যুদ্ধে বারবার কেন মানবতার পরাজয় হয়?

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২২, ০৯:২৯

যুদ্ধবিগ্রহ ও ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তার আদিকাল হইতেই চলিয়া আসিতেছে। যুগে যুগে ইহার নির্মম শিকার হইয়াছেন সাধারণ মানুষ। কথায় বলে, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত যাহারা নেন, তাহারা অনেক সময় যুদ্ধের শিকার হন না। বরং প্রাণ যায় সৈনিক ও সাধারণ মানুষের।

ইউক্রেনে বর্তমানে যাহা ঘটিতেছে তাহাতে গা শিহরিত হইয়া উঠে। এই রকম নির্মম ও নৃশংস মৃত্যুর ঘটনা একবিংশ শতাব্দীতে আসিয়াও দেখিতে হইবে, তাহা আমরা ভাবিতে পারি নাই। এই যুদ্ধ কোনো আদর্শের সংগ্রাম নহে। যুদ্ধে বেসমারিক লোকদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হইতেছে কেন? কেন হামলা চালানো হইতেছে মানুষের বাড়িঘরের উপর? হামলা চালানো হইতেছে হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। এই সকল হামলার নৃশংস দৃশ্য সিএনএন, বিবিসি, আলজাজিয়া প্রভৃতি আন্তর্জাতিক চ্যানেলে দেখিয়া আমরা শোকে নিস্তব্ধ ও পাথর হইয়া যাইতেছি। বিশ্ব জুড়িয়া গণমাধ্যমের উন্নয়ন হওয়ার কারণে আজ কোনো কিছুই আর গোপন থাকিতেছে না। এমনকি অনেক সময় আমরা যুদ্ধের লাইভও দেখিতে পাইতেছি।

আজ ইউক্রেন যুদ্ধ ৪১তম দিনে গড়াইয়াছে। ইতিমধ্যে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী রাজধানী কিয়েভের আশপাশের বেদখলকৃত শহরগুলি পুনরুদ্ধার করিতে সক্ষম হইয়াছে। এই শহরগুলি উদ্ধার হইতেই যুদ্ধের ভয়াবহ তাণ্ডবলীলার চিত্র উঠিয়া আসিতে শুরু করিয়াছে। বিশেষ করিয়া রাজধানীর নিকটবর্তী বুচা শহরের মেয়র আনাতোলি ফেদোরুক দাবি করিয়াছেন যে, সেখানকার রাস্তায় রাস্তায় মরদেহ পড়িয়া রহিয়াছে। ইতিমধ্যে ২৮০ জনকে গণকবর দেওয়া হইয়াছে। প্রায় এক মাস বিদেশি শক্তির দখলে থাকিবার পর এই শহরটি পরিণত হইয়াছে মৃত্যুপুরীতে। বীভত্স লাশের পাশাপাশি রাস্তায় যত্রতত্র পড়িয়া রহিয়াছে পোড়া ট্যাংক। শহরের রাস্তায় এমন কিছু গাড়ি পড়িয়া রহিয়াছে যাহার ভিতরে রহিয়াছে লাশ আর লাশ। অনেককে সপরিবারে হত্যা করা হইয়াছে। এই শহরটিতে ইউক্রেনের শিশুদের মানবঢাল হিসাবে ব্যবহারেরও অভিযোগ উঠিয়াছে। শত্রুবাহিনী যাওয়ার সময় পথে পুঁতিয়া গিয়াছে স্থলমাইন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ অনেকে বলিতেছেন ইউক্রেনে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের ঘটনা ঘটিয়াছে।

যুদ্ধ মানবসভ্যতার জন্য অমানবিক বিপর্যয় ডাকিয়া আনে। যুদ্ধের ফলাফল মানেই যুদ্ধরত দেশ ও জাতির ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া। জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার (ওএইচসিএইচআর) হিসাবে গত ২ এপ্রিল পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ১ হাজার ৪১৭ জন বেসামরিক লোকের প্রাণহানি হইয়াছে। তাহার মধ্যে ১২১ জন শিশু। আহত হইয়াছে ২ হাজার ৩৮ জন। ৪ দশমিক ১৭ মিলিয়ন মানুষ বাস্ত্তচু্যত হইয়াছে। ইহা ইউক্রেনের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও অধিক। অধিকাংশ মানুষ আশ্রয় লইয়াছেন পোল্যান্ডে। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব নহে। তাহা ছাড়া এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাসী দুঃখ-দুর্দশায় নিপতিত হইয়াছে। জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে বিশ্ববাসীর ভোগান্তি ও দুর্ভোগ বাড়িয়া চলিয়াছে। উন্নয়নশীল অনেক দেশে অস্থিরতা শুরু হইয়া গিয়াছে। ইহাতে বিভিন্ন দেশে সরকার পতনেরও আশঙ্কা করা হইতেছে।

বর্তমান বিশ্বে কোনো পক্ষই যুদ্ধে জয়লাভ করিতে পারেন না। আফগানিস্তান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন প্রভৃতি দেশ তাহার প্রমাণ। সেই সকল দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ও বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়া ইহাই প্রমাণিত হয় যে, যুদ্ধে বারংবার মানবতারই পরাজয় হয়। শিশু ও নারীসহ লক্ষ লক্ষ বনি আদমের মৃত্যুর বিভীষিকা, অগণিত পঙ্গু মানুষের আর্তনাদ ছাড়া যুদ্ধে তেমন কিছুই অর্জিত হয় না। ইউক্রেন যুদ্ধ পৃথিবীর মানুষকে শেষ পর্যন্ত কোথায় লইয়া যাইতেছে? ইহার পূর্বেও আমরা দেখিয়াছি সময় বাঁধিয়া দিয়া মারণাস্ত্র থাকিবার মিথ্যা অজুহাতে আক্রমণ করা হইয়াছে ইরাক। কবি বলিয়াছেন, ‘এই পৃথিবী মানবের তরে, দানবের তরে নহে।’ অতএব যুদ্ধবিগ্রহ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত বন্ধ হউক, বিশ্বনেতাদের শুভবুদ্ধির উদয় হউক, সর্বত্র মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হউক—ইহাই আমরা প্রত্যাশা করি। সর্বশেষ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এক প্রস্তাবে আমরা যে মানবতার পক্ষাবলম্বন করিয়াছি—এই জন্য বাংলাদেশ সরকারকে সাধুবাদ জানাই।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন