‘রোদন-ভরা এ বসন্ত/ কখনো আসেনি বুঝি আগে।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কথা লিখিয়াছেন শতাধিক বর্ষ পূর্বে। আজি, এই ১৪২৯ বঙ্গাব্দের প্রথম দিনে, যেই অভাবিত দুর্যোগের মুখোমুখি হইয়াছি আমরা, তাহা ঐ কান্নাসিক্ত বসন্তের মতোই। এমনটি বুঝি পূর্বে কখনো আসে নাই! পৃথিবীতে যুগ যুগ ধরিয়া মহামারি, যুদ্ধবিগ্রহ ও অর্থনৈতিক মন্দা আসিয়াছে বটে; কিন্তু সেই সকল সমস্যার হাত ধরিয়া সমগ্র মানবজাতি একসঙ্গে কখনো মহাবিপদে পড়ে নাই। একদিকে ইউক্রেনের যুদ্ধ, অন্যদিকে গত দুই বৎসর ধরিয়া বিশ্বব্যাপী মহামারিজনিত মহা স্থবিরতায় বিশ্ব আজ বিধ্বস্ত।
আজ ১৪ এপ্রিল, বাঙালির প্রাণের বাংলা নববর্ষ। কতই না হৃদয় উদ্ভাসিত করা বাংলার অপূর্ব মাটিগন্ধমাখা এই প্রাণের পহেলা বৈশাখ! বাংলা নববর্ষ এমন একটি সময় শুরু হয়, যখন বসন্তের দহনকাল শেষে গ্রীষ্মের বিচিত্র রসাল ফলসম্ভারে ভরিয়া ওঠে প্রকৃতি। নূতন বৎসরের শুভারম্ভে ফলদ বৃক্ষরাজির মুকুলগুলি সবুজ কাঁচা হইতে ক্রমশ পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতে আরম্ভ করে। পহেলা বৈশাখ যেন সেই সবুজ আর কাঁচাদের সম্ভাষণ জ্ঞাপনের দিন! এই জন্য বাঙালির নিকট বৈশাখের অর্থই নূতনকে বরণ করিয়া লওয়া। আমরা গোপন বাসনায় গাঁথিয়া রাখি গূঢ় চাওয়া-পাওয়াগুলি। বিশ্বে অস্বস্তির পারদ ঊর্ধ্বমুখী। তাহারই মধ্যে আমরা আশা রাখি আমাদের ভবিতব্যের। বৈশাখ আসিলেই রবীন্দ্রনাথের সুরে আমরা আওড়াই—‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ সেই যে কবি বৈশাখের আবাহনে উচ্চারণ করিয়াছিলেন ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’—সেই আবাহনেই কবি বলিয়াছেন—‘ছাড়ো ডাক, হে রুদ্র বৈশাখ!/ ভাঙিয়া মধ্যাহ্নতন্দ্রা জাগি উঠি বাহিরিব দ্বারে, চেয়ে রব প্রাণীশূন্য দগ্ধতৃণ দিগন্তের পারে/ নিস্তব্ধ নির্বাক।/ হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ!’ কবি নজরুলের প্রলয়োল্লাসের ঝড় বহিছে বিশ্বব্যাপী। ইহার ভিতরেই কবি বলিয়াছেন—‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর!/ ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল-বোশেখির ঝড়।’
বাংলা নববর্ষের এই সময়টিতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নববর্ষ উৎসব উদ্যাপিত হইয়া থাকে। এই উৎসবে রহিয়াছে ইরানের ‘নওরোজ’-এর প্রভাব। মোগলরাই ইরানি ঐতিহ্যের সূত্রে ভারতে নববর্ষ চালু করে। ইরানের এই নওরোজ উত্সবের প্রভাব মধ্য এশিয়ার কোনো কোনো অঞ্চলে লক্ষ করা যায়। কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান প্রভৃতি অঞ্চলেও নববর্ষকে নওরোজ নামে অভিহিত করা হয়। তাহারা উৎসবটি উদ্যাপন করে ২২ মার্চ। মেঘনাথ সাহা ভারতের যে পঞ্জিকা সংস্কার করেন, তাহাতে ২২ মার্চকে নূতন বৎসরের ভিত্তি ধরিয়া ঐ তারিখের অনুষঙ্গী চৈত্র মাসকেই শকাব্দ পঞ্জিকার নববর্ষ হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ইন্দোনেশিয়ার বালি ও জাভা অঞ্চলের পঞ্জিকায় এই শকাব্দের অনুসরণে ২৬ মার্চ উদ্যাপন করা হয় নববর্ষ। প্রশ্ন উঠিতে পারে—পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষের এক দিনের হেরফের কেন হয়? বাংলাদেশে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে মেঘনাথ সাহার বৈজ্ঞানিক সংস্কার পদ্ধতি অনুসরণ করিয়াই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা সালের সংস্কার করেন। ইহা পরে আরো পরিপূর্ণ সংস্কারের লক্ষ্যে বাংলা একাডেমি একটি টাস্কফোর্স গঠন করিয়া ১৪ এপ্রিলকেই বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন বা পহেলা বৈশাখ হিসাবে গ্রহণ করে। ভারতবর্ষ ছাড়াও থাইল্যান্ডের নববর্ষ ‘সংক্রান’ উদ্যাপিত হয় এপ্রিলের ১৩ হইতে ১৫ তারিখের মধ্যে। সার্বিকভাবে মার্চ ও এপ্রিলের মধ্যে এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন দেশে নববর্ষ উদ্যাপিত হইতে দেখা যায়। আমরা যে বৃহৎ এক মহাসাগরের স্রোতের অংশ, বাংলার নববর্ষ তাহারও ইঙ্গিত দেয়। আবহমানকালের এত বৎসরের এই সাল এখন মিশিয়া গিয়াছে বাঙালির জাতিসত্তায়। এই কারণে বাংলা নববর্ষ আমাদের অন্তরকে বিকশিত করে, নিজের মাটিকে চিনায়, শেকড়কে চিনায়। ইহা এই বার্তা দেয় যে, আমরা আলাদা কেহ নহি। বর্তমানে প্রাত্যহিক জীবনে কাজে লাগুক বা না লাগুক, ইহা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। আর এই ঐতিহ্যের মধ্যে আমরা নিজেদের চিনিতে পারি। আর নিজেকে চিনার মতো নিজেদের চিনাটাও জরুরি। নববর্ষ সেই চিনার কাজটি করে। সময় এখন সৌহার্দের, ভ্রাতৃত্বের। সকলের শুভ হউক। শুভ নববর্ষ।
