পুতিন ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে দেওয়ার অভিপ্রায় দেখাচ্ছেন—একটি বিস্তৃত, রাশিয়ার আধিপত্যযুক্ত নিরাপত্তা অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা, যেটি সোভিয়েত যুগে মস্কোর শক্তির মতো শক্তিশালী হবে। নিজ রাজনৈতিক কর্মজীবনের গোধূলির দিকে ধাবমান ৬৯ বছর বয়সি পুতিন স্পষ্টতই ইউক্রেনকে, ৪ কোটি ৪০ লাখ জনসংখ্যার জাতিকে রাশিয়ার প্রভাববলয়ে ফিরিয়ে আনতে চান ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। ইউক্রেন-রাশিয়া সংকট বিগত যুগের একটি বিপজ্জনক পর্ব স্নায়ুযুদ্ধের একটি দৃশ্যের মতো মনে হচ্ছিল, একজন আনপ্রেডিক্টেবল রাশিয়ান নেতা প্রতিবেশী দেশের সীমান্েত সৈন্য ও ট্যাংক জড়ো করছিলেন। পূর্ব-পশ্চিমের মাঝে রক্তাক্ত দাবানল সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
এরপর এই স্নায়ুযুদ্ধ চরম সীমায় পৌঁছে যায়—ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার সৈন্যবাহিনীকে ইউক্রেন আক্রমণ করার নির্দেশ দেন। এর প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক এবং সুদূরপ্রসারী।
২৪ ফেব্র‚য়ারি রাশিয়া পুরোদমে আক্রমণ শুরু করার পর এটি ১৯৮৫ সালের পর থেকে ইউরোপে বৃহত্তম সৈন্য সমাবেশ হয়ে দাঁড়ায়। এখন পর্যন্ত মস্কো তার প্রত্যাশিত বিজয় অর্জন করতে সমর্থ হয়নি এবং রাজধানী কিয়েভসহ সারা দেশের প্রধান শহরগুলো দখল করতে একপ্রকার ব্যর্থই হয়েছে।
রাশিয়ার দুর্বল প্রস্তুতিসম্পন্ন সামরিক বাহিনী ইউক্রেনীয় সৈন্য ও বেসামরিক যোদ্ধাদের কঠোর প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে। তা সত্ত্বেও রাশিয়ার শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা রয়েছে এবং পুতিন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তার চূড়ান্ত লক্ষ্য কিয়েভ দখল করা, ইউক্রেনের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের পতন এবং দেশটিকে রাশিয়ার বলয়ে অন্তর্ভুক্ত করা।
ইউক্রেন আক্রমণ সোভিয়েত-পরবর্তী অস্হিতিশীল অঞ্চলকে আরো অস্হিতিশীল করে তোলার পূর্বাভাস দিচ্ছে। এর ফলে ১৯৯০-এর পর থেকে ইউরোপে যে নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে উঠেছিল, সেটি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে ইউক্রেন ও অন্যান্য প্রজাতন্ত্রের ক্ষতির জন্য পুতিন দীর্ঘকাল ধরে শোক প্রকাশ করেছেন। এখন ন্যাটো সামরিক জোট, যা সোভিয়েতদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভূমিকা রেখেছিল, তাদের ক্ষমতা হ্রাস করা পুতিনের মিশনের অংশ বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
ইউক্রেন আক্রমণ করার আগে রাশিয়া সোভিয়েতকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য সুদূরপ্রসারী দাবির একটি তালিকা তৈরি করে, যেটি ন্যাটো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করেছিল।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্হাগুলো বলেছে, পুতিন তার সামরিক বাহিনীর অগ্রযাত্রার ধীরগতিতে হতাশ হয়ে পড়েছেন এবং রাশিয়ার কমান্ডারেরা বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নির্বিচার আক্রমণ ক্রমেই তীব্র করে চলেছেন। তার এই কৌশল পূর্বে চেচনিয়া, সিরিয়া যুদ্ধেও ব্যবহূত হয়েছিল।
ইউক্রেন যুদ্ধে মানবিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে এবং হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। এই যুদ্ধের ফলে ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ ইউক্রেন থেকে অন্য দেশে আশ্রয় নিয়েছে, যাকে জাতিসংঘ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দ্রুত ক্রমবর্ধমান শরণার্থীর সংকট বলে অভিহিত করেছে।
অবরুদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর শহর মারিউপোল এই যুদ্ধের মানবিক সংকটের একটি শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছে। সেখানে ১৬ মার্চ রাশিয়ার বোমা হামলায় একটি থিয়েটার ধ্বংস হয়ে যায়, সেই থিয়েটারে শিশুসহ শত শত মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। শহরে কোনো বিদু্যত্ ও পানি নেই এবং সেখানকার মানুষ পাহাড়সম জমে থাকা মৃতদেহের সত্কার করার জন্য পরিখা খনন করেছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে কয়েক দফা কূটনৈতিক আলোচনা যুদ্ধ থামাতে ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন পুতিন সরকারের ওপর কঠিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য একত্রিত হয়েছে। শত শত পশ্চিমা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—উত্পাদনকারী, তেল কোম্পানি, খুচরা বিক্রেতা এবং ম্যাকডোনাল্ডসের মতো ফাস্টফুড চেইন তাদের কার্যক্রম রাশিয়ায় স্হগিত করেছে, দেশটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ন্যাটো পূর্ব দিকে অগ্রসর হয় এবং কমিউনিস্ট বলয়ের মধ্যে থাকা বেশির ভাগ ইউরোপীয় দেশকে তাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করে। একসময়কার সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ লিথুনিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়ার মতো বাল্টিক দেশগুলো এবং পোল্যান্ড, রোমানিয়াসহ অন্যান্য দেশ ন্যাটোতে যোগ দেয়।
এর ফলে ন্যাটো সরাসরি মস্কোর মাত্র কয়েক শ মাইল কাছাকাছি চলে আসে এবং রাশিয়ার সীমান্েত নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে। ২০০৮ সালে তারা বলেছিল, ইউক্রেনকে ন্যাটোভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও এটি এখনো দূরবর্তী সম্ভাবনা হিসেবেই রয়ে গেছে। পুতিন সোভিয়েত বিভক্তিকে বিশ শতকের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়গুলোর মধ্যে একটি হিসাবে বর্ণনা করেছেন; যেটি বিশ্বের ক্ষমতাধর শক্তিগুলোর মধ্যে রাশিয়ার অবস্হানকে কেড়ে নিয়েছে। তিনি তার ২২ বছর ক্ষমতাকালে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী পুনর্গঠন এবং এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
রুশ প্রেসিডেন্ট ন্যাটো সম্প্রসারণকে হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং এতে ইউক্রেনের যোগদানের সম্ভাবনাকে তার দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি হিসেবে দেখছেন। রাশিয়া যেহেতু সামরিকভাবে আরো দৃঢ় ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, ন্যাটো সম্পর্কে তার অভিযোগ আরো কঠোর হয়েছে, তিনি বারবার ইউক্রেনে আমেরিকান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও সৈন্য সমাবেশের ব্যাপারে অভিযোগ করে আসছিলেন। যদিও মার্কিন, ইউক্রেনীয় ও ন্যাটোর কর্মকর্তারা জোর দিয়েই বলেছিলেন যে সেখানে এমন কিছু ঘটছে না। পুতিন আরো দাবি করেছেন, ইউক্রেন মৌলিকভাবে রাশিয়ার অংশ, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিকভাবেও।
২০১৪ সালের গোড়ার দিকে পূর্ব-পশ্চিম সম্পর্ক মারাত্মকভাবে খারাপ হয়ে যায়, যখন ইউক্রেনে সৃষ্ট গণবিক্ষোভে পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র রাষ্ট্রপতি ক্ষমতাচু্যত হন। রাশিয়া দ্রুত আক্রমণ করে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অংশ দখল করে। মস্কো একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহকেও উসকে দিয়েছিল, যেটি ইউক্রেনের ডোনবাস অঞ্চলের কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল, সেই যুদ্ধ এখনো চলছে, যেখানে ১৩ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।
পুতিন ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে দেওয়ার অভিপ্রায় দেখাচ্ছেন—একটি বিস্তৃত, রাশিয়ার আধিপত্যযুক্ত নিরাপত্তা অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা, যেটি সোভিয়েত যুগে মস্কোর শক্তির মতো শক্তিশালী হবে। নিজ রাজনৈতিক কর্মজীবনের গোধূলির দিকে ধাবমান ৬৯ বছর বয়সি পুতিন স্পষ্টতই ইউক্রেনকে, ৪ কোটি ৪০ লাখ জনসংখ্যার জাতিকে রাশিয়ার প্রভাববলয়ে ফিরিয়ে আনতে চান।
গত ডিসেম্বরে রাশিয়া ন্যাটো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তার লিখিত দাবিসমূহ পেশ করেছিল, যেখানে পুতিন তার দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—ইউক্রেন কখনোই ন্যাটোতে যোগদান করবে না সেটির নিশ্চয়তা, যে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে ন্যাটোতে যোগ দিয়েছে, সেখানেই তার সম্প্রসারণ থামিয়ে দেওয়া, পাশাপাশি রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউক্রেনে ২০১৫ সালের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা—যদিও এর মানে যেটি দাঁড়ায় সেটি নিয়ে মস্কো ও কিয়েভ তীব্র দ্বিমত পোষণ করে।
পশ্চিমারা মূল দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করে। মস্কোর আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদকে উদ্দীপ্ত করেছে; নাগরিক মিলিশিয়ারা রাশিয়ার দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে গেরিলা অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নেয়।
পুতিন অতীতের মতো নিজ দেশে বহিঃশত্রুর আক্রমণের বিষয়ে রাশিয়ার জাতীয়তাবাদীদের উত্সাহিত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তার পরও আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে হাজার হাজার রাশিয়ান, কেউ কেউ ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়েও যুদ্ধের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে।
ডিসেম্বরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, তার প্রশাসন ইউক্রেনের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য সৈন্য পাঠানোর কথা বিবেচনা করছে না। কারণ ইউক্রেন ন্যাটো জোটের সদস্য নয় এবং যৌথ প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতির অধীনে আসে না। এর পরিবর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনে অ্যান্টি-ট্যাংক এবং বিমান বিধ্বংসী অস্ত্র পাঠিয়েছে, রাশিয়ার সীমান্তবর্তী ন্যাটো দেশগুলোতে আমেরিকার সামরিক উপস্হিতি বাড়িয়েছে এবং ইউরোপে অতিরিক্ত ৭ হাজার সৈন্য পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু মূল ব্যাপারটি হলো অর্থনৈতিক অবরোধ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো কর্তৃক আর্থিক জরিমানা এবং বিধিনিষেধসমূহ রাশিয়ার ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, পাশাপাশি রাশিয়া সরকারের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার করার ক্ষমতা সীমিত করেছে এবং লাখ লাখ রাশিয়ানের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা, তাদের ব্যাংকের আমানত বা বিদেশভ্রমণে বাধা তৈরি করেছে।
লেখকত্রয় :সাংবাদিক এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে ভাষান্তর: এইচ এম নাজমুল আলম
