পাকিস্তানের রাজনীতির যত নাটকীয়তা

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২২, ০৫:০১

পাকিস্তানে কে যে স্বৈরাচার, আর কে আচার—তা নির্ধারণ করা কঠিন। সেখানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারও ক্ষমতার মেয়াদ শেষ করতে পারে না। তার আগেই তাকে দুর্নীতির অভিযোগে, কিংবা অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আবার সামরিক শাসকদেরও একই পরিণতি ভোগ করতে হয়। সিরিয়াস আলোচনায় যাওয়ার আগে প্রথমেই পাকিস্তানের এক স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে নিয়ে একটি কৌতুক শোনা যাক।

আইয়ুব খান ‘উন্নয়নের এক দশক’ পালন উপলক্ষ্যে নিজের ছবি দিয়ে স্ট্যাম্প বের করার পর একদিন খোঁজ নিতে গেলেন।

— কি, স্ট্যাম্পটা কেমন চলছে?

— স্ট্যাম্প তো চলছে না স্যার। সবকিছু ভালো হয়েছে; কিন্তু ভালো আঠা দেওয়া হয় নাই।

— কী! ডাকো তাকে। আঠার দায়িত্বে কে ছিল?

আঠার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসে বললেন, স্যার আঠা তো ভালোই দিয়েছি; কিন্তু লোকজন তো আঠার দিকে থুতু দেয় না, থুতু দেয় উলটো দিকে।

গত এক মাস ধরে পাকিস্তানের রাজনীতিতে মঞ্চস্হ হয়েছে জমজমাট নাটক। কখনো ক্ষমতাসীন ইমরান খানের দাপট, কখনো বিরোধী পক্ষের। আবার কখনো আদালতের। রাজনৈতিক মঞ্চে সেনাবাহিনী এসে পড়ে কি না, সেই গুজবও ছিল। ইমরান খানের বিপক্ষে অনাস্হা প্রস্তাব আনা হয় গতকাল রবিবার মধ্যরাতে। যেখানে ইমরান খানকে সরাতে দরকার ছিল ১৭২টি ভোট, সেখানে ভোট পড়ে ১৭৪টি। এরই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিদায়ঘণ্টা বেজে যায়।

গত ৮ মার্চ ইমরান খানের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে অনাস্হা প্রস্তাব জমা দেয় পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলো। এ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা ও ভোটাভুটির জন্য অধিবেশন ডাকতে স্পিকারের প্রতি লিখিত আবেদন জানায় তারা। ইমরান খান তখনো আত্মবিশ্বাসী, তিনি বিরোধীদের উলটো একহাত দেখে নেওয়ার কথা জানান। বলেন, অনাস্হা ভোটে বিরোধীরা হেরে যাওয়ার জন্য প্রস্ত্তত কি না! পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, অনাস্হা প্রস্তাব উত্থাপনের পর স্পিকারকে ১৪ দিনের মধ্যে অধিবেশন ডাকার কথা ছিল। কিন্তু সে সময় রাজধানী ইসলামাবাদে ইসলামি সহযোগিতা সংস্হার (ওআইসি) সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে দুই দিনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এ বৈঠকের জন্য সেই তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ২৫ মার্চ শুক্রবার আবারও অধিবেশন ডাকা হলেও সেদিন অনাস্হা প্রস্তাব উত্থাপন ছাড়াই ২৮ তারিখ পর্যন্ত অধিবেশন মুলতুবি ঘোষণা করেন স্পিকার। ২৮ তারিখের অধিবেশনে অনাস্হা প্রস্তাব উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় নেতা শাহবাজ শরিফ। সংবিধান অনুযায়ী প্রস্তাব উত্থাপনের পর তিন দিন পার হলেই ভোটাভুটি করা যায়। তবে ভোটাভুটির জন্য সাত দিনের বেশি সময় নেওয়া যাবে না। ২৮ তারিখ প্রস্তাব উত্থাপনের পর আবারও ৩১ মার্চ পর্যন্ত পার্লামেন্ট অধিবেশন মুলতুবি ঘোষণা করেন ডেপুটি স্পিকার কাসিম খান সুরি। এরপর সর্বশেষ এ নিয়ে ৩ এপ্রিল ভোটাভুটির তারিখ নির্ধারিত হয়।

অনাস্হা প্রস্তাব আনার প্রথম থেকেই ইমরান খানকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিল বিরোধীরা। তাদের পক্ষে ছিল ১৬২ আইনপ্রণেতাও। যদিও ইমরানকে সরাতে প্রয়োজন ছিল ১৭২ ভোটের। তবে অনাস্হা প্রস্তাব আনার পর হঠাত্ করেই ইমরানের দল পিটিআইর ২৪ এমপি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। তারা ইমরান খানের পদত্যাগ করার ঘোষণা দেয়। এতে প্রচণ্ড চাপে পড়ে যান ইমরান। বিরোধীদের আত্মবিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসে ইমরানের বিপদ তত বাড়তে থাকে। একদম শেষ মুহূর্তে সরকারি জোট ছাড়ার ঘোষণা দেয় মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট। তারা তাদের পাঁচ আসন নিয়ে বিরোধীদের দলে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এর মধ্য দিয়ে ইমরান খানের অনাস্হা ভোটে হারা সময়ের ব্যাপারে পরিণত হয়।

তবে ক্রিকেট মাঠের মতো রাজনীতিতেও খেলে গেছেন ইমরান। তিনি আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন যে, শেষ বল পর্যন্ত ব্যাট করবেন তিনি। পাকিস্তানের পুরো রাজনৈতিক সংকটের জন্য তিনি বিদেশি শক্তিকে দায়ী করেন। প্রথমে কোন দেশ ষড়যন্ত্র করছে, না জানালেও পরে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আঙুল তোলেন তিনি। প্রমাণ হিসেবে তিনি একটি চিঠি দেখান। সেই চিঠি তিনি সিনিয়র সাংবাদিক, মন্ত্রিসভা ও সেনাপ্রধানের কাছে তুলে ধরেন। এই ষড়যন্ত্রের দাবিকে ঘিরেই সর্বশেষ রাজনীতি চলতে থাকে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় ফেব্র‚য়ারি মাসের শেষ দিকে। রাশিয়া সফরে যান ইমরান খান। সে সময় ইউক্রেনে আগ্রাসনের কারণে রাশিয়াকে শাস্তি দিতে উন্মুখ হয়ে উঠেছে পশ্চিমা বিশ্ব। নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে ইমরানের মস্কো সফরকে ভালোভাবে নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। সে সময়ই যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাক রাষ্ট্রদূতকে তলব করেন মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডনাল্ড লু। তিনি অবিলম্বে ইমরান খানের সফর বাতিলের জন্য চাপ দেন। কিন্তু পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। আর এতেই ক্ষিপ্ত হয় যুক্তরাষ্ট্র। ৭ মার্চ পাক রাষ্ট্রদূত আসাদ মজিদের সঙ্গে আবারও বৈঠক করেন লু। এতে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইমরান খান যদি অনাস্হা প্রস্তাবে টিকে যান, তাহলে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আর সম্পর্ক রাখা সম্ভব হবে না। একই ঘটনার কথা জানানো হয়েছে রাশিয়ার তরফ থেকেও। পাকিস্তানের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করছে দাবি করে এর নিন্দা জানায় রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেন, ইমরান খানকে শাস্তি দিতেই যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে।

এত সব নাটকীয়তার মধ্যে গত ৩ এপ্রিল পার্লামেন্টে অধিবেশন শুরু হয়। হিসাব অনুযায়ী ঐদিনই অনাস্হা ভোটে হেরে বিদায় নেওয়ার কথা ইমরান খানের। কিন্তু সেদিন পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হতে না হতেই শুরু হয় আরেক নাটকীয়তার। স্পিকার কাসিম সুরির সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হওয়ার পরই প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্হা প্রস্তাবকে খারিজ করে দেন তিনি। এর পরপরই ইমরান খানের পরামর্শে পার্লামেন্ট ভেঙে দেন প্রেসিডেন্ট। স্পিকারের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে অনাস্হা প্রস্তাবের স্বপ্ন ভেঙে যায় বিরোধীদের। এরপরই এই রাজনৈতিক সংকট সুপ্রিম কোর্টে গড়ায়।

বিরোধী দলগুলো পাঞ্জাবের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করে। একই সঙ্গে তারা সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অনাস্হা প্রস্তাব বাতিলের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেন। অভিযোগের শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্ট পার্লামেন্ট পুনর্বহাল করেন এবং পার্লামেন্টে অনাস্হা প্রস্তাবের ওপর ভোটগ্রহণের জন্য তারিখ নির্ধারণ করে দেন।

এক্ষেত্রে আজ সোমবার নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যিনি শপথ নেবেন তিনি ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকে যেতে পারেন। এরপরে পাকিস্তানে আবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে বর্তমান পরিস্হিতিতে ইমরান খানকে অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হবে। ৬৯ বছর বয়স্ক এই সাবেক ক্রিকেট তারকাকে আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে। কারণ, বিরোধীরা এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছেন। এর ফলে এমন পরিস্হিতিও হতে পারে যে, ইমরান খান আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষিত হতে পারেন। ২০১২ ও ২০১৭ সালে পাকিস্তানে এমন নজির দেখা গেছে।

যাহোক, আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত পাকিস্তানে আগামী দিনে কী হবে তা বলা মুশকিল। আমরা বরং পাকিস্তান নিয়ে দুয়েকটা প্রচলিত জোক শুনি।

অনেক দিন পর দুই পাকিস্তানি বান্ধবীর দেখা। বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তার পর এক বান্ধবী আরেক বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে বলল, এবার তোর নিজের কথা বল। স্বামী-সংসার নিয়ে কেমন আছিস?

— আর বলিস না, গত পাঁচ বছর খুব সুখেই কাটিয়েছি। এবার বুঝি সেটা শেষ হতে চলল।

— কেন? স্বামীর সঙ্গে কি খারাপ সম্পর্ক যাচ্ছে?

— না, এ ব্যাপারে ওর কোনো হাত নেই। গত পাঁচ বছর ধরে তিনি তো দুর্নীতির অভিযোগে বিদেশে পলাতক ছিলেন। সামনের মাসেই তিনি দেশে ফিরে আসছেন।

পাকিস্তান মিলিটারিতে ভর্তি করার জন্য মিলিটারির প্রধান এক জোয়ানের সাহসের পরীক্ষা নিচ্ছে। মিলিটারি প্রধান ঐ ছেলের মাথার ওপর একটা ডিম রেখে ঐ ডিমটাকে পিস্তল দিয়ে শুট করল। কিন্তু ছেলেটা একটুও নড়ল না!

ডিমটা ফেটে ঐ লোকটার শার্ট নোংরা হয়ে যাওয়ায় মিলিটারি প্রধান ছেলেটাকে ৫০ টাকা দিয়ে বলল, এই টাকা দিয়ে তুমি শার্টটা ওয়াশ করে নিয়ো।

ছেলেটা বলল, আরো ৫০ টাকা দেন স্যার। প্যান্টটাও ধুতে হবে!

লেখক: রম্যরচয়িতা

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন