মানবসভ্যতা টিকিয়া আছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের খুঁটির উপর ভর করিয়া। একেকটি প্রতিষ্ঠান গড়িয়া উঠে উহার অন্তর্নিহিত শক্তির দ্বারা। এই কারণে প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলা খুব সহজ কাজ নহে। মানুষের সেবা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্যই সৃষ্টি হইয়াছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু তাহাদের প্রতি বিভিন্ন সময়ে তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষ আস্থা রাখিতে পারেন না, ইহা বুঝা যায় যখন কোনো দেশের সরকারপ্রধান বলিয়া থাকেন—পুলিশকে মানুষের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করিতে হইবে। মানুষের ভালোবাসা আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করিতে পারিলে পুলিশের সংখ্যার প্রয়োজন হইবে না, মানুষকে সঙ্গে লইয়াই যে কোনো অপরাধ দমন করা যাইবে।
আমরা প্রায় সকল জমানাতেই দশকের পর দশক ধরিয়া শুনিয়া আসিয়াছি—আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে যাহারা রহিয়াছেন, তাহারা যেন নিরীহ জনগণকে হয়রানি না করেন। সকল সময় দেশের মানুষের পাশে থাকিবার কথা শুনিয়াছি, মানুষের সেবা করিবার কথা শুনিয়াছি। এখন প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জিত হইলেও পেশাদারিত্ব, সততা ও নৈতিক মূল্যবোধ লইয়া প্রশ্নচিহ্নের সংখ্যা একেবারেই কমিয়া যায় নাই। স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক পুলিশি ব্যবস্থা গড়িবার লক্ষ্যে পাঁচটি মূলনীতি ঘোষণার কথাও আমরা শুনিয়াছি। দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, জনগণের প্রতি অমানবিক ও অপেশাদার আচরণ বন্ধ করা, বিট পুলিশিং চালুর মাধ্যমে দোরগোড়ায় পুলিশি সেবা নিশ্চিত করা, শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা ও পুলিশের সার্বিক কল্যাণ—এই নীতিগুলি যথাযথভাবে প্রতিপালন করা সম্ভব হইলে তৃতীয় বিশ্বের যে কোনো দেশ স্বর্গীয় উদ্যানে পরিণত হইবে। প্রযুক্তি সহায়তারও তো এখন কোনো অভাব নাই। ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব, ডিএনএ পরীক্ষা, সাইবার ক্রাইম, ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম, ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক হেলপডেস্ক, বিট পুলিশিং, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ কার্যক্রম বেশ ভালোমতো চালু রহিয়াছে।
সকল কিছুই তো রহিয়াছে, তাহার পরও রহিয়াছে অনেক প্রশ্ন। তাহার কারণ হইল, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে এখনো আধা সামন্তবাদী মানসিকতা দূর হয় নাই। সেই কারণে সকল কিছু নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত করিবার বিষয়টি তৃতীয় বিশ্বের দেশে প্রায়শই বিবর্ণ হইয়া পড়ে। এই সকল বিষয় লইয়া যাহারা গবেষণা করেন, তাহারা মনে করেন, বহু যুগ ধরিয়া তৃতীয় বিশ্বের সমাজ গড়িয়া উঠিয়াছে একধরনের নৈরাজ্যের ভিতর দিয়া। সেই কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান এইখানে গড়িয়া উঠিলেও তাহার সুরক্ষাকবচ সুরক্ষিত থাকে না পুরোপুরি। এই জন্য তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে একটি জাতির নিয়মতান্ত্রিক সুষ্ঠু বিকাশধারার জন্য তৈরিকৃত প্রতিষ্ঠানের জন্য যতই বলা হউক উহা নিয়মের মধ্যে চলিবে—তাহা আসলে বাস্তবজনিত কারণে সম্ভব হয় না। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে যখন যাহারা ক্ষমতায় থাকেন, তখন তাহাদের নিম্নস্তরের বালুকণার উত্তাপও দহন তৈরি করে। দম্ভ, ধামকি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বদলির হুমকি দিয়া তাহাদের অনেকেই নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইতে চেষ্টা করেন। এমনকি ন্যূনতম কাহারো নিরাপত্তজনিত প্রয়োজনে নিয়মমতো একটি ‘সাধারণ ডায়ারি’ করিবার পথেও অনেক ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হয়।
এই যদি হয় অবস্থা, তাহা হইলে সকল ভালো ভালো কথা কেবল কথার কথা হইয়া থাকিয়া যায়। উন্নয়নশীল দেশসমূহের ভিতরে এই ধরনের আধাসামন্তবাদের গন্ধ কবে দূর হইবে, কেহ জানে না। অবস্থা এমন যে, ইহাদের নিকট নিয়মমতো সকল কিছু আশা করাটাই বড় দুরাশা। ইহা নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের নির্বাহী চাহেন না। কিন্তু ইহাদের সহ্য করা ছাড়া তৃতীয় বিশ্বের নির্বাহী দায়িত্ববানদের কিছু করিবারও থাকে না। এই অসহায়ত্ব, এই দীর্ঘশ্বাস দুঃখজনক। তবে কাউকে না কাউকে তো ইহার সমাধান করিতেই হইবে। সত্য ও সঠিক কাজটি করিতে হইবে।
