ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধ এক মাস পেরিয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে এখানে দুটি যুদ্ধ চলমান: একটি মূলত ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর ও বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ। আরেকটি হলো রুশ সেনাদের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর যুদ্ধ। প্রথম যুদ্ধে রাশিয়া বিজয়ী। দ্বিতীয় যুদ্ধে বিজয়ী ইউক্রেন।
বলতে গেলে সমঝোতামূলক বৈঠকগুলোর মাধ্যমেই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসবে এবং একটি দীর্ঘস্হায়ী নিষ্পত্তির পথ তৈরি হবে। কিন্তু কিছু সময়ের জন্য সংঘাত অব্যাহত থাকার আশঙ্কা বেশি না থাকলে যুদ্ধের ফলাফল হবে সমান সমান। বিশেষ করে পুতিন যদি যুদ্ধে তার সৈন্যবাহিনীর শক্তিমত্তা প্রদর্শন কমানোর কৌশল গ্রহণ করেন এবং ইউক্রেন সরকার মেনে নিতে পারে এমন শর্তে আলোচনার ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে এই পরিস্হিতি তৈরি হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধের ফলাফল হবে অনেকটা লেনিনের ভাবশিষ্য ও তাত্ত্বিক লিওন ট্রটস্কির সেই ব্যাখ্যার মতো, ‘সীমিত যুদ্ধ, তবে শান্তি নয়’। এমতাবস্হায় ইউক্রেন যুদ্ধে কে বিজয়ী ও পরাজিত বলে পরিগণিত হবেন?
সবচেয়ে সহজে যে বিষয়টি ইঙ্গিত করা যায় তা হলো, এই যুদ্ধে বড় পরাজয় হবে রাশিয়ার। এটা এখন স্পষ্ট, পুতিন যে রাজনৈতিক অভিলাষে ইউক্রেনে হামলা চালিয়েছেন, তা অর্জন করা তার পক্ষে আর সম্ভব হবে না। যেমন—তিনি চেয়েছিলেন তার সৈন্যদল ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে বিজয় কুচকাওয়াজ করবে এবং ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লালোদিমির জেলেনস্কির সরকারের পতন হবে। তদস্হলে ক্রেমলিনের প্রতি বন্ধুত্বভাবাপন্ন সরকার কায়েম হবে। পুতিনের পছন্দের যুদ্ধ ইউক্রেনের অনেক জনপদ ধ্বংস করেছে, কিন্তু তার এই সিদ্ধান্তের ফলে পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞায় অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করছে।
এছাড়া অনেক মেধাবী রাশিয়ান নাগরিক ইতিমধ্যে দেশ ছেড়েছেন। অধিকন্তু, যুদ্ধে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে (এক মাসে ১৫ হাজার সৈন্য নিহত হয়েছে) এবং একটি পোটেমকিন (সাবেক রুশ জেনারেল) বাহিনী হিসেবে এর আবির্ভাব হয়েছে, যা পুনর্নির্মাণ করতে কয়েক বছর সময় লাগবে।
ইউক্রেনের ক্ষেত্রে এই হিসাব আরো জটিল। এর রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সমাজ ও সশস্ত্র বাহিনীর সহনশীলতা বিস্ময়কর নিঃসন্দেহে। জাতীয় পরিচিতি আগের চেয়ে আরো মজবুত; ইউক্রেনের কঠোর প্রতিরোধ তার অল্পবয়সি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু সেই শক্তিশালীকরণের ফলে অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়েছে। আনুমানিক ১০ মিলিয়ন ইউক্রেনীয়, অর্থাৎ জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ নাগরিক আজ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্ত্তচ্যুত বা উদ্বাস্ত্ত হয়ে পড়েছে। অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে। এর পুনর্নির্মাণে অনেক সময় এবং প্রচুর অর্থ লাগবে।
যদিও সামরিকভাবে পরীক্ষা দিতে হয়নি, তবু ন্যাটো এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত একটি বড় বিজয়ী শক্তি। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের ফলে ন্যাটো আরো ঐক্যবদ্ধ এবং শক্তিশালী। এটি রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর দুর্বল পারফরমেন্স থেকেও উপকৃত হচ্ছে। পশ্চিমা জোটের সঙ্গে এর কোনো মিল আছে বলে মনে হয় না। অন্তত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট তা-ই বিশ্বাস করেন।
এই যুদ্ধে আরেক বিজয়ী হলো জার্মানি, তার নতুন সরকার ও চ্যান্সেলর নিজে। চ্যান্সেলর ওলাফ স্কোলজের সরকার তার পূর্বসূরি অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের নীতির প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। কারণ তিনি জার্মানিকে রাশিয়ান জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হতে দিয়েছিলেন। নর্ড স্ট্রিম ২ গ্যাস পাইপলাইন বাতিল করার জন্য স্কোলজের সিদ্ধান্ত, দ্বিগুণ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি এবং স্বেচ্ছায় ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে জার্মানি নীতিতে নাটকীয় পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। একমাত্র হতাশার বিষয় হলো, রাশিয়ার গ্যাসের ওপর জার্মান অর্থনীতির নির্ভরশীলতা শিগগিরই দূর হচ্ছে না, এর জন্য কয়েক বছর সময় লাগবে। এটি এমন এক বাস্তবতা, যা রাশিয়ার অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করতে সহায়তা করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও এই যুদ্ধ থেকে সুবিধা লাভ করছেন। তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দক্ষতার সঙ্গে ইউক্রেনকে সমর্থন করার নীতি অবলম্বন করেছেন, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে রাশিয়াকে শায়েস্তা করেছেন এবং নো ফ্লাই জোন প্রতিষ্ঠার আহ্বান সতর্কতার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যাতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি এড়ানো যায়। জো বাইডেন আমেরিকার মিত্রদের একত্রিত করেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছর শাসনামলের পর আবার পশ্চিমা মিত্রদের আস্হা অর্জন করেছেন। যদিও আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সময় তিনি ব্যবস্হাপনাগত কিছু ভুল করেছেন। তার আরেকটি প্রধান ভুল হলো পুতিনকে কোণঠাসা করতে তাকে যুদ্ধাপরাধী আখ্যা দেওয়া এবং রাশিয়ায় সরকার পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত দেওয়া। যেখানে মার্কিন নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত পুতিনের যুদ্ধ বন্ধ করা এবং এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্হিতি যাতে আর বাড়তে না পারে তা এড়ানো।
এক মাস আগে চীন ও তার প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যে কৌশলগত অবস্হান ছিল, এই যুদ্ধের ফলে তা এখন সেই তুলনায় কিছুটা খারাপ অবস্হানে রয়েছে। পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার কারণে শি জিনপিং সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন। এতে চীনের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে চীন মাঝারি নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্যবস্ত্ততে পরিণত হতে পারে এমন ঝুঁকিও বেড়েছে। যেখানে চীন দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা বিশ্বকে বিভক্ত করার চেষ্টা করছে, রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে, পশ্চিম ইউরোপকে বিচ্ছিন্ন করেছে, তাই চীনের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি আরো কঠোর হওয়াই স্বাভাবিক। চীন তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সামরিকভাবে অগ্রসর হলে এর জন্য দেশটিকে মূল্য দিতে হতে পারে।
এছাড়া এই যুদ্ধে বিজয়ীর চেয়ে পরাজয়বরণকারীর সংখ্যাই বেশি। জাতিসংঘ, বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদ এ ব্যাপারে নির্বিকার। পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার রোধ করার জন্য বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে এই যুদ্ধ একটি খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। ২৮ বছর আগে ইউক্রেন আঞ্চলিক অখণ্ডতার আশ্বাসের বিনিময়ে তার পরমাণু অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ করে। তার পরও ২০১৪ সাল থেকে দেশটিকে দুবার আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রচেষ্টার ক্ষেত্রেও এই যুদ্ধ একটি খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। এই ইস্যু অন্তত অস্হায়ীভাবে হলেও এখন পেছনের সারিতে চলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্হাপনা গ্রহণের প্রবণতাই বাড়ছে এখন।
এই যুদ্ধ তাদের জন্যও একটি খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি করল, যারা তর্ক করে আসছেন যে আঞ্চলিকভাবে দেশ দখল ও বিভিন্ন দেশের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ এখন অতীতের বিষয়। যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তি দিয়েছিলেন যে এই ব্যাপারগুলো কখনো ভালো ছিল না, এ কথা তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেসব বিশ্লেষক যুক্তি দেখাতেন যে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিধানে আমেরিকান উচ্চাকাঙ্ক্ষা সবচেয়ে বিপজ্জনক, তাদের চিন্তাধারার ক্ষেত্রেও এই যুদ্ধ ভুল প্রমাণ করেছে।
পরিশেষে বিশ্বব্যবস্হার জন্য এই সংঘাতের অর্থ কী হবে তা নিয়েও ভাবার অবকাশ রয়েছে। ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার আক্রমণ বিশ্বের স্হিতিশীলতার সবচেয়ে মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করেছে। কোনো দেশের সীমান্ত যে হুমকি বা বলপ্রয়োগের দ্বারা পরিবর্তন করা যায় না, তা আজ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। পুতিন তার জুয়া খেলে পালাচ্ছেন কি না বা তাকে যে মূল্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে, তা কোনো লাভালাভের চেয়ে বেশি কি না, তার ওপর নির্ভর করবে অনেক কিছু। এটি অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে বেশি। পুতিনের যুদ্ধে কে কী জিতল ও হারাল, সে সম্পর্কে ইতিহাসই একদিন এর চূড়ান্ত রায় প্রদান করবে।
লেখক: কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রেসিডেন্ট, সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েলের উপদেষ্টা ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে নিযুক্ত মার্কিন বিশেষ দূত
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস থেকে অনুবাদ: ফাইজুল ইসলাম
