দেবশিশুদের অদেখা ভুবন

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২২, ০৭:২৭

যাদের জীবনে বিশ্বকে আলাদা করে জয় করার কোনো প্রচেষ্টা থাকে না, এমন মানুষেরা প্রত্যেকেই তাদের নিজম্ব জগৎ ও জীবনে স্বতন্ত্র এক বিশ্ব। আর পৃথিবীবাসীর কাছে নতুন এই বিশ্বকে গভীরভাবে জানার ও জয় করার আগ্রহ থেকে সৃষ্টি হয়েছে অটিজম নামক বহুবিধ বিশেষণে আখ্যায়িত এই বিশেষ্যটির। দেশ-কাল বা স্থান সব দিক থেকেই আজ অটিজমবাসীরা যেন-বা অদেখা এক ভুবন। অটিজমের কোনো সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য বা প্রকৃতি আজ আর আলোচনা করব না।

একজন অটিস্টিক শিশুর জীবনের না দেখা, না-বলা কিছু কথা, যা বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনীয়তা আছে এমন ধারণা থেকে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষ্যে আজকের লেখাটি নিবেদন করছি।

২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২ এপ্রিলকে ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। শনিবার যা বিশ্বব্যাপী পালিত হয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুলের হাত ধরে ২০১১ সালের ২৫ জুলাই থেকে বাংলাদেশে অটিজমের নবযুগের সূচনা হয়। প্রকৃতপক্ষে, গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে লিও ক্যানার নামে একজন শিশু মনস্তত্ববিশারদ অটিজমের প্রথম বর্ণনা দেন। আশির দশক পর্যন্ত অটিজমকে বিরল অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সে সময়ে গড়ে প্রতি ১০ হাজার শিশুতে পাঁচ জন শিশুর অটিজম শনাক্ত করা হয়েছিল (সূত্র :অটিজম আমাদের অসাধারণ শিশুরা, ডা. সুনীতি চক্রবর্তী, ২০১৯)। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে প্রতি ৫৯ জনে এক জন অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন (সূত্র : সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল, ২০১৮)। তাই সচেতনতা বাড়াতে অটিজমকে জানা আজ যুগের প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে।

লেখার শুরুতে বলেছিলাম, অটিজম আক্রান্ত শিশুর জীবনের চিন্তার আলোকে লেখাটি লিখব। বাস্তবে তা একেবারেই অসম্ভব। এর প্রথম কারণ হিসেবে বলা যায়, অটিজম কোনো রোগ বা ব্যাধি না যে এখানে রোগীর রোগের বর্ণনা দিব। এটি প্রকৃতপক্ষে এমন একটি স্হিতাবস্থা, যা জীবনব্যাপী চলমান। দ্বিতীয়ত, অটিজম অবস্থাটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র যেখানে একজন অটিস্টিক ব্যক্তির সঙ্গে আরেক জন অটিস্টিক ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য, আচরণ বা পরিবেশগত কোনো মিল নেই।

তাই কোনো একক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সব অটিজম আক্রান্ত শিশুর সামাজিকতা ও আচরণের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব নয়। অটিজমের রং নীল, যাকে বেদনার সঙ্গে তুলনা করা হয় (সূত্র : আমাদের অটিস্টিক শিশু ও তাদের ভাষা, হাকিম আরিফ ও সালমা নাসরীন, ২০১৩)। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, অটিস্টিক শিশুরা সমাজের বোঝা। অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত অটিস্টিক শিশুদের দেবশিশু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কেননা এই শিশুরা তাদের সমগ্র জীবনে কখনো অপরাধমূলক কাজে জড়িত হবে না। কারণ তাদের চিন্তায় কোনো ভানের অস্তিত্ব নেই। তারা যে মানসিক অবস্থা নিয়ে জগতে এসেছে সেই অবস্থা নিয়েই সমগ্রজীবন যাপন করে। তারা তা-ই বলে ও করে, যা তাদের দেখানো ও শোনানো হয়। অটিস্টিক শিশুদের অনেকে প্রতিবন্ধিতার কাতারে ফেলেন।

অটিস্টিক শিশুর জীবনে প্রতিবন্ধকতা আছে ঠিকই; কিন্তু প্রতিবন্ধিতা নেই। এই দেব শিশুদেরকে বুঝতে হলে তাদের জগতে প্রবেশ করতে হবে। তাই আমাদের উচিত তাদের জগত্কে জানার। সাধারণ মানুষের জগত্কে অটিস্টিক শিশুদের সঙ্গে পরিচয় করানোর আপ্রাণ চেষ্টার এক পর্যায়ে পিতামাতারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সৃষ্টিকর্তার প্রতি অভিযোগ করতে শোনা যায় ‘কেন আমিই’! কিন্তু এমন একদিন হয়তো আসবে যখন বিশ্ববাসী বলবে ‘কেন আমি নই’?

এ প্রসঙ্গে অটিজম সানিয়া ওয়ার্ল্ডের গর্বিত পিতামাতার প্রসঙ্গ উল্লেখ না করলেই নয়, যারা হাসিমুখে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন বিশ্ববাসীকে এ কথা বোঝানোর জন্য যে, অটিজম যেমন যে কারো হতে পারে, ঠিক তেমনি পিতামাতার প্রথম কাজ হচ্ছে শিশুটির অটিজমকে মেনে নেওয়ার। অটিজম আক্রান্ত শিশুর পারিবারিক গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সানিয়ার অব্যক্ত ভাষা দিয়ে তা জয় করার অদম্য প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় ইংল্যান্ডে বাস করা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই দম্পতির ভিডিওগুলোতে। যারা সানিয়াকে তাদের দাম্পত্য জীবনের আশীর্বাদ বলে মনে করেন। আর তাদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের প্রত্যক্ষদর্শী অটিজম সানিয়া ওয়ার্ল্ডের হাজারো অনুসারী।

২০২২ সালের বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ঠিক করা হয়েছে— অটিজম: কর্মক্ষেত্রে অন্তভু‌র্ক্তি শিরোনামে। এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে মস্তিষ্কের বর্ধনমূলক বিকাশগত ত্রুটির এই অবস্থাকে কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের উপযোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই হলো অটিজমকে জয় করার একমাত্র লক্ষ্য। আর তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিনিধিদের কাছে সুরক্ষিত অবস্থায় বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রয়াস শুরু হোক এখান থেকেই। যেখানে অটিজমকে কোনো অভিশাপ, গালি বা কষ্টের আবরণে না জড়িয়ে সমানুভূতি প্রদর্শন করে সামাজিক জীবনে এই শিশুদের হাতটি ধরি এবং সমস্বরে বলি— ‘তোমরা আমাদের গর্ব, কোনো বোঝা নও, তোমরা আমাদের সম্পদ, তাই ঘুরে দাঁড়াও’।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক (বিসিএস সাধারণ শিক্ষা) ও পিএইচডি গবেষক, যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড