বছরের পর বছর ধরে বিনামূল্যে কিডনি প্রতিস্থাপন ও কিডনি বিষয়ক পরামর্শ দানের জন্য গতবছর দেশজুড়ে আলোচিত হয়েছিলেন সিকেডি অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম। হাজার হাজার মানুষ তাঁর কাছ থেকে বিনামূল্যে কিংবা নামমাত্র সম্মানি দিয়ে কিডনি বিষয়ক জটিলসব চিকিৎসা গ্রহণ করে সুস্থ জীবনযাপন করছেন। ডাক্তার কামরুলের এমন কাজ সরকারি বিভিন্ন মহলেও প্রশংশিত হয়েছে। দেশে বেসরকারিভাবে চিকিৎসা খাতে কিডনি প্রতিস্থাপন যে আশার আলো তিনি দেখিয়েছেন তার স্বীকৃতিস্বরূপ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ বছর চিকিৎসাবিদ্যায় দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পদকের জন্য নির্বাচিত করেছে তাঁকে।
সাধারণ মানুষের মন জয় করা এ মানবিক ডাক্তার গত একযুগ ধরে বিনামূল্যে প্রায় ১০০৭টিরও বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন। কিডনি প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি রোগিদের বিনামূল্যে দিচ্ছেন ফলোআপ। ২০১১ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে অবসরগ্রহণ করে ২০১২ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলেন সিকেডি অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতাল। সরকারি চাকরিকালে জমানো টাকায় গাড়ি কেনার স্বপ্ন ছিলো, কিন্তু সে টাকায় গাড়ি না কিনে কিনেছেন ডায়ালাইসিস মেশিন। পাশাপাশি বন্ধুদের সহযোগিতা নিয়ে সিকেডির কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। বর্তমানে তা দেশের কিডনি রোগীদের আস্থা এবং ভালোবাসার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র দুই লাখ দশ হাজার টাকার বিনিময়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় সেখানে। জটিল এই অস্ত্রোপচার বাবদ কোনো পারিশ্রমিক নেন না ডা. কামরুল ইসলাম। কয়েকমাস পরপর কিডনি প্রতিস্থাপন করা রোগিদের ফলোআপও দিয়ে থাকেন বিনামূল্যে।
চারমাস আগে ইত্তেফাক প্রজন্ম-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সব রোগীর আর্থিক অবস্থা সমান থাকে না। প্রতিস্থাপনবাবদ (কিডনি) তাঁরা যে টাকাটা আমাকে দিতো, সেটি দিয়ে হয়তো তারা অন্যান্য চিকিৎসার খরচ মেটাতে পারবে; আর আমি টাকা নিই না, কিন্তু তাদের কাছ থেকে যে অনার (সম্মান)পাচ্ছি তা তো টাকা দিয়ে কেনা যেতো না! দুনিয়াতেই এতো পুরস্কার পাচ্ছি, আমার তো ভয় হয়, আমি এর বিনিময় হিসেবে পরকালে কিছু পাবো কিনা।’
ডা. কামরুল ও তাঁর দলের কিডনি প্রতিস্থাপনের কাজে সফলতার হার ৯৬ শতাংশ। গত বছর করোনার প্রকোপে অন্যান্য রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা যেখানে প্রায় অকেজো ছিল, সেখানেও কামরুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা মিলে প্রায় ২৫০টির মতো কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন। এদের মধ্যে ৩ জন ছাড়া বাকি সব রোগী সুস্থ জীবনযাপন করছে।
কর্মজীবনের শুরুতে ১৯৯৩ সালে বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে যোগ দেন তিনি। প্রথমবারের মতো সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপনের কাজ করেন ২০০৭ সালে। মজার বিষয় হলো, কিডনি প্রতিস্থাপক সার্জনের দায়িত্ব নেয়ার আগে কামরুল ইসলাম কোরবানির গরু-খাসির কিডনি নিয়ে প্র্যাকটিস করতেন। তিনি বলেন, 'প্রথম দিকে কিডনি প্রতিস্থাপক সার্জন হতে চাইনি, যেহেতু সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়েছে তাই এক প্রকার বাধ্য হয়ে করতে হয়েছে। শুরুতে চারটা মেশিন নিয়ে ডায়ালাইসিস সেটআপ শুরু করি, অল্পদিনে ৩০ জনের মতো নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতো, তাদের একজনকে প্রথম ট্রান্সপ্লান্ট করি, সেটা সফল হওয়ার পর রেফারেন্সে একটার পর একটা আসতে থাকে। এখন তা নিয়মিতই করে যাচ্ছি।’ দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত যে আইন রয়েছে তা নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে ডা. কামরুলের। তাঁর মতে, এ আইনে সার্জনদের প্রোটেকশন কম। কিডনি দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে মিসম্যাচ থাকলেও সার্জনদের দায়ী করা হয় অথচ সার্জনের দায়িত্ব অস্ত্রোপচার করা ও রোগীকে সুস্থ করে তোলা।
স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার পর অনুভূতি বুঝাতে গিয়ে ডাক্তার কামরুল বলেন, ‘আমি কখনো কোনো পদক বা পুরস্কার চাইনি; আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানুষের সেবা করে যাচ্ছি। বরং এসব পুরস্কারের কথা শুনলে ভয় লাগে, আল্লাহ আমাকে সব দিয়ে দিচ্ছেন দুনিয়াতে—আমি পরকালে এর প্রতিদান পাবো কীনা! একজন ডাক্তার হিসেবে মানুষের সেবা করা আমার কর্তব্য, আমি সেই কাজটিই করে যাচ্ছি।’

বিনা পারিশ্রমিকে এক হাজারেরও বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন তিনি