শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ঢাকায় ঈদ উৎসব

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২২, ১০:০৬

করোনাকালের পরে ছেলে থেকে বুড়ো সবার মধ্যেই এবার ঈদকে ঘিরে নানা আয়োজনের পরিকল্পনা চলছে। গত দুটি বছর তো ঘরে বসেই কেটেছে সবার ঈদ। তাই, এবার পোশাক কেনার জন্য শপিং মলগুলোতে মানুষের ভিড় লেগেছে রোজা শুরু আগে থেকেই। তরুণদের তো উত্সাহের শেষ নেই। শপিং মলগুলোতে ঘুরে ঘুরে ঈদের পোশাক কেনা আর দল বেঁধে ইফতার করে যেন উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে দিচ্ছে নগরজীবনে।

ঘটা করে ঈদ উদযাপনে ঢাকাবাসীর আগ্রহটা বরাবরই খুব বেশি। সেই মোগল, পরে নবাবি আমল থেকে ঈদ ঘিরে যে আয়োজন শুরু হয়েছিল, পুরান ঢাকার বাসিন্দারা তা আজও টিকিয়ে রেখেছে। ঈদ মিছিল, চাঁদ রাতে আতশবাজি ও ফুলঝুরির আলোতে আলোকিত হয়ে ওঠে ঢাকার আকাশ।

ঈদুল ফিতরে ঈদের আনন্দ শুরু হয়ে যায় আগের দিন সন্ধ্যা থেকেই। ঈদের চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে যার শুরু। এ সময় রান্নাঘরেও নানা পদ রান্নার তোড়জোড় শুরু হয়। একই সঙ্গে মার্কেটে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা চলে। শুরু হয়েছে একসঙ্গে দল বেঁধে রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়ার চল। এদিকে, ঈদের দিনে নামাজ শেষে কোলাকুলি করা, বাসায় ফিরে গুরুজনদের পা ছঁুয়ে সালাম করা—এটা মুসলিম পরিবারগুলোতে রেওয়াজে  পরিণত হয়েছে। এরপর পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে বসে খাওয়ার চল রয়েছে বেশির ভাগ পরিবারে। অনেকেই মৃত মা-বাবার কবর জিয়ারত করতে ছুটে যান কবরস্থানে। শহরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রায় এখন ঈদকে কেন্দ্র করে গ্রামে বা জন্মস্থানে যাওয়ার নতুন ধারা সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে। ফলে এই ঈদকে কেন্দ্র করে মফস্বল শহরগুলোতে, গ্রামে এক মিলনমেলা বসে যায়। আত্মীয়স্বজন, স্কুলের বন্ধুদের একসঙ্গে সময় কাটানোর উপলক্ষ হিসেবে দেখা দেয় ঈদ। এসব কিছুই এখন ঈদ উদযাপনের নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে।

ঢাকায় ঈদের দিনে সিনেমা হলগুলোতে ভিড় জমে যায়। এছাড়া, বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্কে সিনেমা দেখার জন্য মানুষের ভিড় জমে। চিড়িয়াখানা, শিশু পার্কসহ নগরীর বিনোদনকেন্দ্রগুলো জমজমাট থাকে ঈদের দিনগুলোতে।

এখনকার ঈদ আনন্দের, নাকি সেকালেই আনন্দের উপলক্ষ ছিল বেশি। এই কাল বলতে কোন কাল যে বোঝায়! নানা বয়সের মানুষের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, সবার কাছেই তার কিশোর বয়সের ঈদের আনন্দের স্মৃতি মনের জায়গা জুড়ে রয়েছে। পুরান ঢাকার উর্দু রোডের বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব আলাউদ্দিন মালিক বললেন, ‘ঈদের আনন্দ আছিল আমাগো সময়। চকের মেলা ঈদের মিছিলের এহন আর সেই মজা নাই। চকের মেলায় মিষ্টির স্বাদ এহনো ভুলবার পারি না,মুখে লাইগা আছে।’ আর ধানমন্ডির বাসিন্দা কিশোর ফাইয়াজ হাসান জানাল, ঈদের দিনে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে। বন্ধু, কাজিনদের সঙ্গে। লংড্রাইভে যেতেও ভালো লাগে তার। পুরান ঢাকার ঈদের মিছিলের কথা সে শোনেনি। তবে গরমের মধ্যে এই মিছিলে যেতে সে পছন্দও করে না।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পছন্দের ধরন বদলে যায়। তবে কিছু কিছু আয়োজন সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে পরিণত হয় ঐতিহ্যে। বাঙালিদের ঈদ উদ্যাপনেও রয়েছে ঢাকার নবাবদের ঈদ উদযাপনের প্রভাব। উর্দুভাষী নবাবরা বাইজি নাচ, মহরমের মিছিল, ঈদোত্সব, কাওয়ালি বা জয়বারী গান-বাজনার প্রতি যেমন আগ্রহী ছিলেন তেমনি হিন্দুদের দুর্গাপূজা, জন্মাষ্টমী, ঝুলনযাত্রা ইত্যাদিতেও যোগ দিতেন। ঈদ উত্সবে নবাবরা নানা আমোদ-ফুর্তির ব্যবস্থা করতেন। যেমন কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারের নাটক ঢাকার নবাব বাড়িতে প্রদর্শন, জাদু ও সার্কাস দেখানো, বায়োস্কোপ দেখা বা কোনো খেলাধুলার আয়োজন। ঈদ উত্সবে পাটুয়াটুলীর ক্রাউন থিয়েটার, জগন্নাথ কলেজ, ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইত্যাদির মঞ্চে বায়োস্কোপ দেখার প্রতি মানুষের আগ্রহ যেমন ছিল তেমনি পিকচার হাউজ, এম্পায়ার, থিয়েটার ইত্যাদিতে সিনেমা উপভোগের কথা জানা যায় নবাব পরিবারের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে। নবাবেরা ঈদের এমন সব বিনোদনে অংশগ্রহণের জন্য পরিবারের ছেলেমেয়েদেরও সুযোগ করে দিতেন। সব মানুষের মিলিত অংশগ্রহণে ঢাকা পরিণত হতো সর্বজনীন উৎসবের নগরে।

ঈদ উদযাপনের আরেকটি বড় অনুষঙ্গ মজাদার খাবারের আয়োজন। ঘরে ঘরে সেমাই রান্না করা তো ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ। অন্য খাবারের মধ্যে থাকে কোরমা-পোলাও, পায়েস, জর্দা, পিঠা প্রভৃতি। ঢাকায় ঊনিশ শতকে ঈদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ঈদ মিছিল। সম্ভবত ঢাকার নায়েব-নাজিমগণ ঢাকার বিখ্যাত জন্মাষ্টমী মিছিলের অনুপ্রেরণায় এ মিছিল চালু করেছিলেন। কিছু সময় বন্ধ থাকার পর আবার এ মিছিল চালু হয়েছে। বিশ শতকের তিরিশ-চল্লিশ দশকে ঢাকায় ঈদের দিন রমনা, আরমানিটোলা বা অন্যান্য মাঠে ‘খটক’ নাচ অনুষ্ঠিত হতো। এছাড়া, ছিল নৌকা বাইচ, ঘুড়ি ওড়ানো, ঘোড়দৌড়, হিজরা নাচ ইত্যাদি। ঘোড়দৌড় ও হিজরা নাচ ছিল ঢাকার বাবু কালচারের অঙ্গ, যা যুক্ত হয়েছিল ঈদ উৎসবের সঙ্গে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার পর বাংলাদেশে দুটি ঈদই জাতীয় ধর্মোত্সবে রূপান্তরিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আসছে।

উনিশ শতকের শেষদিক থেকে শুরু করে বিশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত নবাববাড়ি থেকে দেওয়া তোপধ্বনিতে চাঁদ ওঠার খবর পেত ঢাকাবাসী। শুরু হতো ‘চানরাত’। ঢাকাবাসীর রেওয়াজ ছিল দল বেঁধে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়া। ঢাকার সবচেয়ে প্রাচীন ঈদগাহ ছিল ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডে, যেটি নির্মিত হয়েছিল ১৬৪০ সালে। পুরোনো ভগ্নাবশেষকে পুর্ননির্মাণ করে বর্তমানে এখানে নিয়মিত ঈদের জামাতের আয়োজন করা হয়।

ঈদমেলা ও ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা: চকবাজার, রমনা ময়দান, আরমানিটোলা, ধূপখোলা মাঠ, পল্টন ময়দানসহ ঢাকার আরো কয়েকটি জায়গায় ঈদের দিন মেলা বসত। সবচেয়ে বড় মেলাটি বসত চকবাজারে। ঈদের দিন বিকেলে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা হতো গনি মিয়ার হাট, রমনা মাঠ, পল্টন ময়দান, শহীদনগরের চর, কামরাঙ্গীর চর কিংবা নবাববাড়ির মাঠ ও পাকা ঘরের ছাদে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

চোর চক্রের কাছে মিললো ১ হাজার ৪০০ মোবাইল

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ঘিরে রাজধানীতে সাজসাজ রব

বাসযোগ্যতার সূচকে ১৭২ শহরের মধ্যে ঢাকা ১৬৬তম

ঢাকার বাণিজ্যিক ভবন মার্কেট পরিদর্শন করবে সরকার

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

একজন শেখ হাসিনা আছেন বলেই পদ্মা সেতু হয়েছে: তথ্যমন্ত্রী

বিশেষ সংবাদ

‘বড় লোক হওয়ার এতই উচ্চাকাঙ্ক্ষা!’

ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ২৭

১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজধানীর ৩ রুটে নামছে ২০০ বাস