বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

শ্রীলঙ্কা: পরিবারতন্ত্র থেকে বিশ্বরাজনীতি

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২২, ০৮:৪৪

নো ডলার। নো ডিজেল। নো ইলেকট্রিসিটি। নো ফুড। শ্রীলঙ্কার একজন প্রাক্তন ডিপ্লোম্যাটের কাছে বর্তমানে তার দেশের পরিস্থিতি জানতে চাইলে তিনি ওপরের কথাগুলোই বললেন। আর এই ডলার, ডিজেল, ইলেকট্রিসিটি ও ফুড না থাকার ফলে আজ দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়েছে— প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনের বিক্ষোভ ঠেকাতে। পূর্ব এশিয়ার একটি দেশে কর্মরত একজন ডিপ্লোম্যাট নাম প্রকাশ না করার শর্তে (যেহেতু তিনি সরকারি চাকরিতে আছেন) বললেন, আসলে জরুরি অবস্থা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।

কারণ, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে যা ঘটেছে তাকে কেবল আরব স্পি্রংয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আর মানুষ সংগঠিত হয়েছে মূলত টুইটারসহ সব সোশ্যাল ফোরামের মাধ্যমে। তাও বিদু্যতের অভাবে অধিকাংশের সেল ফোন অকার্যকর হয়ে যাওয়া, ইন্টারনেট কাট হয়ে যাওয়া হয় বলে কিছুটা লোক কম হয়েছে। নইলে সেখানে আরো মানুষ হতো। তার পরও মানুষের মুখে মুখে ও সোশ্যাল ফোরামে ঐ এক স্লোগান প্রেসিডেন্ট গোটাবায়ের বিরুদ্ধে— ‘গো হোম গোটাবায়ে, অ্যান্ড ফ্যামিলি রুল।’ (গোটাবায়ে বাড়ি যাও, পরিবারতন্ত্র শেষ হোক) শ্রীলঙ্কার সিংহলি, তামিল, মুসলিম সবাই এখন গোটাবায়ের এই পরিবারতন্ত্রের, অর্থাৎ এক ভাই প্রেসিডেন্ট, এক ভাই প্রধানমন্ত্রী, এর অবসান চায়। এমনকি তাদের দলের নতুন জেনারেশান শিক্ষিত নেতারাও অবসান চায় এই পরিবারতন্ত্রের। তাদের বক্তব্য হলো, এই পরিবারতন্ত্রের কারণে, কেবলই অযোগ্যদেরকে জোগাড় করা হয়েছে রাজনীতিতে।

শ্রীলঙ্কার একজন তরুণ রাজনীতিবিদ ও থিংকট্যাংক মি. শচিন্তা আবেসুরিয়া, যিনি রাজনীতির ওপর উচ্চতর গবেষণা করছেন এখন অস্ট্রেলিয়াতে, তার বক্তব্য হলো, শ্রীলঙ্কার রাজনীতিটাই চলে গেছে অযোগ্য ও অশিক্ষিতদের হাতে। তার দল যদিও এই সরকারের কোয়ালিশনে আছে, তার পরেও তিনি মনে করেন এই সরকার বা পার্লামেন্টে এমন একজনও নেই, যিনি প্রকৃত বিশ্লেষণ করে বিদেশি ঋণ ও প্রজেক্ট গ্রহণ করতে পারেন। তার বক্তব্য হলো, আমাকে দেখতে হবে প্রথমে কোন প্রজেক্ট থেকে সত্যি সত্যি আয় হবে দেশের। যার ভেতর দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অর্থের জোগান বাড়বে। সেই ধরনের প্রজেক্টই একটি দেশ গ্রহণ করবে এবং তার বিপরীতে ঋণ নেবে। কিন্তু তার বদলে শ্রীলঙ্কায় হাম্বানটোটা পোর্ট, মাট্টালা এয়ারপোর্ট, লোটাস টাওয়ার, স্টেডিয়াম প্রভৃতি যে প্রজেক্টগুলো চায়নার কাছ থেকে উচ্চ ঋণ নিয়ে করা হয়েছে, এগুলোর কোনোটাই অর্থনীতিতে এ মুহূর্তে কোনো অর্থের জোগান দিতে পারছে না।

শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি অনেক দিন থেকে ভালো যাচ্ছিল না। তাদের ফরেন রিজার্ভ-সংকট মূল সমস্যা। যখন তারা বাংলাদেশের কাছ থেকে ২০০ মিলিয়ন ঋণ নেয় ফরেন রিজার্ভের জন্য, তখনই গোটা পৃথিবী বুঝতে পেরেছিল শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি দ্রুত খারাপের দিকে যাবে। তার পরও এ মুহূর্তে কেন এই অবস্থা ঘটল? এ প্রসঙ্গে আবেসুরিয়া ও শ্রীলঙ্কায় কর্মরত একজন পশ্চিমা ডিপ্লোম্যাটের বক্তব্য মোটামুটি একই রকম। শ্রীলঙ্কার এক্সপোর্ট থেকে মোট আয় বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার। তাদের ডিজেলসহ অন্যান্য সামগ্রী আমদানি করতে হয় বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের। অর্থাৎ তাদের প্রতি বছর আমদানি ও রপ্তানির মধ্যকার ঘাটতি ১০ বিলিয়ন ডলার। আবেসুরিয়ার মতে, এই ১০ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি মূলত পূরণ হয় পর্যটনের আয় ও প্রবাসী শ্রমিক ও অনান্য শ্রীলঙ্কানের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে। পর্যটন থেকে আসে ৩ বিলিয়ন ডলার এবং রেমিট্যান্স থেকে আসে ৬ বিলিয়ন থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার।

এবার কোভিডে ইতালি ও অস্ট্রেলিয়াসহ যেসব দেশে শ্রীলঙ্কানরা বেশি কাজ করে, তাদের প্রায় সবাইকে ফিরে আসতে হয়েছে। সরকার তাদের অন্য কোথাও পাঠাতে পারেনি এবং উদ্যোগও নেয়নি। অন্যদিকে পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, যেখানে শ্রীলঙ্কায় পর্যটনে বছরে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন মানুষ আসে সেখানে গত বছর এসেছে মাত্র ৮০ হাজার। তাই একদিকে যেমন রেমিট্যান্সও নেই, অন্যদিকে পর্যটন থেকেও আয় নেই। আর এর ভেতরই সময় হয়ে গেছে ঋণের কিস্তি দেওয়ার। কারণ, শর্তানুযায়ী যে কয় বছর পর থেকে এসব ঋণের কিস্তি দেওয়া শুরু করতে হবে, সে সময় পার হয়ে গেছে। আর এই ঋণের কিস্তি দিতে গিয়ে একেবারেই ফাঁকা হয়ে গেছে তাদের রিজার্ভ।

শ্রীলঙ্কার একদিকে রিজার্ভশূন্য, অর্থাত্ অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, অন্যদিকে মানুষ এই সরকারের বিদায় চাইছে—এমনকি যে নেতৃত্ব সরকারে আছে, তারা পরবর্তী সময়ে রাজনীতি করুক, তাও চাইছে না। কারণ, মানুষ গোটাবায়ের পরিবারতন্ত্রেরও অবসান চাইছে। তাই শ্রীলঙ্কার এই সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়। যদিও তাদের সরকার গোটা পৃথিবীর কাছে তুলে ধরতে চাইছে এ তাদের শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা। বাস্তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। সে দেশের অর্থনীতি যেমন সংকটে, রাজনীতিও তার থেকে কম সংকটে নয়। আর এর থেকে বের হয়ে আসার পথ কী? শ্রীলঙ্কার সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কোনো কারণে অপসারিত হলে বা চলে গেলে প্রধানমন্ত্রী ঐ দায়িত্ব পালন করতে পারেন। মানুষের দাবি অনুযায়ী সংবিধানের এই পথে হেঁটে কোনো লাভ নেই। কারণ, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী দুজনই একই পরিবারের এবং সম্পর্কে ভাই। আর সে দেশের মানুষের মূল দাবি পরিবারতন্ত্রের অবসান।

শ্রীলঙ্কান রাজনীতিক ও থিংকট্যাংক শচিন্তা আবে জয়সুরিয়ার মতানুযায়ী, ‘মানুষের দাবি সঠিক। কারণ, গোটা রাজনীতিটাকে ধ্বংস করেছে এই পরিবারতন্ত্র। তাদের পরিবারের রাজনৈতিক জমিদারি কায়েম করার জন্য দেশের অযোগ্য ও সুবিধাবাদীদের তারা রাজনীতিক বানিয়েছে এবং তাদের কেবিনেটে বসিয়েছে।’ অন্যদিকে বিরোধী দল দাবি করছে সবাইকে নিয়ে একটা জাতীয় সরকার গঠন করা। শচিন্তা মনে করেন, ‘বিরোধী দলকে নিয়ে এই জাতীয় সরকার করে কোনো লাভ নেই। কারণ, বিরোধী দল যদিও রাজপথে আছে। তারা দাবি করছে সরকারের পতনের। কিন্তু তারা তো জনগণের সামনে তাদের কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরতে পারেনি, কোন পথে তারা দেশের বর্তমান এই অর্থনৈতিক সংকট দূর করবে। তারাও বর্তমানে যারা সরকারে আছে, তাদের মতোই। তার পরও সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান এ রাজনৈতিক সংকটের সমাধানের একমাত্র পথ নতুন পার্লামেন্টে ইলেকশন দেওয়া। নতুন পার্লামেন্ট নির্বাচন দিয়ে গোটাবায়ে পরিবারকে বিদায় না করলে এই অর্থনৈতিক সংকট থেকে বের হবার মতো রাজনৈতিক শক্তির সেখানে আসার কোনো পথ নেই।’ সেক্ষেত্রে বিকল্প কোনো শক্তির ক্ষমতায় আসার সুযোগ আছে কি না—অর্থাত্ দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তানে যেমন রাজনৈতিক অস্হিরতার সুযোগ নিয়ে বারবার সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় এসেছে, শ্রীলঙ্কায় তেমন কিছু ঘটবে কি না? এ প্রসঙ্গে কানাডা প্রবাসী একজন শ্রীলঙ্কান থিংকট্যাংক একটু ঘুরিয়ে উত্তর দেন। সোজাসুজি কিছু বলেন না। তিনি বলেন, ‘আমি না বলতে পারি না। তবে সম্ভাবনা কম, আবার সম্ভাবনা যে নেই—তাও বলব না।’

এ প্রসঙ্গে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সামনে আসে শচিন্তা আবে জয়সুরিয়ার বক্তব্য থেকে। তার মতে, শ্রীলঙ্কার সমস্যা এখন আর চায়না ও ভারতের আধিপত্যের এবং চায়নার ঋণের ফাঁদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন মূল ফোকাস, ‘কলম্বো পোর্ট সিটি’। বাস্তবে ভারত মহাসাগরের অবস্হিত এই কলম্বো পোর্ট সিটি এ মুহূর্তে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ভবিষ্যতে ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। এর গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়, আগামী দিনের সামরিক আধিপত্যেরও। তাই কলম্বো পোর্ট সিটি তৈরিতে যে ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে, এই ডলার ব্যয়ে এবং এর আধিপত্য নিতে চায়নার থেকে এখন পশ্চিমারা অনেক বেশি মরিয়া হয়ে উঠেছে। কারণ, আমেরিকার নেতৃত্বে যে ইন্দো-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক ও সামরিক জোট হতে চলেছে সেখানে ভূ-রাজনৈতিক কারণে এই কলম্বো পোর্ট সিটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকার নেতৃত্বাধীন এই জোট কোনোমতেই এর থেকে তাদের আধিপত্য অন্য কারো কাছে যাক—তা চাইবে না।

তাই পৃথিবী আবার যখন নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধে ঢুকে গেছে সে সময়ে শ্রীলঙ্কার এই বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যাকে স্নায়ুযুদ্ধের আগামী দিনের হিসাবে ফেলেই হিসাব করতে হবে। সেখানে কলম্বো পোর্ট সিটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমাধান শুধু ভারত বা আইএমএফ দিয়ে হবে, এমনটি বলা যাচ্ছে না এ মুহূর্তে। বরং কলম্বো পোর্টের আগামী দিনের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব হিসাব করে, পরিবারতন্ত্রের বিদায়, পুনরায় পার্লামেন্ট নির্বাচন—সব হিসাবই মাথায় রাখতে হবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক। সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন