সুখ-দুঃখের সম্মিলনই জীবন

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২২, ০৫:৫৩

সকালে মর্নিংওয়াকে বের হলে অনেক নিপাট সুখী মানুষের সাক্ষাৎ পাই। সাক্ষাতের শুরুতে কুশল বিনিময়ে সবাই বলে থাকেন, আলহামদুলিল্লাহ! কেউ বলেন, ইনশাআল্লাহ! বেশ ভালো আছি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আলাপচারিতার শেষে তাদের দুঃখের ফিরিস্তি শুনে অবাক হই! আর নিজের দুঃখের কথা বেমালুম ভুলে যাই। যেমন :কারো মেধাবী কিশোরী মেয়েটা বখাটে ছেলের সঙ্গে পালিয়েছে। যৌতুক লোভী স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ স্ত্রীর করুণ আহাজারি! বহুগামী স্বামীর অবহেলা-অনাদরে, বঞ্চনা আর নিগ্রহের ধূপ হয়ে পুড়ছেন সুন্দরী গৃহবধূ। বিধবা শাশুড়ি পুত্রবধূ কর্তৃক নির্যাতিত হচ্ছেন। কেউ-বা স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে সন্তানসহ বৃদ্ধ মা-বাবার ওপর বোঝা হয়ে আছেন। কারো সন্তান হচ্ছে না। স্বামীর অবহেলা আর শাশুড়ির জ্বালাতনে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। কেউ-বা প্রতিবন্ধী সন্তানের ভবিষ্যৎ দায়ভার নিয়ে মহাসংকটে। কিংবা ভাগ্যাহত বিপত্নীক বৃদ্ধ পুত্রবধূদের গলার কাঁটা হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন ইত্যাদি।

আসলে এই হলাম আমরা। নিরবচ্ছিন্ন সুখী লোক এই পৃথিবীতে নেই। সত্যটা এই যে, বিত্তশালী, ক্ষমতাসীন থেকে শুরু করে সবাই ‘ভালো আছি’ বলা সুখী মানুষগুলো কোনো না কোনো দিক দিয়ে অসুখী? সে হিসাবে বলতে গেলে দুঃখী মানুষে এ দুনিয়া পূর্ণ।

আমরা যদি কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাই, তবে দেখব অধিকাংশ লোকের চেহারায় দুঃখের ছাপ সুস্পষ্ট দৃশ্যমান। মনে হয় আমরা মানুষ যেন একেকটা দুঃখের সাগরে বাস করছি। আসলে তা নয়। মূলত সুখ-দুঃখের সম্মিলনই জীবন। তবে কোনোটাই চিরস্হায়ী নয়। কিন্তু সুখের স্মৃতিগুলো আমরা মনে লালন করি না। স্মৃতিতে ধরে রাখি না। ফলে সহজেই ভুলে যাই। পক্ষান্তরে, দুঃখের স্মৃতিগুলো পুষে রাখি। ভাবনায় সব সময় লালন করি আর স্মৃতিচারণায় কষ্ট পাই। কারণ, আমরা দুঃখবিলাসী। তাই সুখস্মৃতির অনুরণনগুলো ভেতরে স্হায়ীভাবে জায়গা করতে পারে না। কারণ, মন থাকে দুঃখ নামক নেতিবাচক আবেগের পূর্ণ দখলে। ফলে অহেতুক নেতিবাচক আবেগের তোড়ে সুখ নামক অনুভূতিগুলো শুকিয়ে যায়। জীবনের সুখ-দুঃখ মূলত প্রদীপের মতো। প্রদীপের নিচে অন্ধকার থাকবেই। সুতরাং সব সময় অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আফসোস করে লাভ নেই। বরং আলোর জন্য স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। মূলত যে ঘটনায় আমাদের হাত নেই, তাকে সহজে গ্রহণ করাটাই শ্রেয়। অযথা কারো কাছে দুঃখ বলে আদৌ কোনো লাভ নেই। কারণ, সমাজে দুঃখের ক্ষতে মলম দেওয়ার লোকের বড়ই অভাব, কিন্তু লবণ দেওয়ার লোকের অভাব নেই। তাছাড়া অযথা দুশ্চিন্তা করে সময়ক্ষেপণ করাটাও বোকামি। কারণ, জীবনে আমাদের আয়ুর সময়টা কিন্তু মাপা। এই স্বল্পায়ু জীবনে কিছু না কিছু সুখের স্মৃতিও আছে। সুতরাং, দুঃখের স্মৃতিগুলো ভুলে যান। আর কৃতজ্ঞচিত্তে সুখের স্মৃতিগুলো লালন করুন, ধারণ করুন। অবসর আবডালে প্রতিনিয়ত স্মৃতিচারণায় তা জীবন্ত করে তুলুন। মূলত যে অবস্হাতেই থাকুন, ‘বেশ ভালো আছি’—এই ভাবনাটুকু ধরে রাখুন। কারণ, ভাবনাও এক প্রচণ্ড শক্তি। ভাবনা শুধু বাস্তবতার বিবরণই দেয় না, বাস্তবতা সৃষ্টিও করতে পারে। এতে আপনার চেহেরায় প্রশান্ত ও সুখী মনের প্রতিচ্ছবিই প্রতিফলিত হবে। কারণ, চিন্তা বা অভিপ্রায়ের প্রতিফলন ঘটে স্বভাব বা প্রকৃতিতে। মূলত সুখ হচ্ছে ইতিবাচক এমন এক প্রশান্ত অনুভূতি, যা অযাচিত সব দুঃখ, অশান্তি বা উদ্বেগজনিত ভাবাবেগকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। মূলত, ঘটনা বা পারিপার্শ্বিকতা আমাদের দুঃখের বা সমস্যার কারণ নয়। কারণ, মূলত উদ্ভূত পরিস্হিতি কীভাবে গ্রহণ করলাম, তার ওপর। আসলে সুখ হচ্ছে কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিক্রিয়ায় আমাদের মনের অনুভূতির প্রতিফলন মাত্র। তাই সুখ নির্ভর করে মানুষের ব্যক্তিগত ভাবাবেগ, সর্বোপরি দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। এগুলো মূলত সুখের অনুঘটক। আর্থিক দুরবস্হা, দৈনতাও মানুষকে অুসুখী করে না। কারণ, মানুষের অভাববোধ ও অতৃপ্তিটাই অসুখী করে তোলে। তাই তো অর্থবিত্ত, ঐশ্বর্য-প্রাচুর্য, অঢেল সম্পদও মানুষকে সুখী করে না। তাই যদি হতো, তবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনীরা বিষণ²তায় ভুগতেন না। দুগ্ধ ফেননিভ শয্যায় শুয়ে মুঠো মুঠো ঘুমের ওষুধ খেতেন না। হতাশার চরমে পৌঁছে আত্মহত্যা করতেন না।

আসলে, ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সুখের স্বাধীনতাকে নষ্ট করে দেয়। ফলে হতাশা, বিষণ²তায় জীবন অর্থহীন ও ক্লান্তিকর বোঝায় পরিণত হয়। জীবন তো একটাই। তাই জীবন শেষ হয় এমন হতাশার কালো অন্ধকারে গহ্বরে যেন আমরা তলিয়ে না যাই। তাই এখন থেকে পজিটিভ চিন্তাচেতনা ধারণ করব। লালন করব। অন্যের প্রতি সংবেদনশীল হব। অপরিমেয় চাহিদার লাগাম টেনে ধরব। ফলে প্রতিমুহূর্তে সুখ নামক অনুভূতির অনুরণনে আন্দোলিত হব। উপভোগ করব উচ্ছ্বল আর নির্মল আনন্দ। আর সারাক্ষণ সুখ-সমৃদ্ধির সরোবরে অবগাহন করব। এতে সুখানুভূতি আর উপলব্ধির অদ্ভুত সংমিশ্রণে জীবন হবে প্রাচুর্যময়।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি