পার্লামেন্ট পুনর্বহাল, শনিবার অনাস্হা ভোট

দেশের জন্য শেষ বল পর্যন্ত লড়াই করবো: ইমরান খান

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২২, ০২:৪৬

গত ৩ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনীত অনাস্থা প্রস্তাব খারিজের রায় দেন দেশটির ডেপুটি স্পিকার কাসিম খান সুরি। এরপরই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি ইমরান খানের আহ্বানে পার্লামেন্ট ভেঙে দেন। তবে বৃহস্পতিবার কাসিম সুরির অনাস্থা প্রস্তাব বাতিলের সিদ্ধান্ত ও সংসদ ভেঙে দেওয়াকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। এতে করে দেশটির পার্লামেন্ট পুনর্বহাল হলো এবং আগামী শনিবার ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবে ভোটাভুটি হবে।

এদিকে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এক টুইট বার্তায় ইমরান খান বলেছেন, তিনি দেশের জন্য শেষ বল পর্যন্ত লড়াই করবেন। তিনি জানিয়েছেন, আজ শুক্রবার জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, আজ শুক্রবার মন্ত্রিসভার বৈঠক ডেকেছেন তিনি। সূত্রের বরাত দিয়ে জিও নিউজের এক খবরে বলা হয়েছে, আদালতের রায়ের আগে আইনজীবী টিমের সঙ্গে বৈঠকে ইমরান বলেছিলেন, আদালয়ের যে কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিতে তিনি রাজি আছেন।

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট সে দেশের জাতীয় পরিষদকে বহাল করে এক রায় দিয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনীত এক অনাস্হা প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। রায়ে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের আনা অনাস্হা প্রস্তাবটি খারিজ করে জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার কাসিম সুরি সংবিধান বিরুদ্ধ কাজ করেছেন এবং এতে সংবিধানের ৯৫ ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে দেশটির প্রধান বিচারপতি উমর আতা বান্দিয়ালের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে এই ঐতিহাসিক রায় দেয়। আদালতের রায় অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে প্রেসিডেন্টের পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বেআইনি। রায়ের ফলে ইমরান খানের সরকার আবারও বহাল হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট আগামীকাল শনিবার জাতীয় পরিষদে বিরোধীদের আনা অনাস্হা প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটির নির্দেশ দিয়েছে। আদালত বলেছে, শনিবার স্হানীয় সময় বেলা সাড়ে ১০টায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে। এই ভোট শনিবারই হতে হবে, কোনো কারণ দেখিয়ে এই অধিবেশন মুলতুবি করা যাবে না।

বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে, আদালতের এই রায়ের অর্থ হলো—বিরোধী দল শনিবার অনাস্হা ভোট করে ইমরান খানকে পরাজিত করবে এবং তাকে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতে হবে। যদিও ইমরান খান চাইলে এর আগে পদত্যাগ করতে পারেন। আদালতের রায়ে আরো বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্হা প্রস্তাব সফল হলে জাতীয় পরিষদ নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করতে পারবে। সেক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিরোধী আইনপ্রণেতাদের সমর্থন নিয়ে পিএমএল-এনের নেতা শাহবাজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন বলে জল্পনা চলছে। উল্লেখ্য যে, পাকিস্তানের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো প্রধানমন্ত্রী তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। আদালত বলেছে, পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচনের জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তার কোনো কার্যকারিতা নেই।

এই রায়ে প্রমাণ হলো—পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে সপ্তাহকাল ধরে যে নাটকীয়তা ও অচলাবস্হা চলছিল তার প্রেক্ষাপটে দেশটির প্রেসিডেন্ট, স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া পদক্ষেপগুলো ভুল ছিল। বিরোধীরা এই রায়কে স্বাগত জানালেও ইমরান খানের সরকার বলেছে, দেশ আরো অস্হিতিশীলতার দিকে যেতে পারে। রাজনৈতিক সংকট আরো ঘনীভূত হতে পারে। ইমরান খান বলেছেন, তিনি শেষ বল পর্যন্ত দেশের জন্য লড়াই করবেন।

রায় ঘোষণার আগে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আদালতের আশপাশের এলাকায় অবস্হান নেয় দাঙ্গা পুলিশ। রায় ঘোষণার আগে আদালত পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনের সচিবকে তলব করে। আদালতে হাজির হন পিএমএল-এন প্রধান শাহবাজ শরিফ, পিপিপির প্রধান বিলাওয়াল ভুট্টোসহ শীর্ষ রাজনীতিকরা।

যেভাবে তৈরি হলো এই সংকট

ইমরান খান ২০১৮ সালের নির্বাচনে জিতে প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি দুর্নীতি মোকাবিলা করা এবং অর্থনীতি ঠিক করার কথা বলে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। পাকিস্তানের জনগণের বিরাট অংশের মধ্যে এখনো তার জনপ্রিয়তা আছে। তবে পাকিস্তানে মুদ্রাস্ফীতি এবং বিদেশি ঋণ বাড়তে থাকায় ইমরানের সমর্থন কমতে শুরু করে।

অনেক পর্যবেক্ষক অবশ্য বলছেন, পাকিস্তানের অত্যন্ত ক্ষমতাধর সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ইমরান খানের সম্পর্ক ক্রমশই খারাপ হচ্ছে এবং এটাই তার বড় রাজনৈতিক দুর্বলতা। গত বছর ইমরান খান পাকিস্তানের প্রভাবশালী সামরিক নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্হার নতুন প্রধানের নিয়োগপত্রে সই করতে অস্বীকৃতি জানান। সেখান থেকেই এই পরিস্হিতির শুরু বলে মনে করা হয়।

ইমরান খানের রাজনৈতিক বিরোধীরা এরই সুযোগ নেন। গত মাসের শুরুর দিকে তারা পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদে ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্হা প্রস্তাব পেশ করে। ক্ষমতাসীন জোটের কিছু শরিককে তারা ভাগিয়ে বিরোধী শিবিরে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। এমনকি ইমরান খানের দলের পিটিআইর কিছু আইনপ্রণেতা পক্ষত্যাগের ঘোষণা দেয়। এর ফলে পার্লামেন্টে ইমরান খান সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারান। অনাস্হা ভোটে তার পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়।

গত রবিবার এই প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইমরান খানের নিজের দল এই প্রস্তাব আটকে দেয়। অনাস্হা প্রস্তাব বাতিল করে ডেপুটি স্পিকার কাসিম সুরি বলেন, এই অনাস্হা প্রস্তাব পাকিস্তানের সংবিধানের ৫ অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। সরকার ফেলে দেওয়ার জন্য ‘একটা বিদেশি রাষ্ট্রের’ সঙ্গে ‘পরিষ্কার আঁতাত’ দেখা যাচ্ছে। এ ঘটনার কয়েক দিন আগে থেকেই ইমরান খান বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছিলেন, তারা বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তিনি আরো অভিযোগ করেছিলেন, এই ষড়যন্ত্রের পেছনে আছে যুক্তরাষ্ট্র, কারণ তিনি রাশিয়া এবং চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এ জন্যই তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সুপ্রিম কোর্টে মমলা ও রায়

ডেপুটি স্পিকারের অনাস্হা প্রস্তাব বাতিলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি আমলে নেয়। এছাড়া বিরোধীরাও সরকারের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ দায়ের করে সুপ্রিম কোর্টে। বিরোধীদের অভিযোগ যেভাবে অনাস্হা প্রস্তাব পার্লামেন্টে আটকে দেওয়া হয়েছে, তা ছিল বেআইনি, অসাংবিধানিক।

পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি উমর আতা বান্দিয়ালের নেতৃত্বে বিচারপতি ইজাজুল আহসান, বিচারপতি মাজহার আলম মিয়াখেল, বিচারপতি মুনিব আখতার এবং বিচারপতি জামাল খান মন্দোখেলের সমন্বয়ে গঠিত পাঁচ সদস্যের বেঞ্চে গত সোমবার এই বিষয়ের ওপর শুনানি শুরু হয়। গতকাল সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায়ে বলা হয়েছে, গত ৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্হা প্রস্তাব খারিজ করে জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার কাসিম খান সুরি যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তা স্পষ্টতই ত্রুটিপূর্ণ ছিল। জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান রাষ্ট্রপতির কাছে যে সুপারিশ করেছিলেন তা ছিল বেআইনি এবং প্রেসিডেন্ট ড. আরিফ আলভি এই লক্ষ্যে যে ঘোষণা করেন তাও ছিল অবৈধ।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে দেশের জয় হয়েছে: বিরোধীদলীয় নেতা

বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর বিরোধী নেতারা বিজয়সূচক প্রতীক চিহ্ন প্রদর্শন করেন। পিএমএল-এন নেতা শাহবাজ শরিফ বলেন, পাকিস্তানের জন্য এটি ঐতিহাসিক দিন। সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে—তা শুধু সংবিধানের রক্ষাকবচ নয়, বরং পাকিস্তানেরও রক্ষাকবচ।

পিপিপি পার্টির নেতা বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি বলেছেন, গণতন্ত্র হলো সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ। পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট পার্টির নেতা মওলানা ফজলুর রহমান বলেন, আমি আজ দেশের সমগ্র মানুষকে অভিনন্দন জানাই। সংবিধানের জয় হয়েছে। বিরোধীদের আইনজীবী হায়দার জামান কুরেশি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, সরকার পরিবর্তন খুব শিগ্গিরই হচ্ছে।

আদালতের রায় দুর্ভাগ্যজনক: ইমরানের তথ্যমন্ত্রী

তবে আদালতের সিদ্ধান্তকে দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী। তিনি বলেন, একটি স্বাধীন পাকিস্তানের জন্য আমাদের আবারও লড়াই করতে হবে। বিরোধীরা পাকিস্তানকে দাসত্বের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। আমরা তাদের সফল হতে দেব না। এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, আদালতের এই রায় দেশকে আরো রাজনৈতিক অস্হিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাবে। আগাম নির্বাচনই স্হিতিশীলতা আনতে পারত।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি