পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আনা অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি নিয়ে চলছে চরম নাটকীয়তা। সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসারে গতকাল শনিবার নির্দিষ্ট সময়েই পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসেছিল।
আগের দিন প্রধানমন্ত্রী ইমরান জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন আদালতের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল, সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে নিয়েছেন। অনেকের ধারণা ছিলো-অধিবেশন শুরুর পর সহসাই অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হবে। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, নাটকীয়তা ততই বেড়েছে। অধিবেশন শুরুর পর সরকারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই সময়ক্ষেপণের পথ বেছে নেওয়া হয়।
গতকাল স্থানীয় সময় রাত ৮ পর্যন্ত মোট চারবার অধিবেশন মুলতবি করেন স্পিকার আসাদ কায়সার। ফলে অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর নির্দিষ্ট দিনেই ভোটাভুটি হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। এর মধ্যে গতকাল সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে ইমরান সরকারের পক্ষ থেকে। স্থানীয় সময় রাত ৯টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা) হঠাৎ করেই মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।
গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের শুরু হয়। শুরুতেই বক্তব্য রাখেন পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) সভাপতি শাহবাজ শরিফ। তিনি বক্তব্য দিতে শুরু করলে পিটিআই’র আইনপ্রণেতারা বাধা দিতে থাকেন। এরপর পরে বক্তব্য দিতে ওঠেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশি। তার ভাষণ শেষ হওয়ার আগেই অধিবেশন মুলতবি করেন স্পিকার।
জিও নিউজের এক খবরে বলা হয়, শনিবার অনাস্থা ভোট যেন অনুষ্ঠিত না হয়, সেজন্য অধিবেশন দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা করে সরকার। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে কমপক্ষে তিন ঘণ্টা কথা বলার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।
এর আগে সকালে তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী বলেন, অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর ভোট পরের সপ্তাহে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। তিনি বলেন, পররাষ্ট্র সচিব ‘বিদেশি হুমকিমূলক চিঠি’র বিষয়টি এর আগে আলোচনা করবেন।
এ নিয়ে পার্লামেন্টে দীর্ঘ বিতর্ক করতে পিটিআইয়ের এমপিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে সূত্রের বরাত দিয়ে জিও নিউজের এক খবরে বলা হয়, জাতীয় পরিষদের সেক্রেটারিয়েট শনিবারই অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর ভোট করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে, শনিবার ভোটাভুটি না হলে স্পিকারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হতে পারে।
সরকারের পাল্টা কৌশল নিয়ে আলোচনা করতে গতকাল দুপুরে বিরোধীদলীয় নেতা শাহবাজ শরিফের চেম্বারে বৈঠক করে বিরোধী দলগুলো। এরপর বিরোধীদলগুলোর একটি প্রতিনিধি দল স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাত করে। অধিবেশনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সরকার এবং বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা ঐক্যমতে পৌঁছায়।
পাকিস্তান সময় সাড়ে ১২টায় আবারও অধিবেশন বসার কথা থাকলেও পরে সেটি শুরু হয় আড়াইটায়। দুপুরের পর অধিবেশন শুরু হলে আবারো ভাষণ শুরু করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কুরেশি। এরপর আবারো অধিবেশন মুলতবি করা হয়।
জানানো হয়, ইফতারের পর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় আবারও অধিবেশন বসবে। কিন্তু বিরোধীরা অনাস্থা ভোটের জন্য চাপ দিতে শুরু করলে আবারও অধিবেশন মুলতবি করা হয়। জানানো হয়, স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৯টায় আবারো অধিবেশন বসবে। ফলে অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি নিয়ে সংশয়ের তৈরি হয়।
এদিকে ইমরান খানের সরকার গতকাল শনিবার সুপ্রিম কোর্টের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করেছে। গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে বিরোধীদলের আনা অনাস্থা প্রস্তাবটি খারিজ করে জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার কাসিম সুরি সাংবিধান বিরুদ্ধ কাজ করেছেন এবং এতে সংবিধানের ৯৫ ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে।
একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে প্রেসিডেন্টের পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বেআইনি ঘোষণা করা হয়। আদালত জাতীয় পরিষদ ও সরকার বহাল করে রায় দেয়। আদালত শনিবারই জাতীয় পরিষদে বিরোধীদের আনা অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটির নির্দেশ দেয়। আদালতের রায়ে বলা হয়, শনিবার স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে দশটায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে। এই ভোট শনিবারই হতে হবে, কোন কারণ দেখিয়ে এই অধিবেশন মুলতবি করা যাবে না।
গতকাল পিটিআই’র সাধারণ সম্পাদক আসাদ উমর, প্রধানমন্ত্রী সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা বাবর আওয়ান ও আইনজীবী মুহাম্মদ আজহার সিদ্দিক সুপ্রিমে কোর্টের ৭ এপ্রিলের রায় বাতিলের জন্য আবেদন করেন। আবেদনে তারা বলেছেন, আর্টিকেল ৬৯ এর আওতায় জাতীয় পরিষদের সময়সীমা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃত্ব করতে পারে না।
প্রসঙ্গত, সরকার টিকিয়ে রাখতে হলে ইমরান খানের ১৭২ জন সদস্যের সমর্থন লাগবে। কিন্তু শরিকরা ত্যাগ করায় এবং তার দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা সরে যাওয়ায় ইমরান খানের প্রতি এখন ১৪২ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন রয়েছে। ডনের এক খবরে বলা হয়েছে, অনাস্থা প্রস্তাবে ইমরানের বিরুদ্ধে পড়তে পারে ১৭৬ ভোট। এটি হলে প্রধানমন্ত্রীত্ব হারাবেন ইমরান।
আদালতের রায়ে আরো বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব সফল হলে জাতীয় পরিষদ নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করতে পারবে। যিনি দায়িত্ব পালন করবেন আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত।
গতকাল অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা শাহবাজ শরিফ, পিপিপি চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি, পিএমএল-এন সহ-সভাপতি মরিয়ম নওয়াজসহ অনেকেই। তবে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন না ইমরান খান।

শিগগির শুরু হতে পারে ইমরানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের ভোটাভুটি
পাকিস্তানের পার্লামেন্টে তুমুল হট্টগোল, বারবার অধিবেশন মুলতুবি