রাজধানী ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ জেলায় যাওয়ার একটাই পথ, আর সেটা হলো সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক। সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটির বর্তমানে অত্যন্ত বেহাল অবস্থা। বিশেষ করে সড়কের প্রায় ৭০ কিলোমিটার অংশ খানাখন্দে ভরে গেছে। যানবাহন চলাচলের সময় প্রায়ই সড়কের গর্তে আটকে পড়ে। ছোটবড় দুর্ঘটনা লেগেই আছে। সড়কটির অবস্থা এতই খারাপ যে এতে হেঁটে চলাও কষ্টকর। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় প্যাচপেচে কাদা মাড়িয়ে চলাচল করতে পথচারীদের রীতিমত ঝামেলায় পড়তে হয়। আর শুকনো মৌসুমে যানবাহন চলাচলের সময় ধুলায় চারদিক ঢেকে যায়। লোকজনের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। ভাঙা সড়ক দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। গত কয়েক বছর ধরেই সড়কটির এই দুরাবস্থার কারণে যাত্রী ও পথচারীদের কষ্টের শেষ নেই। আর মানুষের কষ্ট লাঘব করতেই দেরিতে হলেও সওজ সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু কাজ চলছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। এ সড়কের কাজের ধীর গতি দেখে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত বিস্ময় প্রকাশ করে গত ২০ এপ্রিল সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে বলেন, ‘৬ মাস আগে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের কাজের যতটুকু অগ্রগতি দেখেছিলাম, এখনও তেমনটিই দেখছি।’
বর্তমানে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের সদরপুর থেকে পাগলা ও সেখান থেকে জাউয়া বাজার পর্যন্ত যান চলাচল অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। জাউয়াবাজার এলাকার সড়কে সংস্কার কাজ চলায় সেখানে যানবাহনগুলোকে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে থাকতে হয়। অথচ সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ মাত্র দেড়ঘণ্টার পথ। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাহিরপুরের এক জনসভায় সুনামগঞ্জবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কটিকে জাতীয় মহাসড়কে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সাড়ে ৩শত কোটি টাকার একটি প্রকল্পও তৈরি করে সওজ। কিন্তু অর্থসংস্থানের অভাবে প্রকল্পটি আর এগুতে পারেনি। তবে সওজ এডিপিভুক্ত সাধারণ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সড়কটির উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের অধীনে ৮৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৬ কিলোমিটার সড়ক ও সিলেট সড়ক বিভাগের অধীনে ৫৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৯ দশমিক ৪১ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের জুলাই মাসে। প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ২০২০ সালের মধ্যে। সওজ সূত্র জানায় এ পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ২৭ শতাংশ। এলাকাবাসীর অভিযোগ ঠিকাদারী সংস্থা প্রভাবশালী বলে কাজ চলছে তাদের মর্জিমাফিক।
সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের সুনামগঞ্জ অংশের ৪৬ কিলোমিটার অংশে ৬ ফুট প্রশস্তকরণ এবং ২৪ ফুট নতুন করে বিটুমিনের সড়ক (গোবিন্দগঞ্জ পয়েন্ট, ডাবর ও দিরাই সড়ক মোড় আরসিসি ঢালাই) করার কাজ শুরু হয় গত বছরের জুলাই মাসে। অনেক স্থানে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি করে কাজ ফেলে রাখায় বড় বড় গর্তের কারণে যান চলাচলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অথচ প্রাক্কলন মোতাবেক এসব খানা খন্দক ও গর্ত ভরাট করে যানবাহন চলাচলের সুব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা।
সিলেট সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আনোয়ার আমিন ইত্তেফাককে বলেন, সড়কের খানা-খন্দ ভরাট করে যান চলাচলের জন্য আপাতত বিটুমিন দিয়ে প্রলেপ দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে এবং অনেক স্থানে তা সম্পন্নও হয়েছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সিলেটের জনজেবি কন্সট্রাকসন (জয়েন্ট বেঞ্চার) সূত্র জানায়, এই সড়কের প্রাক্কলন সংশোধন করে কাজ করতে হচ্ছে। আর মানুষের যাতে কষ্ট না হয়, সেই চেষ্টা আমাদের রয়েছে।
৭ শত কোটি টাকার বিকল্প সড়ক
সিলেটের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জানান, সুনামগঞ্জবাসীর যাতায়াত সুবিধার জন্য সুনামগঞ্জ জেলার সঙ্গে ঢাকার বিকল্প সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে ৭শ কোটি টাকা ব্যয়ে। শাল্লা-আজমিরিগঞ্জ ১৭ কিলোমিটার নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সুনামগঞ্জবাসীকে ঢাকা যেতে আর সিলেটে আসতে হবে না। দিরাই হয়েই লোকজন সহজে ঢাকা যেতে পারবেন। অন্যদিকে সওজ গোবিন্দগঞ্জ-ছাতক সড়কে ১১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯টি সেতু নির্মাণ হবে আগামী অর্থবছরে। অন্যদিকে পাগলা-জগন্নাথপুর সড়কের রাণীগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ১৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭০২ মিটার ‘রাণীগঞ্জ সেতু’র নির্মাণ কাজ ৪৮ ভাগ শেষ হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বলেন, সেতুটি চালু হলে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সুনামগঞ্জ জেলায় নব দিগন্তের সূচনা হবে।
