শরীর ও মন দুটি মৌলিক উপাদান। হূষ্টপুষ্ট-সুস্থ শরীরের জন্য খাদ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সুন্দর মনের জন্য বইপড়া তেমনি অনিবার্য সত্য। বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েও জ্ঞানের দৈন্যে তার মধ্যে কল্যাণকর কোনো ভূমিকা থাকে না। হজরত আলি (রা.) তাই যথার্থই বলেছেন, ‘সম্পদের চেয়ে জ্ঞান উত্তম। সম্পদ তুমি পাহারা দাও, আর জ্ঞান তোমাকে পাহারা দেয়।’ সুতরাং আমাদের পড়ুয়া জাতি গঠন করতে হবে। সে-পথের সন্ধান জরুরি। যে-পথ জ্ঞানদীপ্ত। পড়ুয়া জাতিই জ্ঞানদীপ্ত, মেধাবী জাতি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন, ‘হে মাতঃ বঙ্গ শ্যামলা অঙ্গ ঝলিছে অমল শোভাতে।’ এত সুন্দর দেশের মানুষ হয়েও আমরা মনের দিক দিয়ে দিনে দিনে কেমন অসুন্দর হয়ে উঠেছি। আমার মনে হয়, বইবিমুখ হওয়াতে নৈতিক শক্তির স্খলন ঘটেছে। বর্বর জাতিতে রূপান্তরিত হয়েছি আমরা। শুধু আমরা নই, জ্ঞানচর্চার পথে মানুষ যেন হাঁটছেই না আর।
আশার কথা যে, পৃথিবীতে এমন কিছু জাতিগোষ্ঠী আছে, বইয়ের প্রতি তাদের প্রবল আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা সর্বাগ্রে পড়ুয়া জাতি হিসেবে পরিচিত। জাপানিরাও তাই। এরকম আরো কিছু নাম হয়তো পাব আমরা। বিশাল জনগোষ্ঠীর পৃথিবীতে এটা খুবই নূ্যনতম। ব্রিটিশরা যে পড়ুয়া জাতি সে-সম্পর্কে আবদুল হাইয়ের ‘বিলাতে সাড়ে সাতশ’ দিন’ বইয়ে সে তথ্যের উল্লেখ আছে। সত্যিই তারা পড়ুয়া জ্ঞানদীপ্ত জাতি। পড়ুয়া জাতির বড়ো পরিচয় তারা সুসভ্য। লিউ তলস্তয় বইপড়ার গুরুত্বের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন— ‘জীবনে মাত্র তিনটি জিনিসের প্রয়োজন, তাহলো বই বই আর বই।’
একটা জাতির জ্ঞান-গরিমা দেখেই বোঝা যায়, তারা পাঠপ্রবণ বা জ্ঞানান্বেষী কিনা। বাঙালিদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই প্রমাণ করে, তারা পড়ুয়া জাতি নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘তোতা কাহিনী’তে স্পষ্ট করে বলেছেন সে-কথা। বাঙালিরা পড়ুয়া জাতি হিসেবে পরিচয় বহন করে না। এদের মধ্যে অধিকাংশ যারা উচ্চ ডিগ্রিধারী শিক্ষিত, তারাও সুশিক্ষিত নন। তাদের তিনি মৃত পাখির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পাখিটি মরিয়াছে, তাহার পেটে বিদ্যা গজগজ গিজগিজ করিতেছে সত্য, কিন্তু পাখিটি মরিয়াছে।’ তথাকথিত এই শিক্ষিতজনদের কথা তিনি এভাবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মধ্যে সত্যিকার অর্থে মানবিক গুণাবলির কিছু নেই।
হিমালয়ের পাদদেশে ক্ষুদ্র এই ব-দ্বীপসদৃশ দেশের জনসংখ্যা বিপুল। এদের মধ্যে পড়ুয়া মানুষের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। দেশটাতে বইমেলাও হয়। মেলায় জনসমাগমও কম নয়। কিন্তু পাঠক-ক্রেতা কম। যারা আসে তারা বিকালটা উপভোগ করার জন্য আসে। ‘সুন্দর মন সুন্দর চিন্তা’—এসব বিলাসবহুল বাড়ির টাকাওয়ালাদের নেই। অর্থাত্ তারা বই পড়ায় অভ্যস্তও নয়। অভ্যাসটা ওভাবে ওদের গড়ে ওঠেনি। কাজেই ওদের হাজারো রকম চিন্তার মধ্যে পড়ার চিন্তাটা মাথায় আসে না। তারা জ্ঞানকে পশ্চাতে ফেলে চলে। সম্পদকেই বড়ো বেশি গুরুত্ব দেয়। তাদের মধ্যে সম্পদ অর্জনের ভীষণরকম অসম প্রতিযোগিতা। এভাবে এই টাকাওয়ালাদের সংখ্যা তরতর করে বেড়ে যায়। ওপরওয়ালা বনে যায়। জ্ঞান নয়, ধনই বড়ো এদের কাছে। আত্মচিন্তা ও স্বার্থচিন্তা বেশি।
একটি ভালো মন তৈরির জন্য সাহিত্য-সংস্কৃতির ভূমিকা অনস্বীকার্য। বইপড়া চিন্তা করতে শেখায়। এতে মস্তিষ্কের কোষে কোষে সচ্চিন্তার অঙ্কুরোদ্গম ঘটে। এই চিন্তাই মানুষকে সুসভ্য ক’রে তোলে। এই সুন্দর জিনিসটা এখানে গড়ে ওঠে নাই। সত্অভিভাবকত্ব আমাদের মধ্যে নেই বললেই চলে। পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র সবখানে একই অবস্থা। অভিভাবকশূন্য আমরা। সত্সাহিত্য অভিভাবকতুল্য। সাহিত্য পত্রিকার গুরুত্বও সমাজজীবনে অনেক। কিন্তু সাহিত্য-সংস্কৃতির সেই শুভছোঁয়া আমাদের কোথাও? ভাবনার বিষয়, সৃজনশীল সাহিত্য সৃষ্টি কী আমাদের দেশে হয় না? উত্তরটা হ্যাঁসূচকই। কিন্তু পাঠক কই। দেশের লোকসংখ্যা অনেক। তাহলে এমন কেন? পড়ুয়া মানুষের সংখ্যা হাতেগোনা মাত্র। বাড়ছে না। বহুলপঠিত বই আদৌ আছে কিনা, তাও অজ্ঞাত। অজ্ঞানতা আর কি। কারণটা জানা খুবই জরুরি।
আমার ছেলেবেলার কথা বেশ মনে পড়ে। তখন এম.ই স্কুল ছিল। যাকে এখন প্রাইমারি স্কুল বলে। আমি এরকম একটি এম ই স্কুলে পড়তাম। আমার মনে পড়ে, প্রতি বৃহস্পতিবার স্কুল ছুটির আগমুহূর্তে শিক্ষকরা ক্লাসে ক্লাসে ছাত্রদের হাতে সৃজনশীল বই ধরিয়ে দিতেন। কয়দিন পর আবার তা ফেরত নিতেন। ভালোভাবে পড়া হয়েছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখতেন। পড়ার অগ্রগতি কেমন, তা জানতেন। তাতে ছাত্রদের মনে বইপড়ার আগ্রহ জন্মাত। আমার মনে আগ্রহটা বেশ জেঁকে বসেছিল। উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজজীবনে এসে বইপড়া নেশায় পরিণত হয়েছিল। সংসার জীবনে এসেও কিন্তু বইপড়া বাদ পড়ে নাই। এখনো এই অভ্যাসটা রয়ে গেছে। বইপড়ার মাহাত্ম্যটা ছোট বেলায়ই বুঝতে পেরেছিলাম। রাত জেগে জেগে বই পড়তাম। উপন্যাস, ছোটগল্প, জীবনী পড়তাম। বইয়ের চরিত্রগুলো মনে প্রভাব বিস্তার করত। ওলটপালট করে দিত মন। পড়ার অভ্যাস বা চর্চাই তো ভালো কিছুর আয়ত্ত এনে দেয়। মন ভরায়। সে-সময় কৈশোরে ছাত্রদের মধ্যে বাধ্যতামূলক বইপড়ার প্রবণতা সৃষ্টি করা হতো। কাজটি ছিল জ্ঞানদীপ্ত। এখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সে-নিয়ম নেই। এটাই বইবিমুখ হওয়ার মূল কারণ। এরা শুধু পাসের পড়া নিয়ে ব্যস্ত সর্বক্ষণ। চাকরি পেতে মন থাকে আচ্ছন্ন। এভাবে বিশাল পাঠবিমুখ জনগোষ্ঠী অন্ধকারের জীব হয়ে ওঠে। নৈতিক-অনৈতিক কোনো জ্ঞান থাকে না।
কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে পড়ে। দুর্বৃত্তায়ন বলয়ে ডুবে থাকে। তত্কালীন সামন্তবাদী জমিদারগণ স্কুলে স্কুলে বইপড়ার এই নিয়ম প্রবর্তন করেছিলেন। শিশুকাল থেকে বইপড়ার চর্চা, পরবর্তী জীবনে শিশুর সুন্দর জীবনের সোপান গড়ে ওঠে। পরিবারকেন্দ্রিক এই নিয়ম চালু হওয়া বাঞ্ছনীয়। ছোট বেলার অভ্যাসই ধীরে ধীরে জীবন গড়ার অভ্যাসে পরিণত হয়। সভ্য জাতিগঠনে এই নিয়মটা সত্যিই যুগান্তকারী। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তর থেকে বাধ্যতামূলক বইপড়ার নিয়ম চালু হওয়া আবশ্যক। জ্ঞানসমৃদ্ধ এই প্রয়াস গ্রহণ জরুরি। পিতাদের নির্বাচিত বই-ই হবে শিশুদের পড়ার উপযোগী। এতে বই হবে বহুলপঠিত। মুদ্রিত সংখ্যাও বাড়বে। লেখক হবেন উপকৃত। লেখকদের মধ্যে ভালো বই লেখার প্রবণতাও বৃদ্ধি পাবে। প্রকাশকরা ভালোমানের বই মুদ্রণে উত্সাহিত হবেন। এতে করে বই-বাণিজ্যের সঙ্গে পাঠাভ্যাস গড়ে উঠবে। এভাবে বিপুলসংখ্যক পাঠক তৈরির সোপান গড়ে উঠবে। মানুষ হবে লাইব্রেরিমুখী। পাঠকসৃষ্টির এই কৌশল হবে সুদূরপ্রসারী। পড়ুয়া জাতি হিসেবে আমাদের পরিচয় হবে জ্ঞানালোকে দীপ্ত ও উজ্জ্বল।
লেখক: সাংবাদিক
