শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিষমুক্ত সবজি চাষে সাফল্য তাদের

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২২, ০১:১১

করোনা মহামারি অনেকের জন্য অভিশাপ হলেও চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কলেজপড়ুয়া দুই বন্ধু আব্দুল হালিম ও ওসমান গণির জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে। করোনাকালের অবসর সময়ে পতিত জমিতে কীটনাশকবিহীন নিরাপদ সবজি উত্পাদনে উদ্যোগী হয়ে আজ তারা সফল উদ্যোক্তা। নির্বিষ সবজি উত্পাদনকারী সফল কৃষক হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কৃষকের সম্মান ও স্বীকৃতি লাভ করেছেন তারা। তাদের চোখে শুধু মাঠভরা সবুজ সবজিখেত। মানুষকে নির্বিষ-নিরাপদ শাকসবজি খাওয়ানোই তাদের একমাত্র লক্ষ্য ও প্রচেষ্টা।

সবজি-ফলমূলে কীটনাশক এখন নীরব ঘাতক হয়ে উঠেছে। কোনো উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়েই সবাইকে বাজারের সবজি ফলমূল খেতে হচ্ছে। কিন্তু এসব ফল বা সবজিতে কীটনাশকের ব্যবহার কেমন তা কেউ জানে না। অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে এসব ফল বা সবজি উপকারের বদলে মানুষের শরীরে ক্ষতিকর রাসায়নিক ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাই এখন কীটনাশকমুক্ত সবজি চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির শেষপ্রান্তে বাগানবাজার ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম চিকনেরখিলের বাসিন্দা আব্দুল হালিম অনার্স শেষ করে এখন মাস্টার্সের ছাত্র। আর তার বন্ধু একই গ্রামের মো. ওসমান গণি অনার্সের ছাত্র। ২০২০ সালে করোনার ছোবলে যখন সব কিছু অচল হয়ে পড়ে, তখন কলেজ ছেড়ে নিজ গ্রামে ফিরেন তারা। অলস-অবসর সময় কাটানোর চিন্তা থেকে মাথায় আসে চাষাবাদের। দুই বন্ধু মিলে গ্রামের কিছু এক ফসলি ধানি জমি লিজ নিয়ে শুরু করেন সবজি চাষ। সফলতার মুখ দেখে ধীরে ধীরে তারা গড়ে তোলেন পাঁচ একর জমিতে রুপাই ভ্যালি এগ্রো ফার্ম নামে দিগন্ত জোড়া সবুজ সবজিখেত। দুই বন্ধুর দৃঢ় মনোবল আর কঠোর পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে রুপাই এগ্রো ফার্ম। মাত্র দুই-আড়াই বছরের পরিশ্রমে তারা দেখা পেয়েছেন সাফল্যের। এখন দূরদূরান্ত হতে প্রতিদিনই উত্সুক লোকজন তাদের ফার্ম দেখতে আসেন। জাতীয় সবজি মেলা ২০২২ উপলক্ষ্যে গত ২ মার্চ সেরা নিরাপদ সবজি উত্পাদনকারী কৃষক হিসেবে তারা শ্রেষ্ঠ জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর উত্সাহী লোকজন এবং সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও তাদের ফার্ম পরিদর্শনে আসছেন। অনেকে তাদের অনুপ্রেরণায় পরিকল্পিত সবজি উত্পাদন শুরু করেছেন।

ওসমান গণি জানান, তাদের ফার্মের সবজির কদর বেশি হওয়ার কারণ একটাই, নির্বিষ, নিরাপদ সবজি। তারা খেতে বিষ বা ক্ষতিকর কীটনাশক ওষুধ প্রয়োগ করেন না। রাসায়নিক সারের ব্যবহারও কম করেন।

তিনি বলেন, তাদের রুপাই ভ্যালি এগ্রো ফার্মে নিরাপদ ফসল উত্পাদনের জন্য হলুদ পাতার ব্যবহার ও পেরোমোন জৈব পদ্ধতি এবং জৈব সার ব্যবহার করা হয়। এই দুটি বালাই দমন পদ্ধতির কারণে কীটনাশক ছাডাই পোকামাকড় দমন করা সহজ হচ্ছে। জৈব পদ্ধতিতে খরচও কম। কৃষি বিভাগ থেকেই নিরাপদ সবজি উত্পাদনের কলাকৌশল শেখানোসহ সব ধরনের পরামর্শ-সহায়তা দিচ্ছে। লাউ, চিচিঙ্গা, ঢ্যাঁড়শ, তিতাকরলা, কাঁকরোল, টম্যাটো, বেগুন ইত্যাদি সবজি ছাড়াও আছে পেঁপেবাগান। তিন বিঘা লাউখেতের মাচায় দুলছে লাউ আর লাউ। বারোমাসি লাউয়ের ডগায় ডগায় ঝুলছে লাউ।

আব্দুল হালিম জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ টাকার লাউ বিক্রি হয়েছে। গাছে আছে প্রায় ১০ হাজার লাউ। দুই বিঘা চিচিঙ্গা খেতে এ পর্যন্ত ৬০ হাজার টাকার চিচিঙ্গা বিক্রি হয়েছে। দেড় বিঘা পেঁপেখেতের ৫০০ গাছে এ পর্যন্ত ১৫ টন পেঁপে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৬ লাখ টাকা গাছে আছে আরো প্রায় ১০ টন পেঁপে।

হালিম আরো জানান, তার প্রজেক্টে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় কাঁকরোল। সাত বিঘা জমিতে গত বছর ৭০-৮০ টন কাঁকরোল উত্পাদন হয়। যা বিক্রি হয় প্রায় ১২ লাখ টাকা। এ বছর আরো বেশি উত্পাদনের আশা তাদের। আগামী মাসেই ফসল তোলা শুরু হবে। ফেনি, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্হান থেকে ব্যবসায়ীরা এসে খেত থেকে সবজি কিনে নিয়ে যান। ফলে হাটবাজারে নিয়ে বিক্রি করতে হয় না।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো. নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তার রুপাই ভ্যালি এগ্রো ফার্মটি এখন হাতে-কলমের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কীটনাশক ছাড়াও যে জৈব পদ্ধতিতে বালাই দমন করে নিরাপদ ফসল উত্পাদন করা যায় কৃষকরা এখানে এসে শিখছেন।

তিনি আরো বলেন, এ ফার্মের সফল তরুণ উদ্যোক্তাদের আরো বেশি অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানোর উদ্যোগ রয়েছে কৃষি বিভাগের।

এদিকে কৃষি বিভাগের উদ্যোগে স্মল হোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্টের (এসএসিপি) আওতায় বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৫০ জন কৃষক সম্প্রতি রুপাই ভ্যালি এগ্রো ফার্ম পরিদর্শনে আসেন। বিষ বা কীটনাশক প্রয়োগ না করে জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরাপদ সবজি চাষের কলাকৌশল দেখে তারা বেশ উত্সাহী হয়ে ওঠেন।

পরিদর্শনে আসা দাঁতমারার কৃষক মো. রোকন উদ্দিন বলেন, জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদে সহজেই যে পোকামাকড় দমন করা যায় এখানে না এলে বিশ্বাস করতাম না।

রুপাই ভ্যালির উদ্যোক্তা মো. আব্দুল হালিম বলেন, তারা এখন সবজির পাশাপাশি পেয়ারা, কলা, কুল (বরই) চাষেরও পরিকল্পনা নিয়েছেন। তবে নিজেদের অর্থায়নে একটি সাবমার্সিবল পাম্প বসিয়ে ফার্মে যে সেচ দেওয়া হচ্ছে তা অপ্রতুল। কাঁচা রাস্তা হওয়ায় উত্পাদিত পণ্য পরিবহনে মারাত্মক ভোগান্তি পোহাতে হয়।

ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, সরকার নিরাপদ খাদ্য উত্পাদনে বেশ জোর দিয়েছে। এ অবস্থায় রুপাই ভ্যালি এগ্রো ফার্র্মের বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি উত্পাদনের সফলতা সারা দেশের জন্য একটি সুসংবাদ।

 

ইত্তেফাক/বিএএফ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

যে কথা আব্বাকে বলা হয়নি

বাবার মলাটে আবৃত ভালোবাসা

রসালো কাঁঠালের স্বর্গরাজ্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া

কার্ল ল্যান্ডস্ট্যাইনার: রক্তের গ্রুপ আবিষ্কার করে মানবজাতিকে ঋণী করেছেন যিনি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের বর্ণাঢ্য জীবন

ইত্যাদি ও একজন হানিফ সংকেত

সফুরা খাতুন : ভাওয়াইয়া গানের এক অনন্যা নারী গীতিকার

দায়িত্বই আমার কাছে সবচেয়ে বড়: ডা. ফেরদৌস