যুদ্ধ ও মানবতার সংকট

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২২, ১০:৪৪

গতকাল ইউনিসেফ দাবি করিয়াছে যে, রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে ইউক্রেনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিশুই বাস্তুচ্যুত হইয়াছে। ৭.৫ মিলিয়ন শিশুর মধ্যে ২.৮ মিলিয়ন শিশু বাস্তুচ্যুত হইয়াছে অভ্যন্তরীণভাবে। আর ২ মিলিয়ন শিশু শরণার্থী হিসেবে অন্য দেশে পালাইয়া যাইতে বাধ্য হইয়াছে। মাত্র ছয় সপ্তাহের যুদ্ধের পরিণতিতে এইসব শিশু নিজেদের ঘরবাড়ি, প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদেরও ত্যাগ করিয়া অন্যত্র চলিয়া গিয়াছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ যে ভয়াবহ মানবতার সংকট তৈরি করিয়াছে এই চিত্র তাহার প্রমাণবহ। যেসব শিশু এখনো ইউক্রেনে রহিয়া গিয়াছে তাহাদের বড় একটি অংশ খাদ্য ও পানীয় সংকটে ভুগিতেছে। এই পর্যন্ত দেড় শতাধিক শিশু নিহত হইয়াছে ইউক্রেন যুদ্ধে। আহত হইয়াছে আড়াই শতাধিক। ইহা ছাড়া জাতিসংঘে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত দাবি করিয়াছেন যে, রাশিয়া ১ লক্ষ ২১ হাজার শিশু ইউক্রেন হইতে লইয়া গিয়াছে। তাহাদের উপর যৌন নিপীড়নসহ নানাভাবে নির্যাতনের অভিযোগও উঠিয়াছে। অথচ যুদ্ধকালে শিশুদের উপর নির্যাতন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থি।

যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তার আদিকাল হইতেই চলিয়া আসিতেছে। সেই প্রস্তর যুগেও মানুষ মানুষের ওপর নৃশংসভাবে হামলা চালাইত। আর আজ যে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র তৈরি করা হইতেছে, তাহার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যও অভিন্ন। মানুষ মানুষকে এইভাবে পাখির মতো হত্যা করিতে পারে, তাহা আজ সভ্যতার চরম বিকাশের যুগে ভাবিতেও গা শিহরিত হইয়া উঠে। মানুষ যখন নিচে নামিতে থাকে, তখন অনেক সময় পশুর চাইতেও অধম হইয়া যায়। ইউক্রেন যুদ্ধেই আমরা তাহার প্রমাণ পাইতেছি। শিশুরা হইল নিষ্পাপ, অবুঝ ও নিরাপরাধী। তাহারা হইল মানববংশ ও অস্তিত্ব টিকাইয়া রাখিবার সেতুবন্ধ। তাহাদের দেখিয়া যাহাদের মনে ভালোবাসা জাগ্রত হয় না, তাহারা পিশাচ, নিষ্ঠুর ও হৃদয়হীন। বিশেষত ইউক্রেন যুদ্ধে বেসামরিক লোকদেরও যেভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো হইতেছে, তাহা ন্যক্কারজনক। হামলা চালানো হইতেছে বেসামরিক নাগরিকদের বাড়িঘরের উপর। হামলা চালানো হইতেছে হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। এসব হামলার নৃশংস দৃশ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টিভি-চ্যানেলে দেখিয়া আমরা হতভম্ব ও স্তব্ধ হইয়া যাইতেছি।

গতকাল সিএনএন জানাইয়াছে, ইউক্রেনের দনবাসে যুদ্ধাপরাধের ঘটনা ঘটিয়াছে। আর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি বলিয়াছেন, মারিওপোলে ঘটিয়াছে বড় গণহত্যার ঘটনা। ইতিমধ্যে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী রাজধানী কিয়েভের আশপাশের বেদখলকৃত শহরগুলি পুনরুদ্ধার করিতে সক্ষম হইয়াছে। এই শহরগুলি উদ্ধার হইতেই যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরের যে চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে তাহা অত্যন্ত লোমহর্ষক। বিশেষ করিয়া রাজধানীর নিকটবর্তী বুচা শহরের রাস্তায় রাস্তায় মরদেহ পড়িয়া থাকিতে দেখা যায়। সেখানে সন্ধান পাওয়া যায় গণকবরের। প্রায় এক মাস বিদেশি শক্তির দখলে থাকিবার পর এই শহরটি পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। বীভৎস লাশের পাশাপাশি রাস্তায় যত্রতত্র পড়িয়া থাকিতে দেখা যায় পোড়া ট্যাংক। এই শহরটিতেও ইউক্রেনের শিশুদের মানব ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা হইয়াছে।

ইউক্রেনের এই রকম নির্মম ও নৃশংস মৃত্যুর ঘটনা একবিংশ শতাব্দীতে আসিয়াও দেখিতে হইবে তাহা আমরা ভাবিতে পারি নাই। জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার (ওএইচসিএইচআর) হিসাব অনুযায়ী গত ২ এপ্রিল পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ১৪১৭ জন বেসামরিক লোকের প্রাণহানি হইয়াছে। ৪.১৭ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হইয়াছে। ইহা ইউক্রেনের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। তাহাদের ৯০ ভাগই নারী ও শিশু। এই জন্য বলা হইয়া থাকে, যে কোনো যুদ্ধে সবচাইতে বড় পরাজয় হয় মানবতার। শিশু ও নারীসহ লক্ষ লক্ষ বনি আদমের মৃত্যুর বিভীষিকা, অগণিত পঙ্গু মানুষের আর্তনাদ ছাড়া যুদ্ধে তেমন কিছুই অর্জিত হয় না। অতএব, বিশ্বে যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ হউক ও সর্বত্র মানবতার জয় হউক ইহাই আমরা প্রত্যাশা করি একান্তভাবে।

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন