প্রশিক্ষকের সঙ্গ ছাড়া একাই বিমান রইয়া শূন্যে উড়িলেন বাংলাদেশ পুলিশের এভিয়েশন উইংয়ের একমাত্র নারী সদস্য ফাতেমা তুজ জোহরা। পদবিতে তিনি সহকারী পুলিশ সুপার বা এসএসপি। রানওয়ে হইতে ঠিকমতো উড্ডয়ন ও অবতরণের পর তাহার প্রতিক্রিয়া ছিল উচ্ছ্বাসপূর্ণ। পুলিশের নবগঠিত এই উইংয়ে ১০ জন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিতেছেন। তন্মধ্যে বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষায় তিনি প্রথম হইয়াছেন। বাংলাদেশে নারীর আকাশ জয় ইহাই প্রথম নহে। আমরা জানি, ২০১৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিমান বাহিনীতে প্রথম বারের মতো যুদ্ধবিমান লইয়া আকাশে উড়িয়াছিলেন দুই নারী বিমানসেনা। তাহারা হইলেন নাইমা হক ও তামান্না-ই লুতফী। নারীরা কর্মকর্তা হিসাবে ২০০০-এর দশক হইতেই বিমান বাহিনীতে যোগ দিতেছেন। তবে তাহাদের বৈমানিক হওয়ার অনুমতি মিলে ২০১৪ সালের পর হইতে। এখানে ফাতেমা তুজ জোহরার প্রসঙ্গের অবতারণা করা হইল এই জন্য যে, আমাদের নারীদের পদচারণা বিভিন্ন বিচিত্র পেশায় দেখা যাইতেছে এবং তাহারা বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করিতেছেন। এই সকল ঘটনা নারী জাগরণকে ত্বরান্বিত করিতেছে এবং অন্যদের উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করিতেছে।
নারীরা এখন বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং পেশায় নিজেদের নাম লিখাইতেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাহারা পুরুষদের চাইতে ভালো করিতেছেন। বাংলাদেশ পুলিশ এভিয়েশন উইং চালু করিয়াছে এবং সেই উইংয়ে একজন নারী সদস্যকেও অন্তভুর্ক্ত করিয়াছে যাহা একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই উইংয়ের সদস্যরা দুর্গম অঞ্চলে দ্রুত যোগাযোগ রক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালনা, তল্লাশি অভিযান ও উদ্ধার কার্যক্রমে বিশেষ ভূমিকা পালন করিবেন। ইহা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ এবং এইরূপ কাজে পর্যায়ক্রমে অন্য নারীরাও সাহসকিতার পরিচয় দিবেন বলিয়া আমরা আশা করি। লক্ষণীয় বিষয় হইল, গত এক যুগে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন তুলনামূলকভাবে বেশি হইয়াছে। বাংলাদেশের নারীরা আজ রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, সংস্কৃতি, ক্রীড়া প্রভৃতি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিতেছেন। আমাদের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হইল তৈরি পোশাকশিল্প ও প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এই দুই ক্ষেত্রেও নারীর অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদার ও সমতার নীতির কারণে এবং তাহার বদান্যতায় এই সময়কালে সচিব, রাষ্ট্রদূত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, জেলা প্রশাসক, ইউএনও, পুলিশ সুপার, বিভিন্ন থানার ওসিসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের পদায়ন বা নিয়োগ প্রদান করা হইয়াছে। ইহা ছাড়া সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনীতে নারী অফিসার নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে নারী বিচারপতি নিয়োগ ও জাতিসংঘে শান্িতরক্ষা বাহিনীতে নারী পুলিশ প্রেরণের বিধান করা হইয়াছে। ফুটবল, ক্রিকেট, শুটিং, ভারোত্তোলন, আর্চারি, সাঁতারসহ বিভিন্ন ক্রীড়াঙ্গনে এমনকি হিমালয়জয়েও আমাদের নারীরা সাফল্যের পরিচয় প্রদান করিতেছেন। ইদানীং করোনাকালীন লক্ষ লক্ষ নারীর অনলাইন প্ল্যাটফরম ব্যবহার করিয়া উদ্যোক্তা হইবার ঘটনা বিস্ময়ের সৃষ্টি করিয়াছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর ক্ষমতায়নের দিক হইতেও আমরা আগাইয়া যাইতেছি। বর্তমানে আমাদের দেশে নারীশিক্ষার হার ৭১ শতাংশ এবং কর্মসংস্হানের হার ৩৮ শতাংশ। এইভাবে নারীর বহুবিধ উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল। এতত্সত্ত্বেও আমাদের বলিতে হয়, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে আমাদের যে পরিবর্তন হওয়া দরকার, তাহা এখনো হয় নাই। নারীর প্রতি সহিংসতা এখনো আমাদের পীড়িত ও ব্যথিত করে। জেন্ডারভিত্তিক সমতা অর্জনে আমাদের এখনো বহু পথ পাড়ি দিতে হইবে। নারীর প্রতি বৈষম্যের অবসান ঘটাইতে হইবে। ফাতেমা তুজ জোহরারা যেইভাবে দৃপ্ত পথে আগাইয়া যাইতেছে, তাহাতে আমরা বৈষম্যমুক্ত ও সমতার বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিতেই পারি।
