শ্রীলঙ্কা: উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য নূতন বার্তা

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২২, ০৭:০০

দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কায় মানবিক সংকট কি আসন্ন? দেশটি আজ চরম দুর্দশাগ্রস্ত, ঋণের দায়ে আবদ্ধ। ঋণ পরিশোধ করিবার সামর্থ্য তো নাই-ই, বরং দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করাই দুরূহ হইয়া পড়িয়াছে। বাংলাদেশের নিকটও ঋণ চাহিয়াছে। বাংলাদেশ প্রথম বার ২৫ কোটি ডলার ঋণ দিলেও দ্বিতীয় দফায় শ্রীলঙ্কা ২০ কোটি ডলার চাহিয়াছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামতের ভিত্তিতে এই ঋণ না দিতে সরকারের অসম্মতি রহিয়াছে। শুধু বাংলাদেশই নহে, অন্যান্য দেশেও শ্রীলঙ্কা ঋণের জন্য যোগাযোগ করিতেছে। দেশটির অবস্থা এমন হইয়াছে যে, পরিস্থিতি সামাল দেওয়া দুরূহ হইয়া পড়িয়াছে। ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কায় পণ্যমূল্য বাড়িয়াছে কয়েক গুণ। ক্রেতারা পণ্য ক্রয়ের সামর্থ্য হারাইয়াছেন। মার্চ মাসে খাবারের মূল্য বাড়িয়াছে ৩০ শতাংশের বেশি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যাদি ক্রয় করা অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছে। এমনকি হাসপাতালে ওষুধ না পাইয়া রোগী বিনা চিকিৎসায় মারা যাইতেছে। খাদ্য, তেল ও বিদ্যুতের চরম সংকটে সেইখানে কারফিউ জারি করিয়াও সাধারণ জনগণকে ঘরে আটকাইয়া রাখা যায় নাই। পরিস্থিতি এমন যে, ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ই শুধু নহে, রাজনীতিতেও বড় ধরনের জটিলতা দেখা দিয়াছে। 

এমনটি আগেই ধারণা করা হইয়াছিল যে, করোনা-পরবর্তী বিশ্ব এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়িবে। দুই বৎসরের অধিক সময় অর্থনীতির চাকা বন্ধ থাকিবার পর খুলিতে শুরু করিলেও নূতন করিয়া আসিয়াছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। এই যুদ্ধ গোটা বিশ্ব জুড়িয়াই পণ্যমূল্য বাড়াইয়া দিয়াছে। চরম অনিশ্চয়তার মুখে শুধু অর্থনীতিকেই নয়, বরং কোনো কোনো দেশে সরকারের ভিতও নড়বড়ে করিয়া দিয়াছে। এমনটি ধারণা করা অমূলক হইবে না যে, এই পণ্যমূল্য বৃদ্ধিজনিত কারণে সৃষ্ট সামাজিক অস্থিরতা কোনো কোনো দেশের সরকার বদলের বড় নিয়ামকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইবে। শ্রীলঙ্কায় শুধু যে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাইয়াছে তাহা নহে, ঘরে রান্না করিবার গ্যাসও নাই। ফলে, প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের সামনে বিক্ষোভ করিলে তাহাদের দমাইবে-এমন শক্তি কোথায়? কোমলমতি শিশুরা খাবার না পাইলে ইহার দায়ভার কি রাষ্ট্রের নহে? রাষ্ট্রযন্ত্র হয়তো বিষয়টি অনুধাবন করিলেও নিরুপায়। বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা মাথায় লইয়া রাষ্ট্রের অন্যকিছু ভাবিবার ফুরসত কই? ১৯৪৮ সালের পর দেশটি কখনো এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়ে নাই। শতভাগ শিক্ষিত হইয়াও তবে কি ঋণ লইবার উচ্চাভিলাষই শ্রীলঙ্কার আজকের এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী? বিশেষত, গত প্রায় দেড় দশক ধরিয়া শ্রীলঙ্কা অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর হইয়া পড়িয়াছে। বর্তমানে প্রায় ৫১ বিলিয়ন ডলারের ঋণগ্রস্ত দেশটির সার্বভৌম বন্ডের কৌশলটিও সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না। ২০০৭ সালে সার্বভৌম বন্ডের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের কৌশল গ্রহণ করে। যাহার মেয়াদ শেষ হইতেছে এই জুনে। পাওনাদাররাও কঠিন চাপে ফেলিয়াছে। তাহাদের অর্থ ফেরত দিতে হইবে। অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয়কৃত সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা পরবর্তী দুই বৎসরে ফেরত দিবার চাপ রহিয়াছে চীনের পক্ষ হইতে। একসময় শহর-বন্দর উন্নয়নের উদ্দীপক গল্পের সেই শ্রীলঙ্কা এখন এতই ঋণগ্রস্ত যে, উদ্ধারের পথ খুঁজিতে নীতিনির্ধারকরা ঘর্মাক্ত। উদ্বেগে সমকক্ষ অর্থনীতির দেশগুলিও।

আসলে চলতি সংকট কোনো দেশের একার নহে। গোটা বিশ্বই ভয়ানক এক আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়া যাইতেছে। এই সময়ে ‘সুগার পপ’ কৌশলে অর্থনীতিকে টানিয়া তোলা যাইবে না। করোনা, যুদ্ধ ও তৎপরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনায় লইয়া যাহারা নীতি গ্রহণ করিবে না, তাহাদের শ্রীলঙ্কা হইতে কিছু শিখিবার রহিয়াছে। শুধু ব্যয় নির্বাহের কথা ভাবিলে হইবে না, আয় করিবার মাধ্যমগুলিকে সতেজ না রাখিলে ‘ঋণ করিয়া ঘি’ খাওয়া চলিবে হয়তো; কিন্তু সামনে অগ্রসর হইবার পথ রুদ্ধ হইয়া যাইবে? তাই উন্নয়নশীল কিংবা স্বল্পোন্নত দেশগুলির নীতিনির্ধারকদের একমাত্র মন্ত্র এখন অর্থনীতিকে সচল রাখা। ‘ঋণের ফাঁদে’ পা দিয়া ভবিষ্যৎ দুর্বিষহ করা নহে।
 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন