দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক নিয়োগ দেওয়া হতো। সেখানকার নগ্ন নিয়োগ-বাণিজ্যের অবস্থা চরমে উঠলে সরকার সেই নিয়োগ ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির কাছ থেকে সরিয়ে নেয়। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-কে শিক্ষক সুপারিশের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আশ্চর্যজনকভাবে নিয়োগদানের জন্য যাবতীয় কার্যক্রম রেখে দেওয়া হয় ম্যানেজিং কমিটি ও প্রতিষ্ঠান-প্রধানের কাছেই। যে কারণে এখন অবধি এনটিআরসিএ কর্তৃক সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়োগলাভের পথ নিষ্কণ্টক হয়নি। রয়ে গেছে এমপিওকরণে নাজুক অবস্থা।
বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যোগদান প্রক্রিয়া সারতে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও ম্যানেজিং কমিটির গড়িমসি তুমুল। যেহেতু এনটিআরসিএ শুধু নিয়োগ সুপারিশ করেন, তাই সুপারিশপত্র ইস্যুর পর নিয়োগদান ও যোগদান সম্পন্ন করার জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও ম্যানেজিং কমিটির অনুকম্পার ওপর নির্ভর করতে হয়। এনটিআরসিএ-র সুপারিশ পাওয়ার পরও একজন শিক্ষককে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যোগদানের জন্য ম্যানেজিং কমিটির অন্তত দুটি রেজুলেশনের প্রয়োজন পড়ে।
বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কোনো সাংসদ বা শিল্পপতি হয়ে থাকেন, যাঁদের বেশির ভাগই প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি থাকেন না, ঢাকায় অবস্থান করেন। যে কারণে অনেক সময় নিয়োগপত্র ইস্যু ও যোগদান অনুমোদন করার জন্য যে রেজুলেশন মিটিং করার দরকার পড়ে, তা শেষ হতে মাস পর্যন্ত গড়ায়। প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও ম্যানেজিং কমিটির হাতেপায়ে ধরে যোগদান করাই শেষ নয়। এরপর বাকি থাকে এমপিওভুক্তির আবেদন। সে এক দুরূহ প্রক্রিয়া। নতুন এমপিও আবেদন যেহেতু প্রতিষ্ঠানপ্রধানের করার কথা, সেহেতু প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ওপরই সর্বাংশে নির্ভর করতে হয় একজন নতুন শিক্ষককে। দীর্ঘদিনের উৎকোচ গ্রহণের যে নিয়মিত চর্চা, সেই চর্চা থেকে এখনো বের হতে পারেননি অনেক প্রতিষ্ঠানপ্রধান। তাই খুব নীরবে সেখানেও চলে এমপিও-বাণিজ্য। একটা নতুন এমপিও আবেদন করার জন্য অন্তত আটাশ থেকে উনত্রিশটা কাগজ প্রস্ত্তত করে আবেদনের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। আর এসব কাগজ প্রতিষ্ঠানপ্রধান ছাড়া নতুন শিক্ষকের পক্ষে জোগাড় ও সংগ্রহ করা অকল্পনীয়।
নতুন এমপিওভুক্তির জন্য যেসব কাগজ লাগে—১. প্রতিষ্ঠানের প্যাডে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির সীলমোহরসহ স্বাক্ষর, ২. সর্বশেষ পাবলিক পরীক্ষার ফল, ৩. প্রতিষ্ঠানের প্রথম স্বীকৃতি সনদ, ৪. সর্বশেষ স্বীকৃতি সনদ, ৫. এমপিও-অর্ডার, ৬. প্রথম এমপিও শিটের কপি, ৭. সর্বশেষ এমপিও শিটের কপি, ৮. সর্বশেষ মাসিক বিলের কপি, ৯. শিক্ষক-কর্মচারীর স্বাক্ষরসহ সবার নাম-পদবির কপি, ১০. বিষয়ভিত্তিক অনুমোদন কপি ও সংশ্লিষ্ট শাখায় রেজিস্ট্রেশনকৃত শিক্ষার্থীদের তালিকা, ১১. কম্পিউটার শাখা খোলার অনুমোদন কপি, ১১. প্রযোজ্য ক্ষেত্রে গ্রম্হাগারের সংরক্ষিত বইয়ের সংখ্যা, ১২. পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়া ছাত্রছাত্রীর স্বাক্ষরসহ পূর্ণতালিকা, ১৩. সর্বশেষ অনুমোদিত ম্যানেজিং কমিটির প্রজ্ঞাপন, ১৪. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান সনদ যা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান/মেয়রগণ দিয়ে থাকেন।
প্রতিষ্ঠানের ধরন ও শিক্ষকের বিষয়কে ভিত্তি করে আরো অতিরিক্ত কাগজপত্রের আবশ্যকতা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এতসব কাগজপত্র তৈরি ও সংগ্রহ সময়সাপেক্ষ ও জটিল কাজ। এমপিও ফাইল তৈরি করার পরও অপেক্ষা করা আরেক যন্ত্রণার। উপযুক্ত ফাইল মাদরাসার হলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের হাত ঘুরে সরাসরি অধিদপ্তরে চলে যায়। আর স্কুল-কলেজের হলে জেলা শিক্ষা অফিসার, আঞ্চলিক শিক্ষা অফিসারের দপ্তর হয়ে অধিদপ্তরে গিয়ে জমা পড়ে। এতসব টেবিলে ফেরেশতাতুল্য অফিসার সবার ভাগ্যে জোটে না। সেখানেও দর্শনীর মূল্যে ফাইল ছাড়িয়ে নিতে হয়। সেসব করতে করতে একজন নতুন শিক্ষকের পকেট থেকে বেরিয়ে যায় বিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার পর্যন্ত টাকা। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো অতি সম্প্রতি যোগ হয়েছে, অধিদপ্তরের প্রোগ্রামার কর্তৃক গণহারে এমপিও আবেদন ফাইল রিজেক্ট করার নতুন উপদ্রব। একবার দুবার প্রত্যাখ্যাত না হয়ে এমপিও আবেদন সম্পন্ন হওয়ার নজির খুব কমই আছে। যেহেতু প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ইউনিক আইডি নম্বর (EIIN) রয়েছে, চাইলে সরকার সেসব প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তথ্যের একটা ডেটাবেইজ তৈরি করতে পারে। এছাড়া যেসব কাগজপত্র দিয়ে এমপিও আবেদন করতে হয়, তার সমস্ত কিছু ই-রিকুজিশনের সময়ই নিয়ে নিতে পারে। প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে ই-রিকুজিশনের সময় সেসব কাগজপত্র আগেই নিয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে নতুন শিক্ষককে কেবল অনলাইনে যোগদান কনফার্ম করে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়।
এছাড়া বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমস্ত তথ্যই যেহেতু ব্যানবেইজের ডেটাবেইজে সংরক্ষিত আছে, সেখান থেকেও সব তথ্য সমন্বয় করে শিক্ষা অধিদপ্তরগুলো এমপিও আবেদন যাচাই করে নিতে পারে। এতে প্রতিবার নতুন এমপিও আবেদনগ্রহণের জন্য এত কাগজপত্র জোগাড় করার শর্ত আরোপের প্রয়োজন পড়ে না। আশা করি, এই ব্যাপারে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ মনোযোগ দেবেন এবং নতুন শিক্ষকদের এমপিও অটোমেশন করে হয়রানিমুক্ত করবেন।
সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক, খাজা মঈন উদ্দিন চিশতি (র.) দারুল উলুম দাখিল মাদরাসা, কিশোরগঞ্জ।
