তপোবনে ঋষির নিকট বসিয়া এক ভক্ত বলিয়াছিলেন, ‘প্রভু! মৃত্যু নাকি অত্যন্ত যন্ত্রণাময়?’ ঋষি বলিয়াছেন, ‘ইহা লইয়া সংশয় কেন মনে, বত্স? মৃত্যু তো অবশ্যই যন্ত্রণাময়।’ ভক্ত তখন বলিয়াছিলেন, ‘না মানে প্রভু, এখনো তো মরি নাই, তাই মৃত্যু কতখানি যন্ত্রণাময় তাহা লইয়া কোনো অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিতে পারি নাই। আর যাহারা সঞ্চয় করিয়াছে, তাহাদের নিকট হইতে এই অভিজ্ঞতা শুনিবারও তো কোনো সুযোগ নাই।’ ঋষি বলিলেন, ‘এই মৃত্যুযন্ত্রণার স্বাদ পৃথিবীর সকল প্রাণীকেই লইতে হইবে। ইহাই বিধাতার বিধান।’ ঋষি বলুক বা না বলুক—মৃত্যু এক চিরস্হায়ী সত্য। ইহাই সবচাইতে বড় সত্য। বিশ্বখ্যাত লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে মৃত্যু লইয়া যাহা বলিয়াছেন, তাহার সারমর্ম হইল—মৃত্যু লইয়া আমার কোনো ভয় নাই, কারণ আমি জন্মাবার আগেও মৃত্যুর মতোই একটি শূন্য জগতে ছিলাম। সেই জগৎ লইয়া আমার কোনো ভয় ছিল না। কারণ, আমি যে ছিলাম এবং আমি জন্মাইব—তাহা তো জানিতাম না। জন্মের আগের মতোই মৃত্যুর পরের জগৎ।
আমরা মৃত্যু লইয়া রচনা লিখিতে বসি নাই। আমরা মূলত বলিতে চাহিতেছি, চারিদিকে যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানি, আণবিক-পারমাণবিক আর বিভিন্ন অস্ত্রের চোখরাঙানি, শক্তিশালীদের চমকানি ধমকানি শাসানি—কিন্তু তাহারা কেহ কি চিরকাল বাঁচিয়া থাকিতে পারিবেন? পারিবেন না। মুশকিল হইল—যাহারা বিপুল ক্ষমতাশালী—তাহাদের ভাবনাজগৎ অন্যরকম হয়। যাহার জন্য পৃথিবীর ইতিহাসও আজ অন্যরকম। হাজার হাজার বত্সর ধরিয়া অসভ্য অবস্হা হইতে মানুষ যতই সভ্য হইয়া উঠুক না কেন—‘মানুষ মানুষের জন্য’—এই সত্যটি সবচাইতে বেশি উপেক্ষিত থাকিয়াছে। ক্ষমতার অতি উষ্ণ প্রতাপে অনেকেই মনে করেন, তাহারা যেন অমর! তাহারা অবশ্য বাঁচিয়া থাকিবেন পরোক্ষভাবে—তাহাদের কীর্তির মাধ্যমে। বিশ্বের মানুষ তাহাদের কীভাবে দেখিবে—তাহা শত বত্সর পর হইলেও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হইবে। আরেকটি দিক হইল—মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিতেই হইবে, ইহা যেন কিছুতেই মানিয়া লইতে পারেন না পৃথিবীর কিছু শাসক-সম্রাট-জ্ঞানীগুণী-প্রতাপশালী ব্যক্তি। এই জন্য তাহারা যে কোনো উপায়ে নিজের নামখানি খোদিত করিয়া রাখিতে চাহেন। পৃথিবী জুড়িয়া চারিদিকে এত যে ভাস্কর্য, এত যে নামফলক—তাহারা নেপথ্যে ঐ অমরত্বেরই সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা কাজ করিয়া থাকে। এই জন্য কোথাও কিছু নির্মাণ করা হইলে সেইখানে নামফলক বসানো হয়। ব্রিজের নাম রাখা হয় বিশিষ্ট কাহারো নামে। ঐতিহ্যবাহী দীর্ঘতম রেলসেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণের শতবর্ষ পূর্ণ হইল। ব্রিটিশ আমলের তত্কালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের নাম অনুসারে ব্রিজটির নামকরণ করা হইয়াছিল ‘হার্ডিঞ্জ ব্রিজ’। সেই ভাইসরয় লর্ড মরিয়া কোথায় সমাধিস্হ হইয়া রহিয়াছেন—কে তাহার খোঁজ রাখে! কিন্তু তাহার নামটি এই জনপদে ব্রিজের ধাতব কাঠামোর সহিত যেন চিরতরে খোদিত হইয়া গিয়াছে।
সুতরাং মানুষের মনে নিজেকে বাঁচাইয়া রাখিবার মানসে প্রভাব ও প্রতাপশালী মানুষের চেষ্টার শেষ নাই। অমরত্ব লাভের মানসে প্রাচীনকালে রাজা-মহারাজারা বিভিন্ন কেমিস্ট নিয়োগ করিতেন অমৃতসুধা আবিষ্কারের জন্য। খ্রিষ্টপূর্ব দুই শত বত্সর পূর্বেকার চীনের মহাপরাক্রশীল সম্রাট কিন শি হুয়াং মৃত্যুর কথা চিন্তাই করিতে পারিতেন না। তিনি চাহিতেন তাহার রাজ্যের বিজ্ঞানীরা শুধু অমরত্বের রহস্য অনুসন্ধানেই ব্যস্ত থাকুক, অন্য সকল কিছুই তাহার নিকট ছিল সময়ের অপচয়। অমরত্বের সুধা বানাইবার ব্যর্থতার দায়ে তিনি প্রায় সাড়ে চার শত বিজ্ঞানীকে জীবন্ত কবরও দিয়াছিলেন। তাহার পরও অমরত্ব সুধা হুয়াংকে অমরত্ব দান করিতেই পারে নাই। তাহার মৃত্যুর পর মৃতদেহটিকে পচা মাছ দিয়া ঢাকিয়া দেওয়া হইয়াছিল, যাহাতে মৃতদেহের পচা গন্ধ চাপা পড়িয়া যায়। জীবিতাবস্হায় কিন শি বড় গলায় বলিতেন—তাহার বংশধরেরা সহস্র-অযুত বত্সর রাজ্য শাসন করিবে। অথচ বিধাতার নির্মম পরিহাস হইল—তাহার মৃত্যুর মাত্র তিন বত্সরের মাধ্যেই তাহার বংশের আস্ফালন চিরতরে শেষ হইয়া যায়।
প্রকৃত অর্থে মহাকালের নিষ্ঠুর করাল গ্রাসে সবাইকে ক্রমশ বিলীন হইয়া যাইতেই হয়। এই জন্য ঋষির নিকট ভক্ত বলিয়াছিলেন, ‘কী করিয়া অমর রহিব, প্রভু?’ ঋষি বলিয়াছিলেন, ‘মানুষের জন্য ভালো কাজ করো বত্স, মানুষের মনে অমর রহিবে।’ একইভাবে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলিয়াছিলেন—‘সেই ধন্য নরকুলে, লোকে যারে নাহি ভুলে।’
