যারা ধূমপান বা তামাকপাতা জর্দা ব্যবহার করেন, তারা এর ক্ষতিকর দিক চিন্তা করে ছেড়ে দেওয়ার কথা সব সময়ই ভাবেন। তবে কোন সময়টা তাদের জন্য উপযুক্ত, সেটা খুঁজে পান না। এদিক দিয়ে বিবেচনা করলে বলা যায়, পবিত্র এই রমজান মাসে ধূমপান বা তামাকপাতা জর্দা ছেড়ে দেওয়ার উপযুক্ত সময়। একটা মানুষ যখন দীর্ঘ প্রায় ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা না খেয়ে থাকতে পারেন এবং সেই সময়ে সিগারেট, জর্দা, পান কোনো কিছুই না খেয়ে থাকতে পারেন, তারা কেন জীবনের বাকি সময়ের জন্য ধূমপান বা তামাক ছাড়তে পারবেন না? এটা তো সম্পূর্ণভাবে একজন মানুষের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। তাছাড়া রমজান মাসটা হচ্ছে সংযমের মাস, এই সময়ে মানুষ অনেক সংযমী হয় এবং সারাটা দিন একটি নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে ধর্মীয় নিয়মনীতির সঙ্গে চলতে হয়।
তামাক বা ধূমপান কোনো খাদ্যতালিকার মধ্যে পড়ে না। এটি একধরনের নেশা। বহুকাল থেকে এ দেশে এই তামাকের ব্যবহার দুভাবেই মানুষ গ্রহণ করে আসছে, একটি হচ্ছে ধোঁয়াহীন তামাক বা জর্দা আরেকটি হচ্ছে ধোঁয়াযুক্ত তামাক বা সিগারেট, চুরুট ইত্যাদি। বিজ্ঞানের গবেষণায় এই দুই ধরনের তামাকই দেহের জন্য ক্ষতিকর। তামাক ও বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়ায় ৭ হাজারের বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে, যার মধ্যে ৭০টি রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টিতে সক্ষম। এর মধ্যে নিকোটিন, কার্বন মনোক্সাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, বেনজোপাইরিন, ফরমালডিহাইড, এমোনিয়া, পোলোনিয়াম ২১০ উল্লেখযোগ্য। সব মৃত্যুর শতকরা ৬৩ শতাংশ অসংক্রামক রোগ এবং তার মধ্যে একমাত্র দায়ী হচ্ছে তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য। বিশ্বব্যাপী তামাক ব্যবহার মৃত্যুর প্রতিরোধমূলক একমাত্র কারণ হিসেবে বিবেচিত এবং প্রতি ১০ জনে ১ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে সরাসরি দায়ী।
২০০৯ সালের গ্যাটসের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে ৪৩ শতাংশ, অর্থাত্ প্রায় ৪ কোটি ১৩ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক সেবন করে, ২৩ দশমিক ২ শতাংশ ধূমপায়ী এবং ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ ধোঁয়াহীন তামাক (জর্দা ও গুল) ব্যবহারকারী। ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, তামাক খাত থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব পায়, তার বিপরীতে তামাক ব্যবহারের কারণে অসুস্থ রোগীর চিকিৎসায় সরকারের স্বাস্থ্য খাতে দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় হয়।
ধূমপান বা তামাকপাতা যারা ব্যবহার করেন, তারা জানেন এর ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে। এক কথায় বলতে গেলে, মাথার চুল থেকে পায়ের নখ ও আমাদের দেহের সব অঙ্গপ্রতঙ্গ তামাকের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন মাথার চুল পড়া, চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট, মুখের ক্যানসার, গলার ক্যানসার, ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ, পাকস্থলির ক্যানসার, স্তন ক্যানসার, যৌনশক্তি নাশ, গর্ভপাত, মৃত শিশু জন্ম, পায়ের পচনশীল রোগ, গ্যাংগিন পা কেটে ফেলা ইত্যাদি। এই ধূমপান যে শুধু ধূমপায়ীকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে তা নয়, একজন পাশে থাকা অধূমপায়ীকে সমানভাবে রোগাক্রান্ত করছে।
সুতারং এই পবিত্র মাসেই যদি সিগারেট বা জর্দা না খেয়ে তারা থাকতে পারেন, তবে বছরের বাকিটা সময় থাকতে পারবেন না কেন? অতএব, এই সময়ে যদি রোজা রাখার আগেই বা রোজা রাখার সময় থেকেই একজন ধূমপায়ী প্রতিজ্ঞা করেন যে আমি এই পবিত্র রমজান মাসে যেহেতু রোজা রাখব, নামাজ পড়ব, সংযমী হব, সেহেতু আমি এই সময় থেকেই আমার এই বদ অভ্যাসটি বা নেশাও পরিত্যাগ করব। এবং এই দৃঢ় সিদ্ধান্ত থেকেই একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি এ ধরনের বদ অভ্যাস বা নেশা থেকে মুক্ত হতে পারেন। সুতরাং পবিত্র এই রমজান মাস থেকেই শুরু হোক তামাক বর্জন।
আপনি যদি ধূমপান ছাড়তে পারেন, তবে আপনার পরিবার ও বন্ধুবান্ধবও অনেক উপকার পাবেন, যেমন:
১. তারা মুক্ত বায়ু সেবনের আস্বাদ পাবেন।
২. আপনি তাদের সঙ্গে মিশে আরো আকর্ষণীয় ও মধুর ব্যক্তিত্বের অধিকারী হবেন। কারণ একটি বিদেশি প্রবাদ আছে— একজন অধূমপায়ীকে চুমু দাও এবং তার স্বাদ অনুভব করো, দেখবে কত সুখকর সেই মুহূর্তটি।
৩. আপনি যদি ধূমপান না করেন, তবে আপনার সন্তানও ধূমপান করবে না। কারণ শিশুরা যা দেখে তা-ই শেখে।
৪. যারা ধূমপান করেন, তাদেরই কেবল বিপদের সম্ভাবনা থাকে তা-ই নয়; তাদের আশপাশে যারা থাকেন, তাদেরও বক্ষব্যাধি ইত্যাদিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ধূমপান ছাড়তে ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন। কাজটি চার পর্যায়ে করা যায়:
ক. প্রথমে আপনি চিন্তা করে নিন কেন ধূমপান ছাড়বেন।
খ. মনে মনে আপনি শক্ত যুক্তি খুঁজে নিতে চেষ্টা করুন
গ. আপনি নিজের মনকে ঐ যুক্তিগুলোর আলোকে ধূমপান ছাড়ার জন্য প্রস্তুত করতে থাকুন
ঘ. সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আপনি এক বিশেষ দিনে কাজটি সম্পন্ন করুন। সেই দিন অবশ্যই ধূমপান ছেড়ে দিন।
ঙ. আপনার ধূমপানের নেশার তাগিদ উঠলে অন্য কোনো কাজে বা চিন্তায় নিজেকে ব্যস্ত রাখুন।
লেখক: চিকিৎসক; প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মানস; সদস্য, জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটি এবং জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স
