বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় উপকরণের পাশাপাশি ফ্যাশনেও পরিণত হয়েছে। কথা বলা থেকে শুরু করে কম্পিউটার দিয়ে করা যায় এমন প্রায় সকল কাজই স্মার্টফোন দিয়ে করা যায়। স্মার্টফোনের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করা বিভিন্ন কৌশল। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— ফেসলক, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, পাসওয়ার্ড, পিন ইত্যাদি। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা ফোন লক-আনলক করার জন্য এ পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে থাকেন। নিরাপত্তজনিত বিভিন্ন কৌশলগুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো এ লেখায়। বিস্তারিত লিখেছেন মোজাহেদুল ইসলাম ঢেউ
ফেস রিকগনিশন
ফেস রিকগনিশন বা ফেস আনলক সিস্টেম নতুন কোনো পদ্ধতি নয়। অ্যান্ড্রয়েডে এই প্রযুক্তিটি অনেক আগে থেকেই ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে পূর্বের ফেসলক থেকে বর্তমান ফেসলক সিস্টেম অনেকটা নিরাপদ। তবে, এটি ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও পিন লক এর মতো নিরাপদ নয়। আগে ফেসলক -আনলকের জন্য ক্যামেরা দিয়ে ফেসের ছবি ওঠানো হতো এবং ফেসের সঙ্গে মিল করে ফোন আনলক করা হতো। এই পদ্ধতিটি অন্ধকারে ফেস আনলক খুব ভালো কাজ করতো না। আবার ফেসের পরিবর্তে ওই ব্যক্তির ছবি দেখিয়েও এসকল ফেস লক আরামে খুলে ফেলা যেত।
অ্যাপেল তাদের আইফোন এক্স-এর সঙ্গে যে ফেস রিকগনিশন সিস্টেম দিয়েছে, সেটির নাম রাখা হয় ফেস আইডি। এটি আলাদা পদ্ধতিতে কাজ করে। এতে শুধু ক্যামেরার মাধ্যমে বিভিন্ন টাইপের সেন্সর ব্যবহার করা হয়, তারপরে ফেসের থ্রিডি মডেল তৈরি করে সিস্টেম নিজে নিজেই অনেক শিক্ষা লাভ করে। তারপরে সেই অনুসারে কাজ করে।
মিড বাজেট থেকে শুরু করে উচ্চ বাজেট পর্যন্ত প্রায় সকল ডিভাইজেই বর্তমানে ফেসলক সিস্টেম দেখা যাচ্ছে। একেক ডিভাইজে একেক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। যেগুলো শুধু ক্যামেরা দিয়ে কাজ করে সেগুলো কম সিকিউর তবে আলাদা ম্যাকানিজম ও বিভিন্ন সেন্সরের সাহায্যে কাজ করা ফেসলক সিস্টেম শুধু ক্যামেরা ইউজ করে ফেসলক সিস্টেম থেকে বেশি নিরাপদ।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট
স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে অধিকাংশ ব্যবহারকারীই স্মার্টফোন আনলক করতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকেন। কেননা এটি অনেক বেশি ফাস্ট! — হ্যাঁ পাসওয়ার্ড বা পিন প্রবেশ করানো আরো বেশি সিকিউর কিন্তু কেউ যদি আমার অজান্তে পাস থেকে পাসওয়ার্ড গেস করে ব্যাস কেল্লা ফতে! ফিঙ্গারপ্রিন্ট কেউ গেস করতে পারবে না। সবচাইতে বড় কথা হচ্ছে এটা সবচাইতে বেশি ফাস্ট।
যাদের মস্তিষ্ক অত্যন্ত বেশি ধারালো, মাত্র চার সংখ্যার পিন সেটাও সহজেই যারা ভুলে শেষ করে ফেলে, ফিঙ্গারপ্রিন্ট তাদের জন্য স্বর্গের পাঠানো সিকিউরিটি সিস্টেম। ফিঙ্গারপ্রিন্ট ইউনিক একটি পদ্ধতি। এটি রিপ্লেস করা সম্ভব নয়। কিন্তু হ্যাকারদের কাছে রয়েছে মারাত্মক ব্রিলিয়ান্ট সকল পদ্ধতি। ২০১৩ সালে জার্মানির Chaos Computer Club — কাঁচ থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট উদ্ধার করে এটার হাই রেজুলেশন ইমেজ তৈরি করে যেটার মধ্যে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মারাত্মক বর্ণনা ছিল। তারপরে সেই ইমেজ থেকে সেন্সরকে বোকা বানানোর জন্য রাবারের মতো একটি ফিঙ্গারপ্রিন্ট তৈরি করে, যেটার দ্বারা সহজেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরকে তারা বোকা বানাতে সক্ষম হয়।
যদি বলি কয়েকদিন পূর্বের কথা সেক্ষেত্রে স্যামসাং গ্যালাক্সি এস১০ এর হাই টেক অ্যাল্ট্রা সনিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিডারকেও বোকা বানানো হয়েছিল এক ৩উ প্রিন্ট করা ফিঙ্গার এর সাহায্যে । হ্যাকার যদি আপনার ফোন চুরি করে সেক্ষেত্রে অবশ্যই পূর্বে থেকে আপনার ফোনে আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট থাকবে, জাস্ট সেগুলোকে খুঁজে বের করে কম্পিউটারে হাই রেজুলেশন ইমেজ তৈরি করতে পারলেই কাজ শেষ!
পিন লক
পিন ব্যবহার করা ফেস লক বা ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতো এত অ্যাডভান্সড নয় আবার পাসওয়ার্ডের মতো অত্যধিক মাত্রায় সিকিউরডও নয়। তবে পিন কতটা নিরাপদ সেটা নির্ভর করে আপনি কোন্ ডিভাইজ ইউজ করেন তার উপরে। অনেক ডিভাইজ রয়েছে যেগুলোতে নির্দিষ্ট পরিমাণে ভুল পিন কোড প্রবেশ করালেই ডিভাইজ থেকে স্বয়ংক্রিয় সকল ডাটা মুছে যাবে। যদি আপনি পরিচিত কেউ ফোনটি আনলক করার চেষ্টা করে সেক্ষেত্রে তার অনুমান মিলে গেলে ফোনটি আনলক হয়ে যেতে পারে, যদি না হয় সেক্ষেত্রে সকল ডাটা ইরেজ হয়ে যাবে। পিনের সুবিধা হচ্ছে আপনি ইচ্ছামতো সেটাকে পরিবর্তন করতে পারবেন, যেটা ফেস লকের ক্ষেত্রে বা ফিঙ্গারপ্রিন্টে সম্ভব নয়। হ্যাঁ, পাসওয়ার্ডও ইচ্ছামতো পরিবর্তন করতে পারবেন, কিন্তু সেগুলোকে মনে রাখা কষ্টের। পিন সে তুলনায় মনে রাখা সহজ, কেননা মাত্র কয়েকটি সংখ্যায় যুক্ত থাকে। আপনার পিন যদি কেউ গেস করে ফেলে সেক্ষেত্রে সহজেই পিন পরিবর্তন করে হ্যাক হওয়া থেকে বাঁচতে পারেন। যেখানে বায়োমেট্রিক সিকিউরিটি পরিবর্তন করার পদ্ধতি নেই। মানে কারো কাছে আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্টের হুবহু মডেল থাকলে বারবার আপনার সকল ডিভাইজই বাইপাস করে ফেলতে পারবে, যদিও এতে হাই টেক প্রয়োজনীয়!
পিনেও কিন্তু অসুবিধা রয়েছে, একদিক থেকে বলতে গেলে পিন ক্র্যাক করা সবচাইতে সহজ ব্যাপার। শুধু হ্যাকারের হাতে যদি যথেষ্ট সময় থাকে ব্রুট ফোর্স অ্যাটাক মেরে আপনার পিন বের করে ফেলতে পারবে। যদি পিনের সাথে এক্সট্রা সিকিউরিটি থাকে, ব্রুট ফোর্স প্রটেকশন থাকে সেক্ষেত্রে পিন ক্র্যাক করা মুশকিল হতে পারে। ৪ সংখ্যার পিনের সিকিউরিটি লেভেল এক আবার ৬ সংখ্যার পিনের সিকিউরিটি লেভেল আরেক। এই হিসেবে দেখতে গেলে প্যাটার্ন লক ইউজ করা বেশি সিকিউরড, বাট গবেষকরা এটাও প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে প্যাটার্ন লকও তেমন সিকিউরড নয়। হ্যাকারের কাছে এমন সফটওয়্যার টুলসও রয়েছে যেটা আপনার ফোন বন্ধ রেখেই পিন ট্রাই করতে পারে, মানে ভুল পিন প্রবেশ করালেও সেটা ফোন গুনতে পারবে না, ফলে আরামে ব্রুট ফোর্স অ্যাটাক চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
পাসওয়ার্ড
যদি সিকিউরিটির কথা বলি র?্যান্ডম পাসওয়ার্ড তৈরি করে ফোন লক করা সবচাইতে বেস্ট সিকিউরড পদ্ধতি, কিন্তু দিনে আপনি কতবার ফোন আনলক করেন? ৫০-১০০ বার বা আরো বেশি হতে পারে। তো এতবার বারবার করে সেই কমপ্লেক্স পাসওয়ার্ড প্রবেশ করানো বিরাট এক প্যাড়ার কাজ। অনেকে তো চার সংখ্যার পিন মনে রাখতে সক্ষম নয়, তাদের কাছে কমপ্লেক্স পাসওয়ার্ড তো অনেক দূরের ব্যাপার।
পাসওয়ার্ড অনেক স্লো, আপনি কত কমপ্লেক্স পাসওয়ার্ড সেট করেছেন সে অনুসারে আনলক করতে ততবেশি সময় লাগতে পারে। ইমারজেনসি অবস্থায় পাসওয়ার্ড দ্রুত খুলতে সমস্যা হতে পারে, পাসওয়ার্ড বারবার ভুল প্রবেশ করালে ফোন আনলক হওয়া থেকে কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার জন্য ব্যান হয়ে যেতে পারে।
