে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরুর মধ্যে বিভেদ করা হয় না। যেখানে সকলের মানবিক ও ধর্মীয় মর্যাদাকে সমদৃষ্টিতে দেখা হয় ও সমাদর করা হয়। সবাইকে নিজের হূদয়ের উপরে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে একবার নতুন করে ভাববার অনুরোধ রইল।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
