সরকারি জমি দখল করে মার্কেট নির্মাণ

ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২২, ০৩:৪৯

রাজধানীর ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পের সীমানা দেওয়াল ভেঙে ১৫টি বড় গাছ কেটে প্রায় পাঁচ বিঘা জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগের স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। পরে সেখানে প্রায় ১০০টি টিনশেড দোকান নির্মাণ করে মার্কেট করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে দোকানগুলো ভাড়াও দিয়েছেন দখলদাররা। সরকারি জমি দখলে বাধা দিলে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পের হিসাবরক্ষক তপিন হাসানকে ভয়ভীতি দেখায়। গত ৪ মার্চের এ ঘটনার এক মাস পর দখলদারদের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়।

প্রায় দেড় যুগ আগে ভাসানটেকে সরকারের ১৫০ বিঘা জমির ওপর বস্তিবাসীর জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ফ্ল্যাট প্রদান করেছে কর্তৃপক্ষ। এই প্রকল্পের ভিতরে ভাসানটেক থানা অবস্থিত।

প্রকল্পের হিসাবরক্ষক তপিন হাসান জানান, গত ৪ মার্চ স্থানীয় সন্ত্রাসী নাজিমুদ্দিন, আলমগীর, মিঠু, আজহার, মোস্তফা, মানিক, জহির ভান্ডারী ও কানা আবুলসহ ৪০ থেকে ৫০ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী প্রকল্পের দক্ষিণ-পূর্ব পাশের সীমানা প্রাচীর ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় কর্তব্যরত আনসার সদস্যরা বাধা দিলে সন্ত্রাসীরা বলে যে ‘তারা স্থানীয়। বাধা দিলে ক্ষতি হবে।’ সন্ত্রাসীরা সেখানে ১৫টি বড় কড়ই গাছ কেটে ফেলে। কড়ই গাছগুলোর বয়স ২০ বছরের মতো। এরপর সেখানে বাঁশের খুঁটি দিয়ে তারা টিনশেড দোকান নির্মাণ করে।

এ ঘটনার পর প্রকল্পের হিসাবরক্ষক বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেন। মন্ত্রণালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে তপিন হাসান বাদী হয়ে গত ১৫ মার্চ ভাসানটেক থানায় জিডি করেন। এর আগেই ঐ স্থানে দখলদাররা প্রায় ১০০ টিনশেড ঘর নির্মাণ করে দোকান ভাড়া দিয়ে দেয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি দোকানের ভাড়াটে ইত্তেফাককে বলেন, ‘স্থানীয় আওয়ামী লীগের একজন নেতাকে ২ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে এই দোকান ভাড়া নিয়েছি। মাসে ২০ হাজার টাকা ভাড়া।’

গুগুল ম্যাপে ভাসানটেক।

প্রকল্পের ফ্ল্যাট বাসিন্দা হাজেরা বেগম বলেন, ‘সরকারের একটা গাছের ডাল কাটলেই মামলা হয়ে যায়। সেখানে এতগুলো বড় বড় গাছ চোখের সামনে কেটে ফেলল, কেউ তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক মামলা করার সাহস পেল না। তারা দিনে দুপুরে ঘর তুলে দোকান ভাড়া দিয়েছে। কারো প্রতিবাদ করার মতো সাহস নেই?’

আরেকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের আলমগীর, ছাত্রলীগের রাজু, স্বেচ্ছাসেবক লীগের ফরহাদ, যুবলীগের মনির, মোস্তফা এবং কৃষকলীগের লিটন ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পে সরকারি জমির গাছ কেটে দোকান নির্মাণ করেছেন।’

ভাসানটেক থানায় জিডি করার বেশ কিছুদিন পর পুনর্বাসন প্রকল্পের হিসাবরক্ষক তপিন হাসান গত ৬ এপ্রিল ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বাদী হয়ে ৯ জন দখলদারের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা দায়ের করেন। এরা হলেন- ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি রকিবুল ইসলাম রাজু, ভাসানটেক থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীর হোসেন, ৯৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি মনির হোসেন, যুবলীগ নেত্রী হ্যাপি আক্তার কচি, ৯৫ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিকলীগ সভাপতি মানিক, স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমান, কৃষক লীগ নেতা সাইফুল ইসলাম, মিজানুর রহমান ও সাইফুল ইসলাম।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘সরকারি জমি দখল করে দোকান নির্মাণের বিষয়টি তার জানা নেই।’ ছাত্রলীগ নেতা রকিবুল ইসলাম রাজু বলেন, ‘কে বা কারা এসব দখল করেছে, তা তিনি জানেন না। এই দখলের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’

এ ব্যাপারে ভাসানটেক থানার ওসি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এটা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ বিষয়। পুলিশ কারো ঘর ভেঙে দিতে পারে না, এমনকি ঘর নির্মাণ করেও দিতে পারে না। পুনর্বাসন প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে উচ্ছেদের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পুলিশ সেখানে আইনি সহায়তা দিবে।’

এদিকে এ স্থানে উচ্ছেদ চালানোর জন্য ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব এম এম আরিফ পাশা পুলিশকে চিঠি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘কতিপয় অবৈধ দখলকারীরা ভূমি দখলের জন্য প্রকল্পের ভিতর ১৫টি গাছ কেটে ক্ষতিসাধন করেছেন। প্রকল্পের সীমানা প্রাচীর ভাঙচুর ও প্রকল্পে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মারধর করে হত্যার হুমকি দিয়েছে।’

ইত্তেফাক/এএএম