‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’—এসব উক্তি এখন গানের পংক্তিমালায় শোনা যায়। মানুষ যে কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে কিছু ঘটনাই এর প্রমাণ করে। ২০১৯ সালের মার্চ মাসেই অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। এক গবেষণায় দেখা গেছে সড়ক দুর্ঘটনায় যত লোক নিহত হয়েছে তার প্রায় ১৩ শতাংশই শিক্ষার্থী। দুর্বিষহ বিষয় হচ্ছে গত ২৪ মার্চ সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ওয়াসিম আফনান (২১) ও তার বন্ধুর সঙ্গে বাসের ভাড়া নিয়ে বিতর্কের এক পর্যায়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় বাসের হেলপার ও কন্ডাকটর, এতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ওয়াসিমের। এর আগে গত ১৯ মার্চ রাজধানীর নদ্দা এলাকায় প্রগতি সরণি রোডে জেব্রা ক্রসিংয়ের সময় ‘সুপ্রভাত পরিবহনের’ একটি বাস প্রথমে এক শিক্ষার্থীকে ধাক্কা ও পরে আবরার আহমেদ নামে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনালসের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নিহত হয়। এরকম শত উদাহরণ তৈরি হয়েছে গত কয়েক মাসে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী গত চার বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২৯ হাজার ৩১৫ জন, গড়ে প্রতিদিন ২০ জন। এর মধ্যে ৫৪ শতাংশের বয়স ১৬-৪০ বছর ও ১৮ শতাংশ রয়েছে ১৫ বছরের নিচে। এভাবেই হাজারো স্বপ্ন প্রতিদিন থেমে যায় সড়ক দুর্ঘটনায়। শত মা-বাবা বাকরুদ্ধ হয়ে থমকে দাঁড়ান চলার পথে। এভাবে কর্মক্ষম যুবক, তরুণ ও শিক্ষার্থী মারা যাওয়ার ফলে অর্থনৈতিকভাবেও লোকসানে পড়ছে বাংলাদেশ। এত আন্দোলন, ট্রাফিক সপ্তাহ, কর্মসূচি, আইন আরো কত কিছু, কোনো কিছুই যেন ঠেকাতে পারছে না সড়কে এ মৃত্যুর মিছিল। প্রতিদিনই কারো না কারো রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে রাজপথ।
অদক্ষ, প্রশিক্ষণহীন ও লাইসেন্সবিহীন চালক, মাদক সেবনকারী এরকমই শত কারণ চিহ্নিত করা যাবে সড়ক দুর্ঘটনার। বুয়েটের রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে দেশের ৮৯% চালক মাদক সেবন করেন।একজন মাদকসেবী কখনই সুস্থ মস্তিষ্কের হতে পারে না, করতে পারে না স্বাভাবিক কার্যক্রম। আর বাংলাদেশে ৫৪ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনাই ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর ফলে। এখন আর সমস্যা নয় কাজ করতে হবে সমাধান নিয়ে, আইন নয়- আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে, উদঘাটন করতে হবে সমস্যার মূল কোথায়। এ বিষয়ে আমার কিছু পরামর্শ তুলে ধরছি—
১। ট্রিপভিত্তিক বেতন নয়, করতে হবে মাসিক বা সাপ্তাহিক। চালকদের স্থায়ী নিয়োগের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ২। কাজের সময় থাকবে দৈনিক ৮ ঘণ্টা নির্দিষ্ট, দূরপাল্লার চলাচলে দুইজন চালক থাকতে পারে। ৩। মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে চালকদের অবহিত করে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। ৪। উগ্র মনোভাব থেকে দূরে থাকা ও মানসিক প্রশান্তির জন্য রাখা যেতে পারে সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা। ৫। নিরাপদ সড়ক বিষয়ে আলাদা ইনস্টিটিউট খুলে অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা বিভাগ করে এর সমাধান উদঘাটনকল্পে হতে পারে গবেষণা। এতে শিক্ষিত তরুণদের কর্মক্ষেত্রও সৃষ্টি হবে। ৬। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করে, মানুষকে আাাইনের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা রাখতে শিখাতে হবে। আইন ভঙ্গকারীদের তাত্ক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থায় আনা যেতে পারে। ৭। রুটভিত্তিক পরিবহন ও বাস নির্দিষ্ট করে দেয়া। ৮। বাস মালিকদের নিয়ে আলাদা একটা ইউনিট গঠন করা, যাতে তারা সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করে একে অপরের প্রতি। ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা ত্যাগ করে নির্দিষ্ট আয়ের ব্যবস্থা হতে পারে, এতে সরকারের আয়ও বৃদ্ধি পাবে। ৯। সিটিং নামে চিটিং সার্ভিস বন্ধ করে সকল বাস ও বাসের ভাড়া একই ব্যবস্থায় নিয়ে আসা যেতে পারে। ১০। যাত্রী উঠানো-নামানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ ব্যবস্থায় নিয়ে আসা। ১১। প্রতিমাসে অন্তত একবার ইউনিটভিত্তিক চালকদের নিয়ে নিরাপদ সড়ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারা মোটিভেশনাল সভা, সেমিনার বা কর্মশালা আয়োজন করা।
পুরো বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারের আলাদা বিভাগ করে আলাদা আলাদা ইউনিট গঠন করতে হবে যাতে সকল বাস মালিক, চালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একই প্লাটফর্মে নিয়ে আসতে হবে। যেহেতু গণপরিবহনে শৃঙ্খলা গণমানুষের মতের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাই আস্থা ফেরাতে হবে সেখানেও। এখন প্রত্যাশা নতুন করে আর যেন কোনো স্বপ্ন অকালে ঝরে না যায়। এই ঈদে আর কোনো ভয়াবহ দুর্ঘটনা না ঘটে মানুষ স্বস্তি নিয়ে আপনজনের সঙ্গে ঈদ করবে এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের সকলের।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
