চুক্তি করে নারী এমপিদের মনোনয়ন

জাপায় তোলপাড় অনেকেই বিব্রত

আপডেট : ০২ জুন ২০১৯, ২২:৩৯

বর্তমান একাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে লিখিত চুক্তি করে জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনয়ন দেওয়ার ঘটনা নিয়ে গতকাল রবিবার দৈনিক ইত্তেফাক- এ প্রকাশিত খবরে খোদ দলটিরই অনেক নেতা বিব্রত, ক্ষুব্ধ। দলটির চারজন প্রেসিডিয়াম সদস্য ইত্তেফাকের সঙ্গে পৃথক আলাপকালে বলেছেন, ‘এই ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন। মনোনয়ন বাণিজ্য কম-বেশি অনেক রাজনৈতিক দলেই হয়ে থাকে, কিন্তু এভাবে লিখিত দলিল করে শর্ত সাপেক্ষে মনোনয়ন দেওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের জন্য লজ্জার। লিখিত অঙ্গীকার পূরণ না করায় সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য প্রফেসর মাসুদা এম রশীদ চৌধুরীকে শোকজ করা এবং অঙ্গীকার পূরণ না করলে তাকে দল থেকে বহিস্কারের হুমকির ঘটনা রাজনীতির জন্য কলঙ্কের।’

গতকাল প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকা-৬ আসনের জাপা দলীয় সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ ইত্তেফাককে বলেন, “যখন সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়ন দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল, তখন আমি ছিলাম সৌদিআরবে। সেখান থেকে দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাকে ফোন করে বলেছিলাম- আমি পাঁচ কোটি টাকা দেব, আমার মেয়েকে মনোনয়ন দিন। বলেছিলাম- স্যার (এইচএম এরশাদ) অসুস্থ, দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি দলের নামে নেই। যে চারজনকে মনোনয়ন দেওয়া হবে প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ কোটি করে ২০ কোটি টাকা দিয়ে সেটি পার্টির নামে দলিল করে সেখানে ‘এরশাদ ভবন’ নির্মাণ করার উদ্যোগ নিন। তারা দুজন আমাকে বলেছিলেন-ঠিক আছে। আমি এটাও বলেছিলাম, টাকাটা দলের ব্যাংক তহবিলে আমরা জমা দেব। দেশে ফিরেও তাদের দু’জনকে আমি একই কথা বলি। বলেছিলাম, পাঁচ কোটি টাকার কমে কিন্তু কাউকে মনোনয়ন দেওয়া যাবে না। আমার মেয়ে মনোনয়ন পেতে সাক্ষাতকারও দিয়েছিল। কিন্তু তাকে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। সেই কারণে আমি ধরে নিয়েছি, হয়তো আরও বেশি টাকার প্রার্থী পাওয়া গেছে বিধায় আমার মেয়ে মনোনয়ন পায়নি।”

বর্তমান সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে জাপার আরেক এমপি অধ্যাপিকা রওশন আরা মান্নান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘লিখিত অঙ্গীকারে কী আছে কী নেই, সেটা বিষয় নয়। আমার সঙ্গে দলের যেই অঙ্গীকার ছিল আমি সেটা পূরণ করে দিয়েছি।’

এদিকে, প্রকাশিত প্রতিবেদন সম্পর্কে গতকাল ইত্তেফাকে পাঠানো একটি লিখিত বক্তব্যে জাপা মহাসচিব ও সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেছেন, ‘জাপার ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতেই প্রতিবেদকের সামনে দলীয় চিঠিটি নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই প্রতিবেদককে ভুল বোঝানো হয়েছে। তাছাড়া ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের এমপির নেতৃত্বে আট সদস্য বিশিষ্ট কমিটি সবকিছু নির্ধারণ করেছে, যেখানে গোপন চুক্তির কোনো অবকাশ নেই।’

রাঙ্গা আরও বলেন, ‘মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী প্রায় দুই বছর ধরে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে নির্ধারিত দলীয় চাঁদা পরিশোধ করছেন না। পার্টিকে শক্তিশালী করতে তার নির্বাচনী এলাকার অফিস ভাড়া পরিশোধ করার কথা রয়েছে, যা তিনি এখনো পরিশোধ করেননি। এসব কারণেই পার্টি চেয়ারম্যানের নির্দেশে তাকে গঠনতন্ত্র মোতাবেক নোটিশ দেওয়া হয়েছে।’

সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য জাপার যে আটজনের সমন্বয়ে কমিটি করে দিয়েছিলেন দলের চেয়ারম্যান এইচ এরশাদ, সেটির প্রধান ছিলেন দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের। অন্য সাতজন সদস্য ছিলেন- দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. জে. (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, গোলাম কিবরিয়া টিপু, ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারি ও অ্যাডভোকেট শেখ সিরাজুল ইসলাম।

এদিকে, ইত্তেফাকে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এনিয়ে গতকাল প্রতিবেদন করেছে বিবিসি। বিবিসি’কে জিএম কাদের বলেছেন, ‘এমপি হওয়ার জন্য কোনো শর্ত দেওয়া বা এ ধরনের বিষয় উল্লেখ করে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। কেউ যদি এ ধরনের শর্তযুক্ত চিঠি দিয়ে থাকে আর কেউ যদি সেটি গ্রহণ করে সেটি তাদের বিষয়। এখানে জাপার কোনো দায় নেই। কারণ আইন বহির্ভূত কোনো প্রক্রিয়া আমাদের দল অনুসরণ করে না।’ জিএম কাদের এটাও বলেছেন, ‘নেতাকর্মীদের মাসিক ফি প্রদানের বিষয়ে একটি চিঠির কথা আমি শুনেছি। তবে এতে অন্য কোনো বিষয় ছিল কি-না সেটি আমি জানি না।’

এব্যাপারে মসিউর রহমান রাঙ্গা গতকাল রংপুর থেকে টেলিফোনে ইত্তেফাককে বলেন, ‘নোটিশের কোথাও আমি বলিনি যে, আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো দেনাপাওনা আছে। এখানে আমার ব্যক্তিগত কিছু নেই। আটজনের কমিটিই সবকিছু করেছে। দলের চেয়ারম্যানের নির্দেশেই আমি মাসুদা এম রশীদ চৌধুরীকে নোটিশ দিয়েছি। কাজেই এখানে এখন একা আমার ঘাড়ে দায় চাপানোর কোনো সুযোগ নেই।’