শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইউক্রেন: স্নায়ুযুদ্ধের পুনরাবৃত্তি

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২২, ১০:১১

স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী ২৫ বছর বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এক অভূতপূর্ব শান্তির সময় পার করেছে। বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর বিদেশনীতিতে শক্তি প্রদর্শনের যুদ্ধ প্রস্তুতি, সেটির জন্য অপেক্ষা এবং পেছনে পেছনে সেসব যুদ্ধের ব্যাপারে দরকষাকষি— সবই অনুপস্থিত  ছিল। ইউক্রেন যুদ্ধ পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, শান্তির সেই সময়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। এখন জরুরি বিষয় হলো, এই দ্বন্দ্ব কোনদিকে মোড় নেয় এবং আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের নীতি কী হবে সেটি মূল্যায়ন করা। এসব মূল্যায়নের একটি দিক হলো সাম্প্রতিককালে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় আমেরিকার অভিজ্ঞতা ও স্নায়ুযুদ্ধ, যেগুলো থেকে অনেক কিছু শেখার আছে এবং নির্দেশও করা সম্ভব।

হাল ব্র্যান্ডের দ্য টোয়াইলাইট ট্রাগল বইটিতে তিনি স্নায়ুযুদ্ধের সময়কাল থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরেছেন। স্নায়ুযুদ্ধের মধ্য থেকে প্রাপ্ত প্রাসঙ্গিক কিছু শিক্ষার কথা তিনি বিশেষভাবে বলেছেন— জোটভুক্ত সদস্যদের ম্যানেজ করার গুরুত্ব এবং অসুবিধা। তাদের সংশোধন করা এবং তাদের অনিবার্য ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া। স্বচ্ছ কৌশল অথচ যে কোনো কার্যোদ্ধারে নমনীয়তার উপযোগিতা। এবং কখনো কখনো সময় সুযোগ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া। ব্র্যান্ড স্নায়ুযুদ্ধের এক একটি পর্ব থেকে এই শিক্ষাগুলো লিপিবদ্ধ করেছিলেন, যেটি পাঠকদের এমন একটি অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে, যার মাধ্যমে তারা বুঝতে পারবে, কোনটি করা উচিত আর কোনটি উচিত নয়।

রাশিয়ার আগ্রাসনের জবাবে বর্তমান শক্তিশালী পশ্চিমা জোট যেভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে এবং নিজেদের সুসংহত করেছে— মূলত এই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করেই জোটের সদস্যদের একতাবদ্ধ হওয়ার গুরুত্ব লেখক তুলে ধরেন। যদিও লেখক ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তার লেখা শেষ করেন, সে কারণে তিনি যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারেননি। তাছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধ স্নায়ুযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে বেশ খানিকটা ভিন্ন।

১৯৪৫ সালের পর ইউরোপে বড় ধরনের কোনো অস্ত্রের মহড়া সমৃদ্ধ যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। যদিও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডবলীলা এখানেই ঘটেছিল। সেদিক থেকে পুতিনের যুদ্ধ সমগ্র বিশ্বকে ৪০-এর দশকের মাঝামাঝিতে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে ইউক্রেনে যেটি হচ্ছে, সেটি স্নায়ুযুদ্ধে যা ঘটেছিল সেটিরই পরিচিত এক প্যাটার্নকে মনে করিয়ে দেয়। এ ধরনের একটি প্যাটার্ন হচ্ছে— ইউক্রেনের যুদ্ধ একধরনের প্রক্সি যুদ্ধ।

যেই যুদ্ধে পরমাণু শক্তিধর সুপার পাওয়ার রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধ করছে ন্যাটোর বিরুদ্ধে, যারা অস্ত্রশস্ত্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে ইউক্রেনকে, তাদের শত্রুর বিরুদ্ধে। এই প্যাটার্ন কোরিয়া ও ভিয়েতনামে আমেরিকার যুদ্ধ এবং আফগানিস্তানে রাশিয়ার যুদ্ধের প্যাটার্নকেই অনুসরণ করছে। সেই সব যুদ্ধে পরমাণু শক্তিধর কোনো দেশ অন্য দেশের ভূখণ্ডে গিয়ে লড়াই করেছে। অতীতের এসব যুদ্ধে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশটি পরাশক্তিধর দেশগুলোকে প্রতিহত করতে পেরেছিল প্রতিবেশী দেশ থেকে সাহাঘ্য-সহযোগিতা পাওয়ার কারণে। যেমন কোরিয়া যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধে চীন যেভাবে তাদের সহযোগিতা করেছিল, ঠিক একইভাবে পোল্যান্ড ইউক্রেনকে সরাসরি সমর্থন ও সহযোগিয়তা করে যাচ্ছে।

যুদ্ধ সর্বাবস্থাতেই বিপজ্জনক— বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েই বলা যায়, বিশেষ করে যেসব দেশ পরমাণু শক্তিধর দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ন্যাটো রাশিয়ান সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ থেকে বিরত রয়েছে, ঠিক যেমনটা ঘটেছিল স্নায়ু যুদ্ধকালীন প্রক্সি যুদ্ধগুলোতে। এ ধরনের সংঘর্ষ পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে পারে এমন একটি অগ্রহণযোগ্যভাবে ঝুঁকি তৈরি করবে এবং তাই এটি ঘটতে দেওয়া উচিত নয়। সে কারণে ন্যাটো ইউক্রেনের ওপর নো-ফ্লাই জোন স্থাপনে গড়িমসি করছিল, যার জন্য রাশিয়ান বিমানকে আকাশ থেকে গুলি করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে এবং অনিবার্যভাবে সেসব বিমান পরিচালনাকারী কিছু কর্মীকে হত্যা করতে হবে, যেটি রাশিয়ার বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আক্রমণ করার নামান্তর। ইউক্রেনীয়রা তাদের দেশের প্রতিরক্ষার জন্য ন্যাটো অস্ত্রশস্ত্রের ওপর নির্ভর করতে পারে, তবে ন্যাটোর সৈন্য কিংবা বিমানবাহিনীর ওপর নয়।

তবু আমেরিকান ও ন্যাটোর সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ অসম্ভব কিছু নয়। অন্তত দুটি আতঙ্ক এই সম্ভবনাকে উসকে দিতে পারে— রাশিয়ার দিক থেকে রাসায়নিক কিংবা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার; এবং ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ন্যক্কারজনক আক্রমণ; এর ফলে ন্যাটো দেশগুলো তাদের সুরক্ষার জন্য হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হতে পারে।

আরেকটি সাদৃশ্য হলো, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তান স³ায়ুযুদ্ধের যুগে যে কৌশল গ্রহণ করেছিল, ইউক্রেন সেই কৌশলই অনুসরণ করছে। ইউক্রেনীয়রা রাশিয়ানদের হয়তো পরাজিত করতে পারবে না এবং তাই তাদের পর্যাপ্ত শাস্তি দেওয়ার কৌশল নিতে হবে—রাশিয়ান সৈন্যদের হত্যা, আহত বা বন্দি করার মাধ্যমে। এর ফলে রাশিয়ার সরকার রক্তপাত চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে যুদ্ধ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেবে। আমেরিকান সরকার ভিয়েতনামে (এবং স্নায়ুযুদ্ধের পরে, ইরাক এবং আফগানিস্তানেও) একই কৌশল নিয়েছিল এবং সোভিয়েত সরকার আফগানিস্তানের জন্যও একই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। এটি দুর্বল দেশগুলোর জন্য একটি ক্লাসিক কৌশল, যুদ্ধকে প্রতিপক্ষের ভোগান্তির কারণে পরিণত করে যথাসম্ভব ক্ষতি করা আর এর মাধ্যমে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের ক্ষতি কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্ররোচিত করা।

এটি অন্তত বোঝা যাচ্ছে যে রাশিয়ানদের প্রচুর হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি করার মাধ্যমে তাদের সৈন্যদের মনোবল হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে—রাশিয়ান সেনাবাহিনীকে পিছু হটতে ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি রাশিয়ার ওপর বিশ্ব যে বিস্তৃত পরিসরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, সেটি রাশিয়ার সরকারকে ইউক্রেনের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি মীমাংসার জন্য খুব দ্রুতই আলোচনায় বসতে প্ররোচিত করবে। যদি স্নায়ুযুদ্ধের সেই পূর্বের প্যাটার্ন আবার মিলে যায়, সেক্ষেত্রে বেশ দীর্ঘায়িত লড়াই করা ছাড়া ইউক্রেন শিগ্গিরই সফলতার মুখ দেখবে না। এর ফলে এত দিন যে প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের সম্মুখীন তারা হয়েছে, তার চাইতেও অধিক ক্ষতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্রথম কয়েক সপ্তাহে ইউক্রেন যুদ্ধ কয়েকটি বিস্ময়কর ঘটনা দেখিয়েছে। রাশিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব স্পষ্টতই প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কঠোর প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে। সেই প্রতিরোধের উৎস হলো ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদ-বিদেশি নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি দেশে বসবাসের দৃঢ়সংকল্প। ঠিক একইভাবে জাতীয়তাবাদ, উপজাতি এবং ধর্মীয় আনুগত্যের স্থানীয় সংস্করণ ব্যবহার করে আফগানরা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, সেটি সোভিয়েত ইউনিয়নকে পিছু হঠাতে ভূমিকা পালন করে। এমনকি এই কসমোপলিটান এবং বিশ্বায়নের যুগেও জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে।

লেখক: প্রফেসর ইমেরিটাস, জন হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: এইচ এম নাজমুল আলম

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন