ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম হইল— ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ১২ প্রতিষ্ঠানে লোকসান সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা’। সরকারি প্রতিষ্ঠানে অব্যাহতভাবে লোকসান বৃদ্ধির বিষয়টি উদ্বেগজনক। বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া এই সকল প্রতিষ্ঠান লোকসান দেওয়ার পাশাপাশি ঋণভারে বা বকেয়া বিলে জর্জরিত থাকিতেছে। সবচাইতে আশঙ্কার বিষয় হইল, সাম্প্রতিক কালে এই সকল প্রতিষ্ঠানের লোকসানের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হইতেছে না। জাতীয় স্বার্থে এই সকল প্রতিষ্ঠানের লোকসানের আপডেট তথ্য প্রকাশ করিবার ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। ২০১৮-১৯ অর্থবৎসরে যেইখানে ৪৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লোকসানে ছিল আটটি প্রতিষ্ঠান, সেইখানে গত অর্থবৎসরে ১২টি প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনিয়াছে। এইভাবে আর কত সরকারি প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনিবে? গত অর্থবৎসরে সবচাইতে লোকসান গুনিয়াছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এক বৎসরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান বাড়িয়াছে পাঁচ গুণের অধিক। করোনা মহামারির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখিতে আমদানি বাবদ টিসিবির ব্যয় বৃদ্ধিতে এই লোকসান বাড়িয়াছে; কিন্তু অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, বিশেষত সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান কেন বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া লোকসান গুনিয়া চলিবে?
গত অর্থবৎসরে শীর্ষ লোকসানি সংস্থার দ্বিতীয় স্থানে উঠিয়া আসিয়াছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি)। গত বৎসর এই সংস্থার লোকসান ৯৭১ কোটি ৯৬ লক্ষ টাকা। তৃতীয় স্থানে রহিয়াছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি), যাহার লোকসানের পরিমাণ ৬৭৫ কোটি ৯৯ লক্ষ টাকা। ইহা ছাড়া লোকসানি অন্যান্য প্রতিষ্ঠান হইল— বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি), বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা (বিআরটিসি), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কতৃর্পক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), বাংলাদেশ মৎস উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি), বাংলাদেশ বস্ত্র শিল্প করপোরেশন (বিটিএমসি) ও বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিএসসিআইসি)। ঋণ ব্যবহারে বড় ধরনের দুর্নীতি ছাড়াও রাজনৈতিক প্রভাব, ট্রেড ইউনিয়নের অযাচিত হস্তক্ষেপ, অধিক জনবল, ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, পেশাদারিত্বের অভাব, মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে ব্যর্থতা, অধিক উৎপাদন ব্যয় ইত্যাদি কারণে এই সকল প্রতিষ্ঠান লোকসান দিতেছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দায়দেনা ও লোকসানের বিষয়টি দেশের অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেতস্বরূপ। কথায় বলে, ‘সরকারি মাল, দরিয়ামে ঢাল’। অর্থাত্, কোনো জিনিস যদি রাষ্ট্রের হয়, তবে সেই ক্ষেত্রে লাগামহীন অপচয়-অপব্যবহার ঘটিলেও যেন কোনো সমস্যা নাই। এই মন-মানসিকতা হইতে পূর্বে আমাদের বাহির হইয়া আসিতে হইবে। উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলির জন্য দিনের পর দিন সরকারি অর্থের অপচয় ঘটাইয়া কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অর্থ হইল ‘গরিবের হাতি পোষা’। কেননা, শেষ পর্যন্ত এই লোকসানের দায় জনগণের ঘাড়েই পড়ে। ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুয়া বিল-ভাউচারসহ নানাভাবে আর্থিক দুর্নীতির নিত্যনূতন কৌশল প্রয়োগ করিয়া সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে লুটপাট চালানো হইতেছে। বহু সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিকট ব্যাংকের যেমন দায়দেনা রহিয়াছে, তেমনি পরিষেবা বিল বাবদ বড় অঙ্কের টাকা বকেয়া রহিয়াছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিষেবা বিল যদি বকেয়া পড়িয়া থাকে বৎসরের পর বৎসর, তাহা হইলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি বিল পরিশোধে উৎসাহিত হইবে কীভাবে?
মূলত সরকারি শিল্পকারখানা কিংবা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানই হউক, সকলকে টিকিয়া থাকিতে হইলে ব্যাবসায়িকভাবে সফল ও লাভজনক হইতে হইবে। এই জন্য দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিচালনা করিতে হইবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে এই ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করিতে হইবে। প্রতিষ্ঠানগুলিকে লোকসানের পরিবর্তে লাভজনক করিতে বাজেটে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা উচিত। এই ব্যাপারে সরকারের নীতি ও ব্যবস্থাপনার গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রয়োজন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা। ইহা ছাড়া এই সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানের লোকসানের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রধান কর্মকর্তাকে অবশ্যই দায় লইতে হইবে। লোকসানি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংকট নিরসনে সরকারের নূতন করিয়া উদ্যোগ লওয়া একান্ত প্রয়োজন।
