কক্সবাজারে প্রায় প্রতিদিনই খুন হচ্ছে মানুষ। পুলিশের তথ্য মতে, গত দুই সপ্তাহে কক্সবাজারে ১৩টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আর ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে আটটিরও বেশি। এর মধ্যে গত পাঁচ দিনে সাত জন হত্যার শিকার হয়েছে। এসব ঘটনায় বেশির ভাগ অভিযুক্তরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারেরও কোনো খবর মেলেনি। অভিযোগ রয়েছে, অপরাধী কিংবা তাদের গডফাদারদের সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের সখ্যের কারণে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। এতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে সার্বিক জননিরাপত্তা ব্যবস্থা। একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাথাব্যথা নেই দাবি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় তুলছেন নেটিজেনরা।
সমানতালে রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও চলছে খুনাখুনি। স্ত্রী স্বামীকে কিংবা স্বামী স্ত্রীকে হত্যার ঘটনা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত বছরের পর বছর বাস্তবায়ন না হওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে বলে সচেতন মহল মনে করছে।
চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপস্থিতরা বলেছেন, সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনেকটা অকার্যকর হতে চলেছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে সিদ্ধান্তসমূহ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি ওঠে সভায়।
সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড: গত সোমবার সকালে সদরের চৌফলদণ্ডী ব্রিজের নিচ থেকে মো. সায়েম (২২) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মৃত্যুর কারণ এখনো অজানা। একই সময়ে কক্সবাজারের ঈদগাঁওতে সেহেরি খেয়ে নামাজের জন্য বের হয়ে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে খুন হন তারেকুল ইসলাম (১৭) নামে এক দোকানি। তিনি ইসলামাবাদ ইউনিয়নের ওয়াহেদুর পাড়া এলাকার মৃত ছগির আহমদের ছেলে। তার হত্যাকারীকেও শনাক্ত করা যায়নি। গত ১২ এপ্রিল কক্সবাজার শহরের বাস টার্মিনালের আমগাছ তলা এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে
আবুল কালাম (৪৫) নামে এক ব্যবসায়ী নিহত হন। ৪ এপ্রিল পিএমখালীতে ফুটবল খেলার প্রাইজমানির টাকার ভাগভাটোয়ারার জের ধরে মো. জাহাঙ্গীর (২২) নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে খুন করা হয়। তিনি পিএমখালী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম জুমছড়ি এলাকার ছৈয়দুল হকের ছেলে। ৭ এপ্রিল সদরের পিএমখালীতে পানি সেচ প্রকল্পের বিবাদকে কেন্দ্র করে মোরশেদ আলী ওরফে মোরশেদ বলীকে (৩৮) কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
ইফতারি সামগ্রী কিনতে চেরাংঘর বাজারে গেলে দুর্বৃত্তরা তার ওপর হামলা চালায়। মোরশেদ হত্যার ঘটনায় তিন জনকে আটক করা হলেও মূলহোতাদের এখনো ধরতে পারেনি পুলিশ। গত ৮ এপ্রিল চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের মইক্কাঘোনা পাহাড়ি এলাকায় মোবাইলে জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদ ইউনুছ (৪০) নামে এক ব্যক্তি খুন হন। গত ২৮ মার্চ কক্সবাজার শহরের সিটি কলেজ এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে খুন হন কলেজছাত্র রিদুয়ান ছিদ্দিকী। এ ঘটনায় র্যাব ও পুলিশ পৃথক অভিযান চালিয়ে তিন জনকে আটক করে।
গত ১৫ দিনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও নারী-পুরুষসহ পাঁচ জন খুন হয়েছেন। সচেতন মহলের মতে, প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হলে বাকি অপরাধীরা অপরাধ করতে ভয় পাবে।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান বলেন, জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্হিতি চরম অবনতির দিকে যাচ্ছে। একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে কক্সবাজারে। এটি সত্যিই দুঃখজনক। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকাও বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্হিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
কক্সবাজার সদর থানার ওসি (তদন্ত) মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, ইতিমধ্যে রিদুয়ান ও মোরশেদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত বেশ কয়েক জনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। বাকি খুনের ঘটনায় জড়িতদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে ১৯ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, গত ১২ দিনে ১৩টি খুনের ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারে। এগুলোর অধিকাংশ পারিবারিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সে হিসেবে এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তবে, ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যেগুলো খুবই উদ্বেগজনক। ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসীসহ অপরাধীদের ধরার জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যেখানেই অপরাধ সংঘটিত হয়, সেখানে দ্রুত অভিযান চালানো হচ্ছে।

কক্সবাজারে ১৯ মামলার আসামি মুন্নাসহ ২৬ জন আটক
কক্সবাজারে নারীকে ধর্ষণ: যে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলো র্যাব