করোনা মহামারির কারণে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। তবে বর্তমানে পরিস্হিতির উন্নতি হওয়ায় এখন স্কুল-কলেজগুলিতে পূর্ণোদ্যমে ক্লাস শুরু হইয়াছে। ইহারই মধ্যে উপস্হিত হইয়াছে পবিত্র মাহে রমজান। সাধারণত মাহে রমজানের সময় স্কুল-কলেজগুলিতে ছুটির পরিসর বৃদ্ধি পায়। এইবারও রমজান উপলক্ষ্যে ছুটির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আসিয়াছে। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে এই সংক্রান্ত আদেশ নিয়া বিভ্রান্তি তৈরি হইয়াছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০ রমজান অর্থাৎ ২২ এপ্রিল, শুক্রবার পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু রাখিবার সিদ্ধান্ত নিয়া নোটিশ জারি করিয়াছে। আর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০ এপ্রিল তথা ১৮ রমজান পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু রাখিবার নির্দেশ দিয়াছে। ইহা ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয় রমজান মাসে শুক্র ও শনিবার প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখিবার নির্দেশনা দিয়াছে। কিন্তু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এই ধরনের কোনো নির্দেশনা দেয় নাই। ফলে দুই মন্ত্রণালয়ের দুই ধরনের স্কুল চালু রাখিবার আদেশ জারি করায় বিপাকে পড়িয়াছে প্রাথমিক বিদ্যালয় সংযুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলি। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরাও ইহা লইয়া বিরক্ত ও বিভ্রান্ত।
আমাদের দেশে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় না থাকাটা একটি বিরাট সমস্যা। এই জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজে বিঘ্ন ঘটিতেছে। বিষয়টি ভাবিয়া দেখা ও চিন্তা করিবার যথেষ্ট অবকাশ রহিয়াছে। দুই বা একাধিক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব মহোদয়গণ একত্রে বসিয়া এই ধরনের উদ্ভূত সমস্যার সমাধান মাত্র কয়েক মিনিটেই করিতে পারেন। প্রয়োজনে টেলিফোনেও তাহারা অনেক সময় ছোটখাটো সমস্যার সমাধান করিতে পারেন। কিন্তু তাহারা কেন করেন না, তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত রিপোর্ট হইতে জানা যায় যে, দুই মন্ত্রণালয়ের অধীনে আমাদের শিক্ষাব্যবস্হার দুইটি স্তর থাকায় আদেশ পালন করিতে গিয়া দ্বিধাবিভক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলি পরিচালনা করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। ইহার বাহিরে যত ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রহিয়াছে তাহা নিয়ন্ত্রণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। স্বাভাবিকভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির তদারকির দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু যেই সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক স্তর সংযুক্ত রহিয়াছে, সেই স্তরের নিয়ন্ত্রণভার কাহার উপর? সেই সকল প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেয় এবং বিনামূল্যে বইও পাইয়া থাকে একই কর্তৃপক্ষ হইতে, তাহা হইলে সেখানে সেই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা কার্যকর হইবার কথা। কিন্তু এই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলিতেছেন, ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক স্কুলের বাহিরে অন্য কোনো প্রাথমিক স্তরের নিয়ন্ত্রণ-তদারকি তাহাদের কাজ নহে। আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক অধিদপ্তর বলিতেছে, তাহাদের দায়িত্ব ৬ষ্ঠ শ্রেণি হইতে উচ্চ স্তর পর্যন্ত। যখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নামে একটি নূতন মন্ত্রণালয় করা হইল, তখনই এই বিষয়টির সুরাহা হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এই দেশে প্রশাসনিক সংস্কারের কাজটি গতিশীল নহে। ইহার কারণে আন্তঃমন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত বহু জটিলতা এখনো রহিয়া গিয়াছে।
আমাদের দেশে ভূমি নিবন্ধন হয় আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। আর ভূমির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এই জন্য মাঝে মধ্যে নানা সমস্যা দেখা দেয়। এই ধরনের আরো দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। আসলে একটি উন্নয়নশীল দেশে সরকারের আকার হওয়া উচিত ছোট। স্মল গভর্নমেন্টের কথা আমরা বারংবার বলিয়া আসিতেছি। কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সংখ্যা বাড়িলেও তাহা কতটা যৌক্তিক কিংবা একই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে কীভাবে সমন্বয় করা হইবে তাহার ব্যবস্হা না রাখিয়াই আমরা অগ্রসর হইতেছি। ইহা কি অদূরদর্শিতার পরিচায়ক নহে? সুতরাং মাধ্যমিকের সঙ্গে সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলি কাহার আদেশে চলিবে ইহা একটি গুরুতর প্রশ্ন। এই প্রশ্নের সহিত জড়িত রহিয়াছে প্রশাসনিক সংস্কার ও সমন্বয়ের নানা বিষয়-আশয়। অতএব, এই বিষয়টি হালকাভাবে গ্রহণ করা অনুচিত।
