বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার ‘বিড়াল’ গল্পে লিখেছেন, ‘আমি যদি খাইতে না পাইলাম, তবে সমাজের উন্নতি লইয়া কী করিব?’ আসলেও বিষয়টি তাই। উন্নতি যদি আমার না খেয়ে থাকার কারণ হয় অথবা উন্নতি যদি আমার দুবেলা পেটে ভাত পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই উন্নতি দিয়ে কী হবে? কয়েক বছর ধরে দেশের নিত্যপণ্যের বাজার ঊর্ধ্বগামী।
পেঁয়াজ থেকে শুরু করে চাল, ডাল, তেল, আটাসহ এমন কোনো পণ্য খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার দাম বাড়েনি। প্রকৃতপক্ষে পণ্যের দাম বাড়লেও আনুপাতিক হারে মানুষের আয় বাড়েনি, যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে দেশের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৫৫৪ ডলার। এক ব্যক্তি বলছিলেন, তিনি জীবনে দুবার কেঁদেছিলেন—একদিন, যেদিন তিনি তার বাবাকে কবরে রেখে এসেছিলেন এবং আর একবার যখন তার ছেলে ১০ টাকা চেয়েছিল, তিনি তা দিতে পারেননি। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির গাড়ির পেছনে সাধারণ মানুষের দৌড়ানো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তাদের কষ্টের কথা। দেশের মাথাপিছু আয় বাড়লেও সাধারণ মানুষের আয় যে বাড়েনি, সেটা সবার জানা। প্রকৃতপক্ষে কতটুকু ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, তা টিসিবির গাড়ির পেছনে ছুটে চলা মানুষদের দেখলেই খুব সহজে প্রতীয়মান হয়। এবারই প্রথম দেখা যাচ্ছে শহরের চাকরিজীবী পরিবারের গৃহিণী ও অন্যান্য সদস্যকে ট্রাক থেকে পণ্য নেওয়ার জন্য লাইন দিতে। অর্থনীতির হিসাবে গড় আয় ও প্রবৃদ্ধি বাড়লেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষের আয় বাড়েনি, ক্রয়ক্ষমতা বরং হ্রাস পেয়েছে। যেহেতু দ্রব্যমূল্য বাড়তি, টাকার মান কমছে, ফলে মানুষের প্রকৃত আয়ও কমতির দিকে। এই অবস্থায় কেবল পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতেই হিমশিম খাচ্ছে মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষ। করোনাকালে দরিদ্রের সংখ্যা বেড়েছে।
এ ধরনের একটি সামাজিক প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকার পবিত্র রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। বাজার মনিটরিং করছে ‘দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা ও পূর্বাভাস সেল’। অতি মুনাফা ঠেকাতে মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। কারাসাজি ঠেকাতে মাঠে রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২৮টি মনিটরিং টিম। ঢাকাসহ সারা দেশে ৩ হাজার ডিলারের মাধ্যমে ন্যাঘ্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ভেজাল রোধে বাজার তদারক করবে নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরের বিশেষ টিম। ন্যাঘ্যমূল্য ও সঠিক পণ্য বিক্রি দেখভালে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজারে থাকছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাজার তদারক করছে র্যাব ও পুলিশের বিশেষ টিম। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯ সদস্যবিশিষ্ট ‘বাজারমূল্য পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ’বিষয়ক স্থায়ী কমিটি কাজ করছে। কারণে-অকারণে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, গত ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশের ওপরে উঠেছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর (বিবিএস) ভোক্তা মূল্যসূচক পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ডিসেম্বরে গড় মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ওঠে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে, আগের মাসে যা ছিল ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। সংস্থাটি বলছে, গত কয়েক মাস ধরে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে, ফলে খাদ্যবহিভূর্ত পণ্যের দাম আরো বেড়েছে। সম্প্রতি আইএমএফ এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলপ্রধানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে তারা বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের সঙ্গে বৈঠক করে। আলোচনায় সরকারের আয়-ব্যয়, বাজেট বাস্তবায়ন ও আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের রাজস্ব আয় নিয়ে কিছু পরামর্শ দিয়েছে। সেখানে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও কড়া পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে উত্পাদন, বণ্টন, পরিবহন ও সরবরাহ পর্যায়ে তদারকি বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছে এই সংস্থা।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টন চালের চাহিদা রয়েছে, যার বিপরীতে চালের উত্পাদন হচ্ছে ৩ কোটি ৭৬ লাখ টন। ১৫ মার্চ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৫৯ হাজার টন, ৯ মার্চ পর্যন্ত খাদ্যশস্যের সরকারি মোট মজুত ১৯ লাখ ৩৩ হাজার টন, যার মধ্যে চাল ১৬ লাখ ৭৬ হাজার টন, গম ২ লাখ ২০ হাজার টন এবং ধান ৩৭ হাজার টন, প্রায় ২৫ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ লাখ ৪ হাজার টন, আমদানি হয়েছে ৬-৭ লাখ টন। আবার দেশে ভোজ্য তেলের চাহিদা প্রায় ২০ লাখ টন, রমজানে চাহিদা ২ লাখ থেকে ৩ লাখ টন, স্থানীয়ভাবে উত্পাদন হয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার টন, আমদানি হয়েছে প্রায় ১৮ লাখ টন, অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের আমদানি প্রায় ৫ লাখ টন, সয়াবিন বীজ আমদানি করা হয়েছে ২৪ লাখ টন, যা থেকে ৪ লাখ টন অপরিশোধিত তেল উত্পাদন হতে পারে। অপরিশোধিত পাম তেলের আমদানি প্রায় ১১ লাখ টন। দেশে চিনির চাহিদা রমজান মাসে ৩ লাখ টন, গত দুই মাসে ৪ লাখ ৮৮ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ লাখ ৬০ হাজার টন বেশি ইত্যাদি।
বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যে দেশে উত্সব হোক কিংবা দুর্যোগ; জিনিসপত্রের দাম অন্য সময় অপেক্ষা বাড়বে; এটা একদম অবধারিত। মালিকপক্ষ দয়াপরবশ হয়ে যে পর্যন্ত বাড়াতে চান, সেই পর্যন্তই তা বাড়বে। কমানোর সাধ্যি কারো নাই। ঘোষণা দিয়ে, না দিয়ে, এমনকি কর্তৃপক্ষের নির্দেশ উপেক্ষা করেও আগে থেকেই বাড়ানোর এক অন্িতম ক্ষমতা তাদের। নিয়ন্ত্রণের কোনো ক্ষমতা নেই কারোর। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখন এমন স্বাভাবিক ও সহনীয় পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, এটার প্রতিকার অপেক্ষা কোন পণ্যের দাম কত এবং কোন পণ্য কতটুকু কেনা যাবে সেদিকেই মানুষের মূল আগ্রহ। এমনিতেই করোনার কশাঘাতে চাকরিহারা, বেকার ও আয়রোজগার কমে যাওয়া জনগোষ্ঠী দৈনন্দিন খরচের টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে, তার ওপর মূল্যস্ফীতির চাপে বড় ধরনের ভোগান্িততে পড়েছে অনেক পরিবার। এ অবস্থায় যে কোনো উপায়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে মুদ্রার বিনিময় হার, আমদানি ও রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বস্ত্তত করোনা কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসার পর বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী সবকিছুর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ব জুড়ে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। মূল্যস্ফীতি বাড়লে ধনী আরো ধনী হবে, যার ফলে সরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু নীতি পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়বে; যেমন ব্যাংকের সঞ্চয় সুদ, ঋণের হার পরিবর্তন ইত্যাদি।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্যমন্ত্রী কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের নেতৃত্বে ১৭ সদস্যের এ কমিটি কাজ করছে। এ সবই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, বাজারে এর প্রভাব খুবই কম বলে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর আগে গঠিত টাস্কফোর্স দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে তেমন প্রভাব রাখতে পারেনি। বাজার পরিদর্শন আর কিছু ব্যবসায়ীকে জরিমানা করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, যা অতীতে দেখা গেছে। এক্ষেত্রে যথাসময়ে পণ্যের জোগান নিশ্চিত করার মাধ্যমে কারসাজি বন্ধ করা সম্ভব। এবার গঠিত উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সের কার্যক্রম দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে যা করা প্রয়োজন তা হলো—এক. চাল ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্য উত্পাদনের যে হিসাব দেওয়া হয়, তা বাস্তবের সঙ্গে কম সংগতিপূর্ণ, যার জন্য বার্ষিক কী পরিমাণ চাল ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করতে হবে সেভাবেই আমদানির ব্যবস্থা করা দরকার, মজুতদারির বিষয়ে কড়া তদারকি বজায় রাখতে হবে। এছাড়া বাজারে মূল্য নির্ধারণ এবং তা স্হিতিশীল রাখার ব্যাপারেও সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে।
দুই. সামনের দিনগুলোয় আরো বেশি পণ্যসামগ্রীর উচ্চমূল্য ঘটতে পারে। কারণ মূল্যস্ফীতি এখন একটা বৈশ্বিক বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। বিশ্বে সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হয়েছে, দেশে উত্পাদন ব্যাহত হয়েছে, কাঁচামালের দাম বাড়ছে, বিশ্বের কয়েক প্রান্েত যুদ্ধ হচ্ছে বা হবে হবে অবস্থা চলছে, তেলের দাম বাড়ছে, আমদানিকারকদের আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে। বিশ্বে গত ৩০ বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি এখন ওপরের দিকে। একসময় প্রায় ‘শূন্য মূল্যস্ফীতি ছিল এবং বৈশ্বিক এই প্রবণতার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। কারণ এরই মধ্যে বাংলাদেশে যে মূল্যস্ফীতি ঘটে গেছে, এই পরিস্হিতিটা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সরকারের করণীয় হচ্ছে টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রি আরো বাড়ানো। যেমন উপজেলা, ইউনিয়নসহ গ্রামগঞ্জেও এই ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি বন্ধে তদারকি কার্যক্রম শক্তিশালী করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তিন. একটি গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে যে, বর্তমান বাজার ব্যবস্থাপনায় সমস্যা রয়েছে, যার জন্য বাজার তদারকি কার্যক্রম শক্তিশালী করতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একচেটিয়া প্রভাব খাটিয়ে বা পণ্যের অবৈধ মজুতের মাধ্যমে কেউ যাতে কোনো পণ্যের বাজার অস্হির করতে না পারে, সেজন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। চার. বাজার কারসাজি বন্ধ করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ হচ্ছে বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। কিছুদিন আগে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে একটি রিটে হাইকোর্ট বলেছে, কখনো কোনো কারসাজির ঘটনার বিরুদ্ধে লক্ষণীয় আইনি পদক্ষেপ দেখা যায় না। আসলে এ দেশে যখনই দ্রব্যমূল্যের কারসাজি করে বিরাট অঙ্কের টাকা লোপাট করা হয়েছে, তখনই তার হিস্যা পৌঁছে যায় বহুদূর। তাই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে এ দেশে ।
লেখক: গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
