আমি বেড়ে উঠেছি স্নায়ুযুদ্ধের সময়, তখন এলিমেন্টারি স্কুলে পড়াকালীন আমরা বোমা হামলার মহড়ায় অংশ নিতাম। যখন কোনো বাঁশি কিংবা ঘণ্টা বেজে উঠত, তখন আমরা দৌড়ে আত্মরক্ষার জন্য কোথাও আশ্রয় নিতাম। আবার কখনো ক্লাসে শিক্ষক থাকাকালীন আমরা বেঞ্চের নিচেই মাথা লুকাতাম।
বিভিন্ন ভিডিও চিত্রে পরমাণু অস্ত্রের বিধ্বংসী তাণ্ডবলীলা দেখে আমার মাথায় ঘুরপাক খেত কীভাবে এ ধরনের মহড়া আমাদের জন্য কোনো ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। যদিও বোমা হামলার মহড়া কিছুটা হলেও সুরক্ষা দেয়। আমার মনে হতো যখন আমার মৃত্যু ঘটবে তখন বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ থাকলে সেটিই করা উচিত, কারণ সব ক্ষেত্রে সেই সুযোগ ঘটে না।
আমরা লুইসিয়ানার একটি শহরে বাস করতাম, শহরেরই মাঝখানে কোথাও, যেটি বার্কসডেল এয়ার ফোর্স বেস থেকে প্রায় ৩০ মিনিট দূরে অবস্হিত। এখানেই সাবেক রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশ, ৯/১১-এর হামলার পরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। যখন আমি ছোট ছিলাম তখন ভাবতাম, আমরা কোনো সামরিক এলাকার মধ্যেই থাকি, বিশেষ করে মাথার ওপর দিয়ে যখন প্রতিবার জেট বিমান চক্কর দিত এবং সেই বিমানগুলোর সুপারসনিক শব্দ এবং ধোঁয়ায় আচ্ছাদিত এলাকা দেখে তা-ই মনে হতো। এমনকি এলাকার সাধারণ মানুষও বোমা থেকে বাঁচার জন্য শেল্টার তৈরি করে রাখত।
আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরকে নিশ্চিত ধ্বংস করার মতবাদে দৃঢ়সংকল্প ছিল। সেই সময় উভয় দেশের কাছেই এত পারমাণবিক অস্ত্র ছিল যে, যদি একপক্ষ আক্রমণ চালানোর জন্য সেগুলি ব্যবহার করে, আমাদের বলা হয়েছিল যে অন্য পক্ষ অবিলম্বে উচিত জবাব দেবে এবং উভয় দেশই সম্ভবত বিশ্বকে ধ্বংস করে দেবে।
এই ধারণাটি আমাদের কিছুটা আশ্বস্ত কমরছিল; কিন্তু সেটি যথেষ্ট নয়। ধারণাটা এমন ছিল যে, কোনো রকম একটি ভুল হলেই সেটি দাহ্য ধোঁয়ায় ঢেকে দিত সমগ্র দুনিয়াকে। এই ভয় আমাদের তাড়িয়ে বেড়াত। ১৯৮৩ সালের জনপ্রিয় একটি সিনেমা ‘ওয়ারগেমস’-এ দেখানো হয়, একজন হাইস্কুল পড়ুয়া হ্যাকার ঘটনাক্রমে NORAD কম্পিউটারের সঙ্গে সংযোগ স্হাপন করে এবং সে ভেবেছিল সাধারণ মানের কোনো গেম খেলছে। কিন্তু ঘটনাটি প্রায় একটি পারমাণবিক যুদ্ধের সূচনা করে দিয়েছিল।
নতুন প্রজন্মের কাছে ব্যাখ্যা করা খুব কঠিন যে আমার বেড়ে ওঠার বছরগুলি এমন অনিশ্চয়তার সঙ্গে বেঁচে থাকতে কেমন লেগেছে, সব সময়ই মনে হতো পৃথিবী যে কোনো মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আমি জানি না, কীভাবে ব্যাখ্যা করব যে, সব সময়ই মনে হয় টাইম ক্যাপসুলের সাহায্যে সেই ক্লাস সিক্সে ফিরে যাই এবং সেই সময়কার সব অনিশ্চয়তাকে চিরতরে শেষ করে দিয়ে আসি। শুধু শ্রেণিকক্ষের সেই সময়কার প্র্যাকটিসই নয়, আমরা যা জানতাম তা মুছে ফেলা যেতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের সম্পর্কে যা জানতে পারবে তা একটি ক্যাপসুলে আবদ্ধ করার সুযোগও তৈরি হবে।
ভয় জিনিসটা আমাদের এতটাই ঘিরে রাখত যে, সেটি সাধারণ ঘটনা হয়ে ওঠে। ভয় দুর্বল ছিল না, অন্যদিকে ভয়কে মনে হতো দুঃসাহসিকতার অনুভূতি তৈরি করে দিচ্ছে, এমনকি শিশুদের মধ্যেও। আপনি কি করতেন যদি জানতেন আগামীকাল পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে? এই আশঙ্কা একই সঙ্গে পীড়াদায়ক এবং মুক্তিকামী ছিল।
তারপর ১৯৯১ সালে, যখন আমি কলেজের প্রায় শেষের দিকে ছিলাম, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায় এবং বিভক্ত হয়ে পড়ে, এর ফলে ঠাণ্ডা যুদ্ধের আকস্মিক সমাপ্তি ঘটে। এবং তখনই ইউক্রেন এবং অন্যান্য সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এবং আমার মনে হয়, তখনই শেষ বারের মতো আমি পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংসের বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে ভেবেছিলাম।
গত তিন দশকের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা থেকে মুক্তির পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের বিষয়ে এখনো মর্মাহত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, যেই পারমাণবিক অস্ত্রগুলো একসময় আমাদের আতঙ্কিত করেছিল সেগুলো এখনো বহাল-তবিয়তেই রয়েছে। এগুলো আমাদের ক্ষমতার প্রকৃত সীমাবদ্ধতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
ডিসেম্বরে প্রচারিত একটি সাক্ষাত্কারে পুতিন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন, যাকে তিনি পূর্বে বিশ শতকের ‘সর্বশ্রেষ্ঠ ভূরাজনৈতিক বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এটি ছিল ঐতিহাসিক রাশিয়ার বিচ্ছিন্নকরণ। আমরা একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশে পরিণত হয়েছিলাম, গত ১ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে আমরা যা তৈরি করেছিলাম তার বেশির ভাগই হাতছাড়া হয়ে যায়।’
পুতিন সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিরে পেতে চান। ইউক্রেন আক্রমণ সেই মহাপরিকল্পনারই অংশ। পুতিন সেই সাক্ষাত্কারে স্বীকার করেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পরই যখন রাশিয়ায় মুদ্রাস্ফীতি দ্বিগুণ অঙ্কে পৌঁছে যায়, তখন তিনি কখনো কখনো তার আয় বাড়ানোর জন্য ট্যাক্সি ড্রাইভার হিসেবে কাজ করেন। ‘এ ব্যাপারে কথা বলা আমার জন্য বিব্রতকর’ তিনি বলেন, ‘কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত, এটি হয়েছিল।’
এখন, তিনি সেই কঠিন সময়ের অপমানকে ফিরিয়ে দিতে চাইছেন। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন যে, পুতিন এখন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। আমার মতে যদি তা-ই হয়, সেটি ৬৯ বছর বয়সি পুতিনকে কোনো অংশে কম বিপজ্জজনক করে তোলে না।
পুতিনের এখন বস্ত্তগত আনন্দের কোনো প্রয়োজন নেই, তিনি তার চারপাশে বস্ত্তগত এমন সব জিনিসের অধিকারী হয়েছেন যে তার এ বিষয়ে আর কোনো আকাঙ্ক্ষার প্রয়োজন হবে। এর পরিবর্তে শেষ বয়সে এসে বিশ্বের অনেক মহান ব্যক্তি যেটি চেয়ে থাকেন, উত্তরাধিকারের নির্মাণ, ইতিহাস তৈরি করা, যার ছায়া দীর্ঘকাল ধরে তাকে বহন করবে, পুতিন এখন সেটিই চাইছেন।
পুতিন এখন শুধু যুদ্ধ জিততে কিংবা একটি অঞ্চল দখল করতে চান না, তিনি একটি উত্তারাধিকার তৈরি করতে চান, তিনি চান একটি ডানা তৈরি করতে, যে ডানার ওপর ভর করে রাশিয়া আবার উড়তে পারে। পুতিনের অহংকার তার আগ্রাসনকে উসকানি দেয় এবং সে কারণেই তিনি ইউক্রেনে তার পরাজয়কে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারবেন না। যে কোনো প্রকার জয় তার ক্ষুধাকেই বাড়িয়ে দেবে। সে কারণে কেন তিনি ইউক্রেন কিংবা ইউক্রেনের কোনো একটি অংশকে জয় করার ব্যাপারে আপস করবেন?
রাশিয়া কেবল একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশই নয়, প্রায় ৬ হাজার পারমাণবিক ওয়ারহেডসহ দেশটিতে বিশ্বের সবচাইতে বেশি পারমাণবিক মজুত রয়েছে, এবং দেশটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বড় অস্ত্রাগার রয়েছে। সে কারণেই পশ্চিমরা এখনো সংযত রয়েছে। পুতিন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে চলেছেন। এগুলো ফাঁকা বুলি হতে পারে, তবে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া অসম্ভব।
আমার মনে হয়, আমরা একপ্রকার অস্তিত্বের অনিশ্চয়তার নতুন একটি যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছি।
লেখক: সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে
ভাষান্তর- এইচ এম নাজমুল আলম
